শুক্রবার ১০ জুলাই ২০২০

২৬ আষাঢ় ১৪২৭

ই-পেপার

বেলাল হোসেন॥প্রিন্ট সংস্করণ

জুলাই ১১,২০১৭, ১২:১০

জানুয়ারি ০৪,২০২০, ১০:৪০

গণপরিবহনে কমেনি নারীর ভোগান্তি

সরকার থেকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে আইন করলেও পদে পদে নারীদের বাঁধা রয়েই গেছে। দেশে এখনো অনেক কষ্টের মধ্য দিয়ে গণপরিবহনগুলোয় নারীদের যাতায়াত করতে হয়। এই নারী যাত্রীর ভোগান্তির শেষ কোথায়। অথচ নারী-পুরুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকারের আন্তরিকতার অভাব নেই। শিক্ষা, চাকুরি, নেতৃত্ব, রাজনীতিসহ বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমে বেড়েছে নারীর অংশগ্রহণ। ঢাকাসহ সারাদেশে সরকারি-বেসরকারি উচ্চ মহলের মোটিভেশনে সর্বক্ষেত্রে নারীর বিচরণ এখন আকাশচুম্বি। নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে কাজ করছে নানা সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। নারীর নিরাপত্তায় বিনিয়োগ হচ্ছে শতকোটি টাকা।

চলতি বছরের ২৭ মার্চ অনুষ্ঠিত মন্ত্রিপরিষদে সড়ক পরিবহন আইন- ২০১৭ এর খসড়া অনুমোদন হলেও তা সংসদে পাশ হয়নি আজও। ফলে আইন না থাকায় রাজধানীতে কমেনি নারী যাত্রীর ভোগান্তি। ওইদিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে ‘সড়ক পরিবহন আইন-২০১৭’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। এই আইনে বলা হয়েছে, গণপরিবহনে নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী ও বয়স্কদের জন্য সংরক্ষিত আসনে অন্য কোনো যাত্রী বসলে এক মাসের কারাদ- বা ৫ হাজার টাকা জরিমানা গুণতে হবে অথবা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত করা যাবে। বড় বাসে ৯টি ও ছোট বাসে ৬টি সিট বরাদ্দের কথা আইনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সরেজমিনে দেখাগেছে ঢাকা শহরে চলা বাসে উঠতে ও বাসের সিটে বসা নিয়ে নানা বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছে নারী যাত্রীরা। তাদের জন্য নির্ধারিত আসনের এ শর্ত অনেক বাসেই মানা হচ্ছে না। আবার মানলেও সেসব আসনে বেশির ভাগ সময় পুরুষ যাত্রীরা দখল করে থাকে।

কথা হয় শাহবাগ থেকে মিরপুর-১০ নম্বরে যেতে চাওয়া শিল্পী রানী নামের এক নারী যাত্রীর সাথে। তিনি জানান, আসন ছেড়ে দেওয়ার কথা বললে উল্টো পুরুষেরা অপমানসূচক বিভিন্ন উক্তি করে। পাশাপাশি নির্ধারিত এ আসনের বাইরে নারীরা বসতে গেলেও অনেক কথা শুনতে হয়। ফার্মগেটে দাড়িয়ে থাকা ওপর এক নারী যাত্রী রুবী আকতার বলেন, ফার্মগেট থেকে গুলিস্থানে যাবো আধাঘন্টা প্রচ- রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি। অধিকাংশ বাসের দরজা বন্ধ। যে বাসের দরজা খোলা সেখানে পুরুষের সাথে প্রতিযোগীতায় উঠতে পারছি না। মহিলাদের জন্য বাস সীমিত চলাচল করায় এ পর্যন্ত চোখেই পড়ছে না। শুধু আজই নয় প্রতিদিনই আমাদের এমন ভোগান্তির শিকার হতে হয়।

এছাড়াও রাজধানীর বিভিন্ন রোডে চলাচল করা তেতুলিয়া পরিবহনে উঠে সরেজমিনে দেখা যায়, সামনের দিকে নারীদের জন্য বরাদ্দকৃত ৬টি সিটের চারটিতেই পুরুষ বসে আছে। এ বিষয়ে কন্টাকটর শরিফের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মহিলা যাত্রী নেই তাই পুরুষ যাত্রী বসেছে। পেছনের দিকে একাধিক মহিলা যাত্রী বসানো হয়েছে কেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তাদের সঙ্গীসহ সেখানে বসেছেন। মহিলা সিটে বসা দুই পুরুষের স্থলে নতুন মহিলা যাত্রী আর তুলবেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যেহেতু সিট নেই তাই আর যাত্রী তোলা যাবে না।

