বৃহস্পতিবার ০১ অক্টোবর ২০২০

১৭ আশ্বিন ১৪২৭

ই-পেপার

জাহাঙ্গীর আলম

প্রিন্ট সংস্করণ

আগস্ট ১২,২০২০, ১২:৪২

আগস্ট ১২,২০২০, ১২:৪২

চিনি ও খাদ্যশিল্প কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান সনৎ কুমার সাহা

কমানো হবে চিনির লোকসান

দেশি চিনির স্বাদই অন্য রকম। চাহিদাও বেশি। তারপরও চিনিকলগুলোর সীমাবদ্ধতার কারণে আশানুরূপ পর্যায়ে যেতে পারছে না। প্রতি বছর বাড়ছে লোকসান।

তবে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে সনৎ কুমার সাহা লোকসান কমানোর উদ্যোগ নিয়েছেন। সবাইকে সেই ম্যাসেজ দেয়া হয়েছে। চেষ্টা থাকবে উৎপাদনও বাড়ানোর। একান্ত আলাপচারিতায় তিনি আমার সংবাদকে এসব কথা জানান।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চিনি বাংলাদেশে খুবই প্রয়োজনীয় খাবার। প্রায় সময়ই এর ব্যবহার হয়। তবে রমজান মাসে বহুগুণ বেড়ে যায় এর চাহিদা। সিন্ডিকেটের দখলে চলে যায় বাজার। বেড়ে যায় দাম। তা নিয়ে ব্যাপক হইচই হয়। তখন বাজার সামলাতে সরকার চিনি বিক্রির ঘোষণা দেয়।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প কর্পোরেশনের (বিএসএফআইসি) উৎপাদিত চিনি কম দামে বিক্রি করা হয়। এর আওতায় চিনিকল আছে ১৫টি। এর মধ্যে একমাত্র কেরু অ্যান্ড কোম্পানি লাভের মুখ দেখতে পেরেছে।

বাকি ১৪টি সুগারমিলই লোকসান গুনছে। এসব চিনিকলের তিনটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ব্রিটিশ আমলে। ৯টি পাকিস্তান আমলে ও তিনটি বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর। সরকারি হিসাবে দেশে প্রতি বছর ১৪ থেকে ১৬ লাখ টন পরিশোধিত চিনির প্রয়োজন হয়।

এর মধ্যে দেশি চিনিকলের মোট উৎপাদন ক্ষমতা মাত্র দুই লাখ টনের বেশি। তাই সিটি, ফ্রেশ, দেশবন্ধুসহ বিভিন্ন কোম্পানির অপরিশোধিত চিনিই বাজার দখল করে রেখেছে।

যুগ যুগ ধরে লোকসানে থাকা প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান হিসেবে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নিয়েছেন অতিরিক্ত সচিব সনৎ কুমার সাহা। জানতে চাওয়া হয় চিনির উৎপাদন কি বাড়ানো সম্ভব।

তিনি বলেন, দেশি চিনির ব্যাপক চাহিদা সত্য কিন্তু উৎপাদন খরচও বেশি। প্রতি কেজির খরচ প্রায় দেড়শ টাকা। আর বিক্রি একেবারে কম। ৬০ থেকে ৬৫ টাকা কেজি। জনগণের করের টাকায় ভর্তুকি দিয়ে চলতে হচ্ছে এ প্রতিষ্ঠানকে।

তারপরও উৎপাদন বাড়ানো যাবে। এ জন্য কৃষকদের উৎসাহ দিতে হবে। তারা যাতে ভালো জাতের বীজ পায় তার ব্যবস্থা করতে হবে। এতে আখচাষ বেশি হবে। আখ বেশি চাষ হলেই চিনিও বেশি উৎপাদন হবে। বর্তমানে মোট চাহিদার ১০ শতাংশ দেশি চিনি উৎপাদন হচ্ছে বলে জানান তিনি।   

সূত্র আরও জানায়, স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকার ক্ষমতায় আসার পর চিনিকলগুলোর লোকসান কমানোর উদ্যোগ নেয়। তারপরও পারেনি। সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পরে উদ্যোগ নেন।

এরই অংশ বিশেষ তিনি ১২ এপ্রিল চিনিশিল্পকে লাভজনক করতে কিছু নির্দেশনাও দেন। শূন্য পদে লোকবল নিয়োগেরও নির্দেশ দেন। এমনকী বাজার সামলাতে চিনি আমদানিরও নির্দেশ দেন। বিভিন্ন প্রকল্প হাতেও নেয়া হয়।

এরপর ১৯৩৮ সালের প্রতিষ্ঠিত কেরু অ্যান্ড কোম্পানি ২০১২ সালে জৈব সার কারখানা চালুসহ মোলাসেস বা চিটাগুড়, ব্যাগাস বা ছোবড়া, প্রেসমাড বা গাদ কাজে লাগাচ্ছে।

