মঙ্গলবার ১১ আগস্ট ২০২০

২৭ শ্রাবণ ১৪২৭

ই-পেপার

প্রিন্ট সংস্করণ

জুলাই ০৭,২০২০, ১২:৪৮

জুলাই ০৭,২০২০, ১০:১৯

করোনা মহামারিতে সম্মুখযোদ্ধা পুলিশ

করোনার বিস্তার রোধে সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নির্ভীকভাবে নাগরিকদের পাশে থেকে কাজ করে যাচ্ছেন বাংলাদেশ পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের সদস্যরা। সরকারি নির্দেশনার সাথে সমন্বয় রেখে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স প্রণীত সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের পাশাপাশি বৈশ্বিক এ সংকট মোকাবিলায় পুলিশের নানাবিধ উদ্যোগ দেশের মানুষকে আশান্বিত করছে। করোনায় মৃতদের স্বজনরা ছেড়ে গেলেও দাফন করছে পুলিশ। বাহিনীটির নিজস্ব অর্থায়নে করা হচ্ছে গরিব ও অসহায় মানুষের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ। বিলিয়ে দেয়া হচ্ছে রেশনে পাওয়া পণ্যও। করোনাযুদ্ধে আক্রান্তেও সকল বাহিনীকে ছাড়িয়ে গেছে পুলিশ। পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) সোহেল রানা গতকাল জানিয়েছেন, করোনা মোকাবিলায় এ পর্যন্ত ১১ হাজার ৪৮৯ জন পুলিশ সদস্য আক্রান্ত হয়েছেন। তার মধ্যে শুধু ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশেই আক্রান্ত হয়েছেন দুই হাজার ৩৩৯ জন সদস্য। এখন পর্যন্ত মৃত্যুর সংখ্যা ৪৫ জন। আর সুস্থ হয়েছে সাত হাজার ৫৫৫ জন। সংকট শুরুর পর থেকেই নিজেদের সুরক্ষিত রেখে করোনা মোকাবিলা, জনগণকে সচেতন করা, দৈনন্দিন অপরাধ নিয়ন্ত্রণসহ জেলা ও থানা পুলিশের যাবতীয় কার্যক্রম কিভাবে চলছে, করোনাকালে কেমন আছেন; তার সার্বিক বিষয়ে খোঁজখবর নিতে দেশের প্রতিটি জেলার পুলিশ সুপারের সঙ্গে কথা বলেছে দৈনিক আমার সংবাদ। আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক বশির আহমেদ খানকে সঙ্গে নিয়ে মাঠপর্যায়ে পুলিশের সার্বিক কার্যক্রম নিয়ে দুই পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের প্রথম পর্ব তৈরি করেছেন আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক নূর মোহাম্মদ মিঠু

মোহাম্মদ আনিসুর রহমান, পুলিশ সুপার (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) : করোনা মহামারিতে গত মার্চ মাস থেকেই বাংলাদেশসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের পরিপ্রেক্ষিতে চিন্তা করে নিয়মিত কার্যক্রম যেটি অর্থাৎ অপরাধ দমনের পাশাপাশি করোনা মোকাবিলায় যা যা করণীয় সব বিষয়ে কাজ করছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পুলিশ। করোনাকে মাথায় রেখেই তারা করোনা প্রতিরোধের জন্য জনগণকে সচেতন করার জন্য লিফলেট বিতরণ বিশেষ করে বাজারে, স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা, জনসমাগমের স্থান- এসব জায়গায় প্রচারণা চালাচ্ছেন। একই সাথে এসব কার্যক্রমে যেসব পুলিশ সদস্য রয়েছেন তাদের মাস্ক, হ্যান্ডগ্লাভস, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, পিপিইসহ অন্যান্য সুরক্ষাসামগ্রী দেয়া হচ্ছে।

পুলিশ সুপার জানান, ‘করোনা মহামারিতে পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও ইমিউনিটি বৃদ্ধির জন্য সকালবেলা শারীরিক ব্যায়াম (পিটি) করাচ্ছি। গরম পানির ভাপ নেয়া, মসলাযুক্ত চা প্রত্যেকের জন্য বাধ্যতামূলক করেছি।

এছাড়া ইমিউনিটি বৃদ্ধির জন্য ভিটামিন সি ও ভিটামিন বি এবং জিংক ট্যাবলেট সরবরাহ নিশ্চিত করেছি। পুলিশ সদস্যদের উন্নতমানের খাবার সরবরাহ করছি।

একই সাথে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে জনগণের মধ্যে প্রচারণা চালাচ্ছি। যখন লকডাউন ছিলো তখন লকডাউন কার্যকর করতে যা যা করণীয় এগুলো আমরা করেছি।’

তিনি আরও জানান, ‘পরিবহনে যাত্রীরা যাতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলাচল করে সেটিও চেক পোস্টের মাধ্যমে মনিটরিং করে নিশ্চিত করছে জেলা পুলিশ।’

