বৃহস্পতিবার ০১ অক্টোবর ২০২০

১৭ আশ্বিন ১৪২৭

ই-পেপার

শরিফ রুবেল

প্রিন্ট সংস্করণ

আগস্ট ১১,২০২০, ১২:১৩

আগস্ট ১১,২০২০, ১২:১৩

‘ক্রসফায়ার’ বন্ধে হাইকোর্টের রুল

জবাব মেলেনি এক যুগেও

*বিচারবহির্ভূত হত্যা নিয়ে হাইকোর্টের তিনটি রুলই ঝুলে আছে রাষ্ট্রপক্ষের হস্তক্ষেপে
*হত্যার পর তদন্ত আলোর মুখ দেখে না, বিচারও হয় না
*আমরা বিচারবহির্ভূত হত্যা পছন্দ করি না : হাইকোর্ট
*ক্রসফায়ারে আইনের শাসনের মৃত্যু ঘটে : মত বিশেষজ্ঞদের
*ক্রসফায়ার বন্ধে হাইকোর্টের মৌখিক নির্দেশ ও অ্যাটর্নির আশ্বস্তি উপেক্ষিত

আইন আছে। আদালতও আছে, বিচারও চলে। তবুও বিদ্যামান বিচারব্যবস্থাকে উপেক্ষা করে চলছে ক্রসফায়ার ও কথিত বন্দুকযুদ্ধনামক বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। আলোচনা সমালোচনার পরও থেমে নেই এসব আইনবহির্ভূত হত্যা।

ফলে বিঘ্নিত হচ্ছে ন্যায়বিচার লঙ্ঘিত হচ্ছে মানবাধিকার। বেশ কবছর ধরেই মাদক কারবারি, সন্ত্রাসী ও ধর্ষক নির্মূলে শত শত কথিত বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা উঠে এসেছে বিভিন্ন গণমাধ্যমে। আদালতের বাইরে বিভিন্ন মহলেও ক্রসফায়ার নিয়ে দীর্ঘদিন থেকেই বিতর্ক চলে আসছে।

গত কয়েক বছরে এক হাজারের বেশি মানুষ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন বলে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের রিপোর্টে বলা হয়েছে। দালিলিক প্রমাণে দেশের প্রথম আলোচিত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হন কমরেড সিরাজ শিকদার ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে।

এরপরই নানা সময়ে নানা নামে ও ভিন্নভিন্ন অজুহাতে চলছে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। বিএনপি জামায়াত জোট সরকারের আমলে অপারেশন ক্লিনহার্ট নামে সারা দেশে শতশত মানুষকে ক্রসফায়ার দিয়ে হত্যা করা হয়।

মূলত তখন থেকেই অপরাধী দমনে বন্দুকযুদ্ধ রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। ক্রসফায়ার বন্ধে হাইকোর্ট রুল জারি করলেও ১১ বছরেও রুলের জবাব দেয়নি সংশ্লিষ্টরা।

গেলো বছর বরগুনা শহরে স্ত্রীর সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে স্বামী রিফাত শরিফকে কুপিয়ে হত্যার মামলার প্রধান অভিযুক্ত নয়ন বন্ডের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে হাইকোর্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সতর্ক হতে বলেছিলেন।

কিন্তু তারপরই সাবেক সেনা কর্মকর্তা সিনহা রাশেদের সাজানো ক্রসফায়ারের ঘটনা দেখলো দেশবাসী। ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধের’ ঘটনার বাইরেও গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধারের ঘটনাও ঘটেছে অহরহ।

এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি— দুই দল অপরাধীর মধ্যে গোলাগুলির কারণে নিহতের ঘটনা ঘটেছে। তবে কখনোই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার হতে দেখা যায়নি।

যদিও এসব ঘটনায় হত্যামামলা করা হয় এবং কোনো আসামির নাম উল্লেখ না করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে পুলিশ। তবে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের কোনো তদন্ত আলোর মুখ দেখে না। বিচারও হয় না।

এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপকভাবে আলোচিত সমালোচিত ‘ক্রসফায়ার’, ‘বন্দুক যুদ্ধ’ বা ‘আত্মরক্ষার্থে’ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিবর্ষণ ও মৃত্যুর অধিকাংশ ঘটনাই কারো কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়নি। এ ধরনের অনেক ঘটনার মধ্যে ব্যাপক প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

এদিকে কথিত বন্দুকযুদ্ধ বন্ধে মানবাধিকার সংগঠনের এক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে এক যুগেরও বেশি সময় আগে দেশের সর্বোচ্চ আদালত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধের ব্যাপারে প্রশ্ন তুলে রুল জারি করেন।

২০০৯ সালের ১৭ নভেম্বর ক্রসফায়ার নিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বপ্রথম রুল জারি করেন হাইকোর্ট। পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি), র‌্যাবের মহাপরিচালক ও স্বরাষ্ট্র সচিবকে চার সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়।

কিন্তু সেই রুলেরও জবাব দেয়নি সরকার। গণমাধ্যমে ক্রসফায়ারের অভিযোগ অস্বীকার করে আইনশৃঙ্খলা রাক্ষাকারী বাহিনী। শুনানিও হয়নি দীর্ঘদিনেও। ফলে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের দায় থেকে পার পেয়ে যাচ্ছেন জড়িতরা।

গত ৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজারে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান পুলিশের গুলিতে নিহত হন। এ ঘটনায় ফের আলোচনায় উঠে এসেছে কথিত ক্রসফায়ার বা বিচারবহির্ভূত হত্যার বিষয়টি। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনগুলো বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।

এছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠন থেকে একই দাবি এসেছে। এছাড়া প্রথমবারের মতো রিটায়ার্ড আর্মড ফোর্সেস অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের (রাওয়া) পক্ষ থেকেও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধের দাবি উঠেছে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে— শুধু মেজর সিনহা নন, দেশের সব বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিচার হতে হবে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো সংবিধানবিরোধী কর্মকাণ্ড থেকে সরে আসতে হবে।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ক্রসফায়ার যেন পার্ট অব দ্য লিগ্যাল সিস্টেম (আইনি প্রক্রিয়ার অংশ) হয়ে গেছে। এটা সংবিধান বা আইনের শাসন সমর্থন করে না।

আইনের দর্শন হচ্ছে, অনেক অপরাধী ছাড়া পাক, কিন্তু একজন নিরপরাধী যেন শাস্তি না পায়। তাছাড়া কারো ভুলের কারণে একটি জীবন চলে গেলে তা ফিরিয়ে দেয়া যায় না। ক্রসফায়ার কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। এতে আইনের শাসন বাধাগ্রস্ত হয়। কারণ দেশে বিচারবিভাগ থাকতে অপরাধীকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যায় আইনের ব্যত্যয় ঘটে।

শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীই নয় এর বাইরেও যদি কারো সঙ্গে গোলাগুলিতে খুনের ঘটনা ঘটে, তা তদন্ত করে সত্য উদঘাটনের দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। এটা ফৌজদারি অপরাধ। রাষ্ট্র এ ঘটনার বাদি। রাষ্ট্রকেই বের করতে হবে এ হত্যাকাণ্ড কারা ঘটাচ্ছে। কিন্তু এমন ঘটনাও চাপা পড়ে যায়।

বিচারসংশ্লিষ্টরা বলেন, সংবিধানের ২৭ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে— ‘আইনের চোখে সকল নাগরিক সমান এবং প্রত্যেকে আইনের সমান সুযোগ পাবেন।’ অনুচ্ছেদ ৩১ অনুসারে, আইন অনুযায়ী এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না, যাতে কোনো ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির হানি ঘটে।’