সম্প্রতি অ্যাকশন এইড বাংলাদেশের নিরাপদ নগর কর্মসূচীর ভিত্তিমূলক জরিপের তথ্য অনুযায়ী, নারীরা গণপরিবহনসহ বিভিন্ন জায়গায় যৌনহয়রানির শিকার হন। ৪৮ শতাংশ নারীর বাসের চালক বা ভাড়া আদায়কারীর মুখে অবমাননাকর ভাষা শোনার তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে। যৌন হয়রানি বা সহিংসতা এড়াতে কৌশল হিসেবে জরিপে অংশ নেয়া নারীদের ১৩ শতাংশ গণপরিবহন ব্যবহার করা বন্ধ করেছেন বলেও জরিপে উল্লেখ করা হয়। তিন শতাংশ নারী বলেন, আত্মরক্ষায় তারা অস্ত্র বা যন্ত্রপাতি সঙ্গে রাখেন।

এ বিষয়ে পরিবহন মালিক সমিতির সাংগাঠনিক সম্পাদক এ্যাড. মাহবুবুর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, দেখুন মালিক সমিতির পক্ষ থেকে ঈদের আগে থেকে এই নির্দেশনা আমরা কার্যকর করার চেষ্টা করছি। শ্রমিক ইউনিয়নগুলোকে আমরা নির্দেশনা দিয়েছি। তবে বাস্তব চিত্র হয়তো একটু ভিন্নরকম হচ্ছে। অনেক সময় ছেলেদের সিটে মেয়েরা বসে যাচ্ছে। আবার অনেক সময় সঙ্গীসহ মেয়েরা ছেলেদের সিটে বসে যাচ্ছে। অনেকসময় মেয়েরাই এ বৈসম্য মানছে না।

তারপরও আমরা চেষ্টা করছি এ বিষয়ে আদালত ও সরকারের দেয়া নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য। ছয়টি সিট ফাঁকা রেখে যাত্রী তোলা হচ্ছে না বরং মহিলাদের সিটে যাত্রী তোলার পর নতুন করে মহিলা যাত্রী উঠতে চাইলে আর তোলা হচ্ছে না, এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেখুন আমাদের দেশের বাসের ড্রাইভার, কন্টাকটর ও হেলপাররা অধিকাংশই স্বল্পশিক্ষিত। তাদের সেই দায়িত্ববোধ অনেক সময় থাকে না। অনেকসময় মালিকদের পক্ষ থেকে একটা নির্দেশনা দিলেও তারা মানতে চায় না। আমরা চেষ্টা করছি যাতে মহিলা যাত্রীর ভোগান্তি কমে এবং যাতায়াতে তারা সাচ্ছন্দবোধ করেন।

উল্লেখ্য, নারীদের ভোগান্তির কথা মাথায় রেখে স্বাচ্ছন্দ্যে যাতায়াতের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সংস্থার (বি আরটিসি) ১৯৯০ সালে প্রথম ঢাকা শহরে দুটি রুটে নারীদের জন্য আলাদা বাস সার্ভিস চালু করে। কিন্তু বাণিজ্যিকভাবে অলাভজনক হওয়ায় মাত্র ৮ মাস পরেই তা বন্ধ হয়ে যায়। পরে ২০০১ সাল থেকে তা চালু হয়। বি আরটিসির তথ্যমতে, রাজধানীতে বিভিন্ন সড়কপথে বর্তমানে মোট ১৬টি বাস নারীদের জন্য পরিচালিত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রাজধানীতে কর্মজীবী নারীর তুলনায় মাত্র ১৬টি বাসের সংখ্যাটি খুবই অপ্রতুল। অন্যদিকে বাসগুলো নির্দিষ্ট সময় মেনে না চলা, মহিলাদের জন্য নির্ধারিত বাসে মাঝে মাঝে পুরুষ যাত্রীদের বহন করার জন্য দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে বি আরটিসির মহিলা বাস সার্ভিসের যাত্রীদের। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ খাতে ক্রমাগত লোকসান হওয়ার কারণে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও বাসের সংখ্যা বাড়ানো যাচ্ছে না। অনুসন্ধানে নিয়ম ভেঙে বি আরটিসির বাসগুলোতে পুরুষ যাত্রী বহন করতেও দেখা গেছে।

এদিকে বি আরটিসির ভাষ্য মতে, বাসগুলোতে সকাল ও বিকেলে চাপ থাকলেও অন্য সময় চাপ থাকে না। সে সময় যাত্রী না থাকায় তেলের খরচ পুষিয়ে নিতে পুরুষ যাত্রী বহন করা হয়। বি আরটিসির তথ্যে জানা যায়, বর্তমানে মতিঝিল, রামপুরা, মালিবাগ, চৌধুরীপাড়া, খিলগাঁও, মিরপুরসহ বিভিন্ন রুটে মোট ৮টি মহিলা বাস চলছে। এর মধ্যে কল্যাণপুর রুটে এ সেবা চালু করা যায়নি। ঢাকার বাইরে নারায়ণগঞ্জ-কাঁচপুরে আরেকটির চলাচলের কথা থাকলেও তা বন্ধ হয়ে যায়।