উল্লেখ্য, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পুলিশের ৩০ জন সদস্য এ পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন, ইতোমধ্যে ১৮ জন সুস্থ হয়েছেন বলে জানিয়েছেন পুলিশ সুপার। বাকিরাও সুস্থ জানিয়ে তিনি বলেন, রিপোর্ট পেলে ডিউটিতে লাগাতে পারবো।

সৈয়দ নুরুল ইসলাম, পুলিশ সুপার (কুমিল্লা ) : বাংলাদেশে গত মার্চ মাসের ৮ তারিখ প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয় এবং ১৮ তারিখে একজন মারা যায়। মূলত মার্চ মাসের মধ্যভাগে ইতালি থেকে একটি ফ্লাইট দেশে এসেছিল।

তারা জানায় হজ ক্যাম্পের কোয়ারেন্টাইনে যাবে না, তারা হোম কোয়ারেন্টাইনে যাবে। এই মর্মে তাদের যখন ছেড়ে দেয়া হলো, তখন পুলিশ সুপার যে কাজটা করলেন সেটা হলো- কুমিল্লা যেহেতু রেমিট্যান্সের দিক থেকে এক নম্বর, কুমিল্লায় প্রতিমাসেই পাসপোর্ট ইস্যু হয় প্রায় সাত-আট হাজার, তার মানে এখানকার মানুষ বেশি বিদেশে যায়। সেই বিবেচনায় বাংলাদেশের বিশেষ করে কুমিল্লায় কত সংখ্যক মানুষ এসেছে বিদেশ থেকে সেই স্টাডি শুরু করা হয়।

পুলিশ সুপার জানান, ‘আমি ইমিগ্রেশন থেকে তালিকা নিয়ে আসলাম। তাতে দেখলাম, মার্চ মাসের ১৫ তারিখ পর্যন্ত ১৪ হাজার ২৯৫ জন লোক বিদেশ থেকে কুমিল্লায় এসেছে। তারপরই খোঁজা শুরু করলাম এই লোকগুলো কোথায় গেলো। একটা সময় তাদের পাসপোর্ট কালেক্ট করে আমার পুলিশ তাদের বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে গেলো। তাদের স্বাস্থ্যের খোঁজখবর নেয়া এবং পাশের মানুষগুলোকে জানিয়ে দেয়া যে, এই লোকগুলোর কোয়ারেন্টাইন শেষ না হওয়া পর্যন্ত যাতে বের না হয়।

সেই থেকে এখন পর্যন্ত তাদের মাধ্যমে যাতে করোনা না ছড়ায়, এটাই আমাদের প্রথম উদ্যোগ। সেই সময় আমাদের সেফটি ইকুইপমেন্ট কিছুই ছিলো না। যে কারণে এটি ছিলো ঝুঁকিপূর্ণ উদ্যোগ।’

তিনি আরও জানান, ‘সেই সময় আমরা রেইনকোট পরেই কাজ করেছি। একই সাথে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য মাস্ক, হ্যান্ডগ্লাভস বিতরণ, মাইকিং করা এগুলোও করলাম। একটা পর্যায়ে দেখলাম মানুষকে যখন ঘরে রাখতে হবে, আবার সরকারও ছুটি দিয়ে দিলো কিন্তু তারপরও নানা অজুহাতে মানুষ ঘর থেকে বেরিয়ে আসে।

যে কারণে আঠারোটা থানায় আঠারোটা ট্রাকে করে আমরা প্রায় ১০-১২টা পণ্যবোঝাই ট্রাক ২০ ভাগ সাশ্রয়ী মূল্যে অন্তত ১০-১২ হাজার লোককে সরবরাহ করেছি। একটা পর্যায়ে রাস্তায় রাস্তায় গান গেয়েও মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা করলাম।

এর মধ্য দিয়েই দেখলাম ২০ কিংবা ২৫ শতাংশ লোক ঘরের বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে। যে কারণে ইন্টার উপজেলায় চেকপোস্ট বসিয়ে সেটিও আমরা বন্ধ করে দিলাম। যাতে করে এক উপজেলার লোক আরেক উপজেলায় যাবে না। দোকানপাট বিশেষ করে শহরগুলোতে যেন ব্যাপক মুভমেন্ট না হয় সেজন্য রেস্ট্রিকশন আরোপ করলাম। অসহায় দরিদ্রদের বাড়িতে বাড়িতে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে ত্রাণ পৌঁছে দিলাম।’ প্রথম দিকে কুমিল্লায় করোনা পরিস্থিতি ভালো থাকলেও গার্মেন্টশ্রমিকরা যখন চলে এলো ওই সময়ই ঘটলো বিস্ফোরণ।

এরপর ঈদুল ফিতর, তারাবির নামাজ পড়তে মসজিদ খোলা হলো, সরকার ছুটি ঘোষণা করলো, সবকিছু মিলিয়ে এখন যে পরিস্থিতি কুমিল্লাতে সেটা উদ্বেগজনক- বলছিলেন পুলিশ সুপর সৈয়দ নুরুল ইসলাম।