অনুচ্ছেদ ৩২ বলছে, জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা থেকে কোনো ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাবে না। আর অনুচ্ছেদ ৩৫(৩) অনুযায়ী ফৌজদারি অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালত বা ট্রাইব্যুনালে দ্রুত ও প্রকাশ্য বিচার লাভের অধিকারী হবেন।

ফলে গুরুতর অপরাধী হলেও একজন অপরাধী বিচার পাবার অধিকার রাখে। সেখানে ক্রসফায়ার দিয়ে অপরাধ নির্মূল করতে গেলে বিচারব্যবস্থার দরকার নেই বলেও প্রশ্ন তোলেন তারা।

জানা যায়, দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭৫ সালে সর্বপ্রথম ক্রসফায়ারের ঘটনা ঘটে। এরপর ২০০২ সালে বিএনপি জামায়াত সরকার অপারেশন ক্লিনহার্ট নামে সারা দেশে সন্ত্রাসী নির্মূলের নামে কথিত বন্দুকযুদ্ধ পরিচালনা করে শতশত নিরাপরাধ মানুষকে হত্যা করে। তখন থেকেই মূলত এ ধরনের হত্যাকাণ্ড শুরু হয়। ধীরে ধীরে তা বাড়তে থাকে। দেশ-বিদেশে সমালোচনার মুখে পড়তে হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোকে।

কিন্তু ক্ষমতাসীনরা সব সময়ই এ ব্যাপারে অনেকটা নীরব ভূমিকা পালন করে চলেছে। ২০০৬ সালের ২৫ মে সন্ত্রাসী টুন্ডা ইসমাইল ‘পুলিশ হেফাজতে’ কথিত ক্রসফায়ারে নিহত হয়।

ওই বছরই এ নিয়ে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের পক্ষ থেকে হাইকোর্টে রিট করা হয়। আজ অবধি ওই রিটের ওপর জারি করা রুলের জবাব দেয়নি বিবাদি পক্ষ।
উদ্যোগ নেই শুনানিরও।

পরবর্তীতে ওই বছরের ৬ আগস্ট আরও একটি রুল জারি করেন হাইকোর্ট। এর তিন বছর পর ২০০৯ সালের ২৯ জুন ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড’ নিয়ে আরেকটি রিট আবেদন দায়ের করা হয়।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশকেন্দ্র, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) ও কর্মজীবী নারী যৌথভাবে রিট আবেদনটি করে। এই আবেদনেও হাইকোর্ট ক্রসফায়ার কেন অবৈধ ও বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন।

এছাড়া, মাদারীপুর সদর উপজেলার লুৎফর খালাসী ও খায়রুল খালাসী নামে দুই সহোদর ক্রসফায়ারে নিহত হওয়ার ঘটনায় সুয়োমোটো রুল জারি করেন হাইকোর্ট। রুলে দুই সহোদরকে ক্রসফায়ারে হত্যা কেন অবৈধ ও বেআইনি ঘোষণা করা হবে না ও দায়ীদের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়।

২০১০ সালের ৩ জানুয়ারি ওই রিটের শুনানি মুলতবি করা হয়। তারপর এ নিয়ে কোনো শুনানি হয়নি। ২০০৯ সালের ১৭ নভেম্বর বিচারপতি এএফএম আবদুর রহমান ও বিচারপতি মো. ইমদাদুল হক আজাদের বেঞ্চ স্বপ্রণোদিত হয়ে আরও একটি রুল জারি করেন। আর যেন ক্রসফায়ার না ঘটে সে ব্যাপারে রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের কাছ থেকে অঙ্গীকারও নিয়েছিলেন।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করে ২০১০-এর ৩ জানুয়ারি শুনানি মুলতবি রাখতে বলেছিলেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা। এরপর ক্রসফায়ার বন্ধ রাখার মৌখিক নির্দেশ দিয়ে ওই সময় পর্যন্ত শুনানি মুলতবি করেন হাইকোর্ট। অ্যাটর্নি জেনারেল আশ্বস্ত করেছিলেন আর ক্রসফায়ার হবে না। কিন্তু ১০ বছরেও তার বাস্তবায়ন নেই।