এছাড়া এই চিনিকলে তৈরি হয় দুই ধরনের ভিনেগার, স্পিরিট। তাই লাভের মুখ দেখতে পেরেছে কেরু অ্যান্ড কোম্পানি। কিন্তু বাকি চিনিকলগুলো বছরের পর বছর লোকসান দিচ্ছে।

তা লাভজনক করার জন্য বিভিন্ন সময়ে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বর্তমানে চারটি প্রকল্প চলমান। ২০১৮ সালের ২২ মে সরকার ১৪টি চিনিকলে বর্জ্য পরিশোধনাগার (ইটিপি) স্থাপন প্রকল্পটির অনুমোদন দেয়।

৮৫ কোটি ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি ২০২০ সালের মধ্যে শেষ করার কথা। নাটোরের লালপুরে নর্থবেঙ্গল চিনিকলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সুগার রিফাইনারি স্থাপন প্রকল্পটি ২০১৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি অনুমোদন দেয়। ৩২৪ কোটি ১৮ লাখ টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্পটি ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২১ সালের জুনে বাস্তবায়ন করার কথা।

ঠাকুরগাঁও চিনিকলের পুরাতন যন্ত্রপাতি প্রতিস্থাপন ও সুগার বিট থেকে চিনি উৎপাদনের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সংযোজন প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সরকার ২০১৩ সালের ৩০ জুলাই অনুমোদন দেয়। প্রায় ৪৮৫ কোটি ৬২ টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্পটি ২০২১ সালের জুনে বাস্তবায়ন করার কথা।

চুয়াডাঙ্গার দামুরহুদায় বিএমআর কেরু অ্যান্ড কোম্পানির জন্য ২০১২ সালের ১২ এপ্রিল সরকার একটি প্রকল্পের অনুমোদন দেয়। ১০২ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১২ সালের জুলাই থেকে ২০২০ সালের জুনে বাস্তবায়ন করার কথা।

গত অর্থবছরে শিল্প মন্ত্রণালয়ের এডিবি বাস্তবায়নের সার্বিক অগ্রগতি ৯৯ শতাংশ হলেও চিনিশিল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি কম। চারটি প্রকল্পের অগ্রগতি ৯০ দশমিক ৯১ শতাংশ। কৃষি মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব বলেন, করোনার কারণে শেষ প্রান্তিকে কাজ করা সম্ভব হয়নি। তাই অগ্রগতি কম হয়েছে।   

সূত্র আরও জানায়, বাংলাদেশের সরকারি চিনিকলগুলো বছর বছর শুধু লোকসান গুনে যাচ্ছে। গত কয়েক বছরে লোকসান হয়েছে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা। কোনোক্রমেই লোকসান ঠেকানো যাচ্ছে না।

অপরদিকে চিনিশিল্প কর্পোরেশন আর টাকা দিতে চাচ্ছে না চিনিকলগুলোকে। বেকায়দায় পড়েছে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প কর্পোরেশন। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলোর আধুনিকায়নের জন্য অর্থায়নের বিষয়ে সম্মত হয়েছে জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন (জেবিআইসি) এবং এক্সিম ব্যাংক অব থাইল্যান্ড।

প্রতিষ্ঠান দুটি রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলের আধুনিকায়ন, পণ্য বৈচিত্র্যকরণ এবং উন্নত ইক্ষুজাত আবাদে বাংলাদেশি চাষিদের প্রশিক্ষিত করতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে।

গত জানুয়ারিতে শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন থাইল্যান্ড সফরে গেলে প্রতিষ্ঠান দুটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ সম্মতির কথা জানান।

চেয়ারম্যান বলেন, আর্থিক সমস্যায় ভুগছে এ প্রতিষ্ঠান। মৃত সাইড এটি। তাই বিদেশি প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে। সমস্যার সমাধান একটা হবে।    
কৃষিভিত্তিক ভারী শিল্প হিসেবে চিনিশিল্পের উন্নয়নে বর্তমান সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তা আমলে নিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করে করোনার মধ্যে ভার্চুয়াল মিটিং করে সব চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সাথে মিটিং করা হয়েছে বলে জানান সনৎ কুমার সাহা।

তিনি বলেন, চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নিয়েই সবাইকে ম্যাসেজ দেয়া হয়েছে লোকসান কমাতে হবে। লাভনজক করতে হবে। দেশে করোনা ভাইরাসের প্রকোপ কমাতে প্রথম থেকেই কেরু হ্যান্ড স্যানিটাইজার উৎপাদন করছে। কম দামে বিক্রিও করা হচ্ছে। যাতে সবাই পেয়ে থাকেন।

আমারসংবাদ/এসটিএম