উল্লেখ্য, এখন পর্যন্ত কুমিল্লায় আক্রান্ত হয়েছেন প্রায় তিন হাজার ৮০০ জনের মতো, পুলিশ আক্রান্ত হয়েছে প্রায় ২০০। কুমিল্লায় সাধারণ মানুষের করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়ে গেছে এবং এটা প্রতিদিনই উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।

সেই প্রেক্ষাপটেই কুমিল্লার অধিকাংশ জায়গা সরকারের নীতিমালা অনুসারে রেড জোন ঘোষণা করা হয়েছে। সেই রেড জোনগুলোতে জেলা পুলিশ পর্যায়ক্রমে লকডাউন ঘোষণা করছে।

তিনি জানান, ‘সামনে আমাদের চ্যালেঞ্জ কুরবানির ঈদ এবং পশুরহাট। এ বিষয়ে আমাদের জেলার দায়িত্বে রয়েছেন মাননীয় সচিব মহোদয়, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক এবং আমি সবাই আমরা ভিডিও কনফারেন্স ঠিক করেছি। অনলাইনে গরু বিক্রির উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।

তারপরও কিছু হাট খোলা থাকবে, সেগুলোতে যাতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে সে ব্যাপারে আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। একটা কথা জোর দিয়ে বলতে পারি, আমরা সেই দেওয়ানি আমল থেকে কাজ করছি এবং শেষ পর্যন্ত যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমরা সামনের কাতারে থাকবো এবং সেখান থেকে আমরা কোনোভাবেই পিছ পা হবো না।

সুতরাং করোনা মোকাবিলায় যা যা আমাদের করণীয় সরকারের নির্দেশনা, আইজিপি মহোদয়ের নির্দেশনা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশনাসহ যা যা থাকবে সবকিছুই আমরা বাস্তবায়ন করবো।

মো. মাহবুবুর রহমান, পুলিশ সুপার (চাঁদপুর) : চাঁদপুর জেলা পুলিশ সুপার মো. মাহবুবুর রহমান করোনা আক্রান্ত হয়ে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকায় তার পক্ষে আমার সংবাদের সাথে কথা বলেছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন), সদ্য পদোন্নতিপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান।

তিনি বলেন, ‘করোনা সংকট শুরুর পর থেকেই সম্মুখ সারিতে কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ পুলিশ। চাঁদপুর জেলা পুলিশ এর ব্যতিক্রম নয়। আমরা সবাইকে নিয়ে একসাথে কাজ করছি। মাঠপর্যায়ের যত ক্রাইসিস তার সবই আমরা মোকাবিলা করার চেষ্টা করছি।

এ পর্যন্ত আমাদের ৭০ জন পুলিশ সদস্য করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। মূলত মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়েই আমাদের সদস্যরা আক্রান্ত হয়েছেন। কারণ স্বাভাবিকভাবেই পুলিশ যেহেতু সম্মুখ সারিতে রয়েছে এবং মাঠপর্যায়ে কাজ করে থাকে সেভাবেই আক্রান্ত হয়েছে।

তারপরও আমরা আমাদের ডিপার্টমেন্টের পক্ষ থেকে, সদর দপ্তর থেকে বিভিন্ন ধরনের সুরক্ষাসামগ্রী পাচ্ছি। আমাদের নিজস্ব সোর্সের মাধ্যমে আমরাও জনগণের মাঝে সুরক্ষাসামগ্রী বিতরণ করছি। যাতে করে আমরা নিজেরা সুরক্ষিত থেকে অপরকে সহযোগিতা করতে পারি।

এছাড়া হিন্দু ও মুসলমান যারা মারা যাচ্ছে, তাদের দাফন করতে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের সামাজিক বাধা আসছে। সেসব বাধা নিষ্পত্তি করে মৃতদের জানাজা নামাজ, দাফন সম্পন্ন করতে কাজ করে যাচ্ছে চাঁদপুর জেলা পুলিশ।’

মো. মিজানুর রহমান আরও জানান, ইতোমধ্যে চাঁদপুর জেলা পুলিশের কয়েকজন অফিসার দৃষ্টান্তমূলক কাজ করেছে। হাজীগঞ্জ সার্কেল নিজেরাই গিয়ে কবর খুঁড়ে দাফন সম্পন্ন করেছেন। এছাড়া আরও অনেকেই এ ধরনের কাজ করছেন।

ড. এ এইচ এম কামরুজ্জামান, পুলিশ সুপার (লক্ষ্মীপুর) : বাংলাদেশ করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার পর পুলিশের প্রত্যেকটি ইউনিটের ন্যায় লক্ষ্মীপুর জেলা পুলিশও সম্মুখ সারিতে থেকে কাজ করে যাচ্ছে। শুরুতেই জনগণকে সচেতন করার জন্য মাইকিং, লিফলেট বিতরণ, বিভিন্ন বাজারে ছোট ছোট কমিটি, বিভিন্ন ইউনিয়নে, গ্রামে-গ্রামে, ওয়ার্ডে কমিটি করা হয়েছে।