এ বিষয়ে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘২০০৬ সালে জারি করা রুলের এখনো জবাব পাইনি। এ রুল শোনার জন্য এখতিয়ারসম্পন্ন কোর্ট পেলে শুনানির জন্য উপস্থাপন করবো।’

রুলের কেন শুনানি হয় না— জানতে চাইলে রিটকারী আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, রুল শুনানির জন্য কয়েকটি বেঞ্চে গিয়েছি। সবাই অপারগতা প্রকাশ করেছেন। আবার কয়েকবার আদালতের কার্যতালিকায়ও এসেছে কিন্তু পরবর্তীতে সেটা বাদ দেয়া হয়েছে। মাঝেমধ্যে আবার দেখা গেছে রুল শুনানি শুরু হওয়ার আগেই বেঞ্চ পরিবর্তন হয়ে গেছে। আবার অনেক সময় সরকার পক্ষ সময় চেয়ে বসে। অনেক বেঞ্চ এ ধরনের রিটের শুনানিই করতে চান না।

তিনি বলেন, আমি মনে করি এসব রিট আবেদনের সঙ্গে মানুষের বেঁচে থাকার অধিকারের বিষয় জড়িত। রিট আবেদনগুলোর চূড়ান্ত শুনানি হওয়া প্রয়োজন। অবকাশের পর আমার রিট আবেদনটি শুনানির জন্য আদালতের নজরে আনবো।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে আইন বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, ‘যুদ্ধাপরাধের বিচারের মতো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিচার নির্ধারিত হবে জনদাবি আর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রেক্ষাপটে। রিট মামলা যেগুলো হয়েছে, সেগুলোয় ফল আসবে তখনই যখন এর পেছনে আইনি যুক্তি ছাড়াও জনদাবি এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত স্পষ্ট হবে। আর এটা যত তাড়াতাড়ি হবে, ততই দেশের জন্য মঙ্গল।’

তিনি বলেন, দেরিতে হলেও মেজর সিনহা হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে এসব ক্রসফায়ারের নামে খুনের বিচারের জোর দাবি উঠেছে। আমরা এই কথিত বন্দুকযুদ্ধ, ক্রসফায়ার নিয়ে বিগত দেড় দশক ধরে কথা বলছি। বন্ধের দাবি করে আসছি। কিন্তু আমাদের দাবিতে সরকার কর্ণপাত করেনি। মন্দের ভালো হলো, এখন এসব হত্যাকাণ্ডের বিচার হবে। অন্যথায় দেশ একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হবে।

এদিকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে আইন ও সালিশকেন্দ্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের সালের জানুয়ারি থেকে গত ২৮ জুলাই পর্যন্ত দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে ১৯৬টি। ২০১৯ সালে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে ৩৮৮টি, ২০১৮ সালে ৪৬৬টি, ২০১৭ সালে ১৬২ জন মানুষকে বন্দুকযুদ্ধ ও ক্রসফায়ারের নামে হত্যা করা হয়েছে।

পুলিশ কাস্টডিতে থাকা অবস্থায়ও অনেকের মৃত্যু হয়েছে। বিচারবহির্ভূত হত্যার সংখ্যা ২০১৬ সালে ছিলো ১৯৫টি, ২০১৫ সালে ১৯২টি, ২০১৪ সালে ১৫৮টি এবং ২০১৩ সালে ২০৮টি। এসব হত্যাকাণ্ড নিয়ে দেশে ও আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচনার মুখে পড়তে হচ্ছে। তারপরও এ ধরনের হত্যাকাণ্ড থামছেই না।