ওই তালিকা থানা পুলিশ থেকে শুরু করে স্থানীয় নেতাদের কাছে দিয়ে এবং তাদের মাধ্যমে জনগণকে সচেতন করার চেষ্টা করছে লক্ষ্মীপুর জেলা পুলিশ।

পুলিশ সুপার জানান, ‘আমরা নিজেদের থেকে হ্যান্ড স্যানিটাইজার, মাস্ক, হ্যান্ডগ্লোভস বিতরণ করেছি। হাট-বাজারে যাতে সর্বাধিক দূরত্ব বজায় রাখতে পারে সেজন্য দোকানপাটের সামনে বৃত্ত এঁকে দিয়েছিলাম। পুলিশের গাড়িতে মাইক লাগিয়ে প্রচারণা করে জনগণকে সচেতন করেছি। মসজিদের ইমামের মাধ্যমে জনগণকে সচেতন করেছি। দৈনন্দিন অপরাধ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি এই কাজটি আমরা শুরু থেকেই করে যাচ্ছি।

সর্বপ্রথম গত ১২ এপ্রিল আমাদের একজন পুলিশ সদস্য ঢাকা থেকে এসে করোনা আক্রান্ত হয়েছেন, তার পরিবারের ১২ সদস্যও আক্রান্ত হয়েছিলেন।

এরপর থেকেই বিভিন্ন জায়গা থেকে লোকজন আসায় এ জেলায় করোনা সংক্রমণ বেশি হয়। আমরা জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে সবাইকে নিয়েই করোনা মোকাবিলা করে যাচ্ছি। যখন কোনো কারণে রোগী শনাক্ত হচ্ছে তখন তার বাড়িটি আইডেন্টিফাই করা, তার কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করাসহ যারা গরিব তাদের সরকারের এবং আমাদের নিজেদের পক্ষ থেকে বিভিন্নভাবে সাহায্য করে যাচ্ছি।’

তিনি আরও জানান, ‘আমাদের সদস্যদের সুরক্ষিত রাখার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ মাস্ক, হ্যান্ডগ্লাভস, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, আই প্রটেক্টর পুলিশ সদর দপ্তর থেকে সহায়তা করেছে এবং আমাদের নিজস্ব উদ্যোগে সংগ্রহ করেছি।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে কথা বলেছেন, আইজিপি স্যার ছবি এঁকে দিয়েছেন নির্দেশনা দিয়েছেন- এসবের সমন্বয়েই আমরা করোনা মোকাবিলায় সম্মুখ সারিতে থেকে কাজ করে যাচ্ছি।’

উল্লেখ্য, করোনাযুদ্ধে লক্ষ্মীপুর জেলার পুলিশের ৬৪ জন পুলিশ কর্মকর্তা আক্রান্ত হয়েছেন। তার মধ্যে ৩০ জন সুস্থ হয়ে কাজে ফিরেছেন। বাকি ৩০ জন বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

আলমগীর হোসেন, পুলিশ সুপার (নোয়াখালী) : করোনা সংকটের শুরু থেকেই সংক্রমণ এবং বিস্তার রোধে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার পাশাপাশি সর্বসাধারণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে জেলা এবং সব উপজেলায় নিজে এবং সংশ্লিষ্ট থানার অফিসার ইনচার্জদের উদ্যোগে মাইকিং, লিফলেট বিতরণ, স্ব-স্ব এলাকার জনপ্রতিনিধি, কমিউনিটি পুলিশিং সদস্য এবং গ্রাম পুলিশদের মাধ্যমে বিভিন্ন জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন নোয়াখালীর পুলিশ সুপার আলমগীর হোসেন।

আক্রান্ত রোগীদের জরুরি সেবা প্রদানের লক্ষ্যে কুইক রেসপন্স টিম গঠনসহ বিদেশ থেকে প্রত্যাগত প্রবাসীদের নাম-ঠিকানা সংগ্রহ করে প্রত্যেকের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ১৪ দিনের হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করেছে জেলা পুলিশ।

পুলিশ সুপার জানান, ‘লকডাউন নিশ্চিতকরণে জরুরি সেবার আওতাধীন যানবাহন ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির চলাচল ব্যতিরেকে রাস্তায় হাট-বাজার, দোকানপাট জেলা ও সব উপজেলায় এবং আন্তঃউপজেলায়, সর্বসাধারণের অপ্রয়োজনীয় ঘোরাঘুরি/চলাচল নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে প্রধান প্রধান সড়ক সমূহে পুলিশি টহল জোরদার করেছি।

অন্য জেলার সীমান্তবর্তী থানা সমূহে বাইরের জেলা থেকে জনসাধারণের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে স্থায়ী পুলিশি চেকপোস্ট স্থাপনসহ গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়। হাট-বাজারে জনসাধারণের সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতকল্পে জেলা এবং সব উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ হাট-বাজারসমূহ সার্বিক পুলিশি নিরাপত্তায় উম্মুক্ত জায়গায় স্থানান্তর করি। সরকারি এবং বেসরকারি ত্রাণসামগ্রী বিতরণকালে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার নিশ্চিতকরণে পুলিশি তৎপরতাও বৃদ্ধি করা হয়।’

নোয়াখালী পুলিশ সুপারের কার্যালয় এবং প্রতিটি থানার প্রবেশমুখে হাতধোয়ার বেসিন, জীবাণুনাশক স্প্রে ইত্যাদির ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় ভিটামিন ‘সি’ ও ‘ডি’ এবং জিংকসহ হোমিওপ্যাথিক ওষুধসামগ্রী বিতরণ করা হয়। দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় পুষ্টিকর ও আমিষ জাতীয় খাদ্য অর্থাৎ দুধ, ডিম, কলা, খেজুর, মাছ, মাংস ইত্যাদি সন্নিবেশ করা হয়েছে বলে জানান পুলিশ সুপার।

তিনি বলেন, ‘নিজ অর্থায়নে কোয়ারেন্টইনকালীন স্বাভাবিক কর্মহীন হয়ে পড়া দুস্থ, অসহায়, প্রতিবন্ধী, সুবিধাবঞ্চিত (বেদে, হিজড়া, ভিক্ষুক) সম্প্রদায়, অসহায় পুলিশ মুক্তিযোদ্ধা, কর্তব্যরত অবস্থায় নিহত পুলিশ পরিবার ও অসহায় অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ পরিবার, প্রবাসী পরিবার, উপকূলবর্তী নদীভাঙনের ফলে বাস্তুচ্যুত পরিবার এবং জেলার বিভিন্ন শ্রেণির সংবাদকর্মীদের মাঝে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রীসহ সুরক্ষা সামগ্রী (সাবান, মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার) ইত্যাদি বিতরণ করেন।

খোন্দকার নুরুন্নবী, পুলিশ সুপার (ফেনী) : আপনি জানেন যে, সেন্ট্রাল অর্ডার রয়েছে দোকানপাট ৭টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। মানে ইকোনমিক অ্যাক্টিভিটি ৭টা পর্যন্ত চালু থাকবে। ৭টার পর কেউ মুভমেন্ট করতে পারবে না। যতক্ষণ না জরুরি কোনো কাজ থাকে।

যেমন জরুরি প্রয়োজনে ফার্মেসিতে যাওয়া দরকার বা হাসপাতালে যাওয়া দরকার এটা বাদে অন্যান্য ইকোনমিক কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। ইকোনমিক অ্যাক্টিভিটি যেহেতু আবার চালু হয়েছে, তাই আমরা বিভিন্নভাবে লিফলেটের মাধ্যমে, মাইকিংয়ের মাধ্যমে এবং জনপ্রতিনিধি যারা আছেন, সাংবাদিক এবং ফেসবুকের মাধ্যমেও জনগণকে সচেতন করার চেষ্টা করছি। আমরা জনগণকে জানানোর চেষ্টা করছি যে, আপনারা প্রটেক্টিভ গিয়ারে ইকোনমিক কার্যক্রম চালাবেন, নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখবেন এবং কার্যক্রম চালাবেন। কথাগুলো বলছিলেন ফেনীর পুলিশ সুপার খোন্দকার নুরুন্নবী।

তিনি বলেন, ‘সবাই এখন জেনে গেছেন যে, কেউ আক্রান্ত হলে কোথায় চিকিৎসা নিতে হবে, কোন হসপিটালে যেতে হবে এবং ফোনে ফোনেও ওষুধ নেয়া যাবে কিনা সে কার্যক্রমগুলো এখন চালু আছে। যেহেতু এখন সবাই মোটামুটি ইকোনমিক অ্যাকটিভিটিসের সাথে জড়িত সেহেতু প্রাণের বিষয় আর নাই। কানের বিষয়ে কেউ আমাদের আপাতত ফোন দিচ্ছেন না।

তারপরও কিছু কিছু ফোন আমরা পাই এবং সেগুলোর ব্যবস্থা আমরা নিচ্ছি। আর সন্ধ্যার পর থেকে পুরনো নির্দেশ- সব বন্ধ থাকবে। হাইওয়েতে বাস-ট্রাক সেগুলো চালু থাকবে যেগুলো জরুরি পণ্য বহন করছে সেগুলো। কেউ ট্রাকে করে চলে এক জায়গা থেকে অন্যত্র যাবেন সেটা হবে না।

কেউ সন্ধ্যার পরে চলাফেরা করবে, আড্ডা মারবে, পার্কে ঘুরবে, নদীর পাড়ে আড্ডা মারবে সেটাও হবে না। মানুষজন যেন ঘরে থাকে এবং পরিবারের সাথে থাকে এটা আমরা বজায় রাখার চেষ্টা করছি। দৈনন্দিন অপরাধ নিয়ন্ত্রণেও আমরা আগের মতোই কাজ করছি।’