এদিকে মাদকের ভয়াবহতা ঠেকাতে ২০১৮ সালের ৪ মে থেকে দেশব্যাপী সাঁড়াশি অভিযান শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ অভিযানে শুধু কক্সবাজার জেলাতেই পুলিশ, বিজিবি ও র‌্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে ২৮০ জন নিহত হন। তাদের মধ্যে রোহিঙ্গা ৯৩ জন। এ সময় পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন ১৬৯ জন, বিজিবির সঙ্গে ৬০ জন ও র্যাবের সঙ্গে ৫১ জন।

টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা পাচার বন্ধে দুই দফায় ১২৩ জন ইয়াবা কারবারি পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। এতকিছুর পরও ওই সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা চোরাচালান থেমে নেই।

অন্যদিকে ইয়াবা নির্মূলের নামে কক্সবাজারের টেকনাফে পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে গত প্রায় দুবছরে যেসব নিহতের ঘটনা ঘটেছে তা নিয়েও এখন নানা প্রশ্ন জোরালো হচ্ছে। কথিত ক্রসফায়ার নিয়ে টেকনাফ পুলিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে লাগামহীন বাণিজ্যের বিষয়টিও এখন সামনে এসেছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল অব বাংলাদেশ (টিআইবি) বলেছে, কক্সবাজারে সাবেক সেনা কর্মকর্তা নিহত হওয়ার ঘটনা ‘ক্রসফায়ার’ সংস্কৃতির অবারিত বিকাশের উদাহরণ মাত্র। বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত করে জবাবদিহি নিশ্চিতের পাশাপাশি বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধের উদ্যোগ নেয়ার দাবি জানায় সংস্থাটি।

সংস্থাটির বিবৃতিতে বলা হয়েছে— ২০১৮ সালের ৪ মে থেকে সারাদেশে শুরু হওয়া মাদকবিরোধী অভিযানে গত ৩০ জুলাই পর্যন্ত শুধু কক্সবাজার জেলায় পুলিশ, বিজিবি ও র্যাবের সঙ্গে শতাধিক ‘বন্দুকযুদ্ধের’ ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২৮৭ জন।

অথচ দেশের সংবিধান সব নাগরিকের আইনি সুরক্ষা পাওয়ার যে অধিকার দিয়েছে, তাতে মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকলেই কাউকে বিনা বিচারে হত্যা করার কোনো অধিকার দেয়া হয়নি।

নিহতদের বেশকজন কোনোভাবেই ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন না, এমন তথ্য-প্রমাণ নিয়ে বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এমনকি চাঁদা দেয়া না হলে ‘ক্রসফায়ারে দেয়ার’ মতো অভিযোগও খুব কম নয়।

এই বর্বরতার দায় প্রত্যক্ষভাবে জড়িতদের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানই এড়াতে পারে না। দেশে ইয়াবা ব্যবসার লাগাম টানা যায়নি। ‘বড় বড় ক্রীড়নকরা’ এক রকম ‘প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা’ নিয়ে বহাল তবিয়তে আছে।

পুলিশবাহিনী, সশস্ত্রবাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত এলিট ফোর্স র‌্যাব, বিজিবি একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ের কিছু ‘মাদক ব্যবসায়ী’ ও বেশকিছু ‘নিরপরাধ’ মানুষকে ‘বন্দুকযুদ্ধের’ নামে হত্যা করেছে।

এসব ঘটনায় কোনো গ্রহণযোগ্য তদন্ত ও আইনগত পদক্ষেপ না নেয়ায় এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, কার্যত দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো বিনাবিচারে হত্যার লাইসেন্স বা দায়মুক্তি পেয়ে গেছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) আশা করে সরকার এ ঘটনার সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য তদন্ত নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিনাবিচারে হত্যার সংবিধানবিরোধী অবস্থান থেকে সরে আসার কার্যকর উদ্যোগ নেবে এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহ নিজেদের মর্যাদা ও জন আস্থা সমুন্নত রাখার স্বার্থে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে।

আমারসংবাদ/এসটিএম