মোহাম্মদ আব্দুল আজিজ, পুলিশ সুপার (খাগড়াছড়ি) : বৈশ্বিক মহামারিতে রূপ নিয়েছে করোনা। এর আঘাত থেকে কেউই মুক্ত নন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার যে বিধি এবং এগুলোর আলোকে বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তরের এসওপিতে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যরা করোনা মোকাবিলায় কিভাবে কাজ করবে সে বিষয়ে গাইডলাইন দিয়েছে খাগড়াছড়ি জেলা পুলিশ।

পুলিশ সুপার জানান, ‘কিভাবে আমরা দায়িত্ব পালন করবো, কিভাবে নিজেদের সুরক্ষিত রাখবো, পুলিশ সদস্যরা আক্রান্ত হলে এবং থানায় কোনো সদস্য আক্রান্ত হলে কিভাবে থানা চালু থাকবে, পুলিশ লাইন্স কিভাবে চলবে, কিভাবে জেলা পুলিশের কার্যক্রম চলবে, কেউ আক্রান্ত হলে কিভাবে বিকল্প ব্যবস্থায় চলতে পারে পুলিশি কার্যক্রম (আপনারা জানেন থানা বন্ধ রাখার সুযোগ নেই)- সেক্ষেত্রেও আমরা গাইডলাইনের আলোকে আমাদের বিকল্প বিধিগুলো নিশ্চিত করেছি। আমরা আমাদের ডিউটিগুলো রোস্টারিং করেছি। কোনো একটি গ্রুপের যদি কেউ আক্রান্ত হয় তাহলে বাকি সদস্যরা যাতে কাজ করে যেতে পারেন।’

বাংলাদেশ পুলিশের সবচেয়ে বেশি সদস্য আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে খাগড়াছড়িতে ১২২ জন আক্রান্তের ঘটনা আছে। তবে স্বস্তির খবর হলো এখন পর্যন্ত একজনও মৃত্যুর ঘটনা নেই। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ডিউটি করেন কিছু সদস্য। সেখান থেকেও কিছুসংখ্যক পুলিশ সদস্যকে করোনা পজেটিভ পাওয়া গেছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের পুলিশ সদস্যের স্বাস্থ্য উপকরণ যথাযথ সরবরাহ করার চেষ্টা করছি।

তারপরও দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কোনো সদস্য আক্রান্ত হলে আমরা সংশ্লিষ্ট গাইডলাইন অনুসরণ করছি। খাগড়াছড়ি পুলিশ লাইন স্কুলকে আমরা কোয়ারেন্টাইন করেছি। বাইরে থেকে কোনো সদস্য ডিউটি করে এলে আমরা তাদের সেখানে পাঠিয়ে দেই। এছাড়া হোটেল ইকোছড়ি ইন এবং যুব উন্নয়নের একটি বিল্ডিং জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে আমাদের সদস্যদের আইসোলেট করার জন্য প্রস্তুত রাখা আছে।

কোনো সদস্য আক্রান্ত হলে তাদের মৌসুমী ফলসহ উন্নত খাবার দাবারের ব্যবস্থা আমরা রেখেছি।’ খাগড়াছড়ি জেলা পুলিশের আড়াই হাজার সদস্যের মধ্যে ১২২ জন করোনা আক্রান্ত সদস্যের মধ্যে গত শুক্রবার পর্যন্ত ২৮ জন সুস্থ হয়েছেন এবং ডিউটিতে ফিরেছেন। বাকি সদস্যরা এখন পর্যন্ত সুস্থ রয়েছেন। এছাড়া সংক্রমণের সংখ্যাও কম।

মো. আলমগীর কবির, পুলিশ সুপার (রাঙ্গামাটি) : ভৌগলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের অন্যান্য জেলার চেয়ে রাঙ্গামাটি জেলা ভিন্ন। এখানে অপরাধ অনেক কম। আঞ্চলিকতার কারণে কিছু অপরাধ সংঘটিত হয়।

এছাড়া চুরি-ডাকাতির মতো অপরাধ খুব কম। করোনা শুরু থেকে পুলিশ হেডকোয়ার্টার এবং সরকারের নির্দেশনা যেগুলো রয়েছে সেগুলো বাস্তবায়নের চেষ্টা করে যাচ্ছে রাঙ্গামাটি জেলা পুলিশ। জেলা পুলিশ সুপার জানান, ‘বাংলাদেশের সর্বশেষ জেলা হিসেবে করোনা আক্রান্তের জেলা রাঙ্গামাটি।

এই জেলায় আক্রান্ত এবং মৃত্যুর হার তুলনামূলকভাবে অনেক কম। বাঙালি এবং উপজাতি যারা আছেন তারা সবাই সচেতন। তারপরও জনপ্রশাসন থেকে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।

এবং এগুলো যাতে বাস্তবায়ন হয় সেজন্য মাইকিং-লিফলেটসহ বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচারণা ব্যাপকভাবে চালানো হচ্ছে। যে সময়টাতে লোকজন ছিলো সেই সময়েও আমরা লকডাউন বাস্তবায়নের জন্য কাজ করেছি। লকডাউন চলাকালীন সময়ে বিভিন্নভাবে অসহায় ও দরিদ্রদের মাঝে সাহায্য পৌঁছে দিয়েছি।

শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করেছি। যারা মাস্ক পরে না, সামাজিক দূরত্ব মানে না এবং যে বাজারগুলো রয়েছে সেগুলো সরকার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যেনো বন্ধ করে সেজন্য কার্যক্রম চালাচ্ছি। পাশাপাশি দৈনন্দিন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে মোবাইল পেট্রোলিংসহ যাবতীয় কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবেই চলছে এবং চালাচ্ছি। মামলা হলেই আসামি গ্রেপ্তার করছি।’

উল্লেখ্য, রাঙ্গামাটি জেলার এ পর্যন্ত ১৩৮ জন পুলিশ সদস্য করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। তার মধ্যে ৪৮ জন সুস্থ হয়েছেন। বাকিরা চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

জেরিন আখতার, পুলিশ সুপার (বান্দরবান) : আমরা করোনা সংকটের প্রথম থেকেই প্রচারণামূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। প্রতিটি থানায় থানায় লিফলেট, জীবাণুনাশক টানেল বিতরণ করেছি। তারা যেন আমাদের কাছে আসতে পারে সে ব্যবস্থা করেছি।

এখনো করোনা মোকাবিলায় জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার কাজ করে যাচ্ছি। আমরা নিজেদের ফোর্সকে যেভাবে সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা করেছি, সেভাবে জনগণকেও সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা করছি। কথাগুলো বললেন বান্দরবানের পুলিশ সুপার জেরিন আখতার।

তিনি বলেন. ‘বিভিন্ন রাস্তার প্রবেশমুখে চেকপোস্ট বসিয়ে জনগণের চলাফেরার নিয়ন্ত্রণ করছি। বান্দরবানের সদর এবং লামা উপজেলায় বর্তমানে রেড জোন চলছে। পুলিশি কার্যক্রম জনগণ এখন মোটামুটি মেনে চলছে, চলাফেরা অনেকটা নিয়ন্ত্রিত।

বান্দরবানে যেভাবে করোনা আক্রান্তের হার বাড়ছে সেটাও এখন অনেকটা নিয়ন্ত্রিত। জনগণ যদি আমাদের সহযোগিতা করে ইনশাআল্লাহ আমরা ভালোভাবে করোনা মোকাবিলা করতে পারবো।’

তিনি আরও বলেন, ‘আপনারা জেনে থাকবেন আমরা বিভিন্নভাবে জনগণকে সাহায্য করে যাচ্ছি। আমাদের একটি গাড়ি আছে যেটি দিয়ে ডোর টু ডোর জনগণের চাহিদাভিত্তিক সেবা দিয়ে যাচ্ছি।

সংকট শুরুর পর থেকে যারা নিম্ন মধ্যবিত্ত তাদেরও হটলাইন নম্বরের মাধ্যমে পরিচয় গোপন রেখে সহযোগিতা করে যাচ্ছি, যারা অসহায় হয়ে পড়লেও মুখ খুলে সাহায্য চাইতে পারছে না।

এখন পর্যন্ত এ রকম অসংখ্য ফোন আমরা পেয়েছি এবং সাহায্য করেছি।’ উল্লেখ্য, বান্দরবান জেলা পুলিশের ৬০ সদস্য এখন পর্যন্ত করোনা আক্রান্ত বলে জানিয়েছেন পুলিশ সুপার। ২০ জনের মতো ইতোমধ্যে সুস্থ হয়েছেন। আক্রান্ত বাকিদের মধ্যে এখন পর্যন্ত কারো অবস্থাই আশঙ্কাজনক নয়।

এস এম রশিদুল হক, পুলিশ সুপার (চট্টগ্রাম) : আমার সংবাদের সঙ্গে আলাপকালে চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার এসএম রশিদুল হক বলেন, ‘আমরা শুরু থেকেই কোয়ারেন্টাইন, সাধারণ ছুটির মধ্যে অবস্থিত লকডাউন কার্যকর করা, জনগণকে সচেতন করাসহ যাবতীয় কার্যক্রম কার্যকরভাবে করেছি।

পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে প্রায় সাত হাজার পরিবারকে ত্রাণ দিয়েছি। আর আমাদের পুলিশ সদস্যদের আমরা মাস্ক, পিপিই হ্যান্ড স্যানিটাইজার, হ্যান্ডগ্লাভস, ফেস শিল্ড, গগজ এগুলো নিয়মিত দিয়ে যাচ্ছি।

একইভাবে হেক্সিসলসহ যাবতীয় সামগ্রী গতকালও দিয়েছি আমি আমার সদস্যদের। আর এর বাইরে অপরাধ এখন তুলনামূলকভাবে খুবই কম। রোজার মধ্যে অপরাধ একটু বৃদ্ধি পেলেও সার্বিকভাবে করোনাকালে অপরাধ কিন্তু কম।’

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশে এখন পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা ২৯০। তার মধ্যে সুস্থ হয়ে ফিরেছেন ১৭০ জন। বাকিরা এখনো চিকিৎসা নিচ্ছেন। আর মৃত্যুবরণ করেছেন দুজন।

এ বি এম মাসুদ হোসেন, পুলিশ সুপার (কক্সবাজার) : করোনার শুরু থেকেই কাজ করে যাচ্ছে কক্সবাজার জেলা পুলিশ। গত ১৮ মার্চ কক্সবাজারে প্রথম করোনা রোগী ধরা পড়ে, সৌদি ফেরত একজন হজযাত্রী। এরপর ২০ মার্চ থেকে কক্সবাজার পর্যটকদের জন্য বন্ধ করে দেয়া হয়।

পুলিশ সুপার বলেন, ‘সরকারি বিধি নিষেধগুলো বাস্তবায়নের জন্য আমাদের যেসব গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলো আছে সেগুলোতে আমরা চেক পয়েন্ট বসিয়েছিলাম। এখানে যারা ব্যবসায়ী আছেন তাদের বেশিরভাগের বাড়ি হলো চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ও লোহাগাড়ার।

লকডাউনের প্রথম এক মাস খুব ভালো চলেছে এখানে। একমাস পরই কিছু শিথিলতা দিলো সরকার। এরপর এখানকার বাসিন্দারা তাদের বাড়িঘরে ফিরে আসা শুরু করলো এবং করোনা সংক্রমণ শুরু হলো।

আবার এখানকার কিছু ব্যবসায়ী আছেন যারা পান নিয়ে যান নারায়ণগঞ্জ এবং গাজীপুরে তাদের মাধ্যমেও সংক্রমণ হয়েছে। সেই যে শুরু হলো এটা আর থামছে না।

ইতোমধ্যে আমাদের ১২৫ জন সদস্য আক্রান্ত হয়েছেন। ৪০ জন সদস্য সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে কাজে ফিরেছেন। এখানে আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো দুই প্রকার। একটা লকডাউন বাস্তবায়ন করা।’

তিনি আরও বলেন, ‘দৈনন্দিন অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা হলো একটা চ্যালেঞ্জ। লকডাউনের কারণে চাকরি ছেড়ে ব্যবসা বন্ধ করে বাড়িতে এসে সামাজিক বিরোধে জড়িয়েছেন অনেকে। পারিবারিক বিরোধ রয়েছে অনেকের। এসব কারণে অপরাধ ব্যাপকহারে বেড়ে গিয়েছিল। এপ্রিল এবং মে এই দুই মাসে এ ধরনের অপরাধ ব্যাপক আকারে বেড়ে গেছে।

বিশেষ করে মহেশখালীতে অপরাধ বেশি ঘটেছে। ২৬টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। আরেকটা চ্যালেঞ্জ হলো আমাদের পুলিশ সদস্যদের আইসোলেশন কোয়ারেন্টাইন এবং চিকিৎসা নিশ্চিত করা।

আরেকটা কথা হলো আমরা করোনার শুরু থেকে হাজার হাজার অসহায় মানুষকে নিজস্ব ফান্ড থেকে সহযোগিতা করেছি। আরও একটা কাজ আমরা করেছি সেটা হলো সাধারণ মানুষ করোনা আক্রান্ত হলে তাদের আনা-নেয়ার জন্য ফ্রি অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসের ব্যবস্থা করেছি।’

এ এইচ এম আবদুর রকিব, পুলিশ সুপার (চাঁপাইনবাবগঞ্জ) : চাঁপাইনবাবগঞ্জ পুলিশ সুপার এ এইচ এম আবদুর রকিব জানান, ‘করোনা মোকাবিলায় সক্রিয় ভূমিকা রাখছে জেলা পুলিশ।

স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে জেলাব্যাপী চলছে পুলিশের বিভিন্ন কার্যক্রম। করোনা প্রার্দুভাবের শুরু থেকেই জেলার গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে অবস্থান করে ও মাইকিংয়ের মাধ্যমে করোনার বিরুদ্ধে সবচাইতে কার্যকর পদ্ধতি ‘সামাজিক দূরত্ব’ সৃষ্টিতে সহায়তা করে আসছে জেলা পুলিশ।

মাদক উদ্ধার, হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন, চুরি-ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধ দমনের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বিতভাবে করোনার সংক্রমণ রোধে আরও বেশ কিছু কার্যক্রম পরিচালনা করছে জেলা পুলিশ।’

তিনি আরও জানান, ‘মানুষজন যেনো অপ্রয়োজনে ঘোরাফেরা না করে, কোথাও জমায়েত তৈরি না করে এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখে তা নিশ্চিত করতে পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা রাস্তায় চেকপোস্ট পরিচালনা থেকে শুরু করে বিভিন্ন এলাকায় টহল দেয়া এবং জনসচেতনতা তৈরির কাজ করে আসছে।

এছাড়াও জেলা পুলিশের সদস্যরা করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের তালিকা প্রস্তুত এবং বিদেশ থেকে প্রত্যাগত ব্যক্তিদের কোয়ারেন্টাইনে থাকা নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসন কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপ সমূহে সহায়তা ও সমন্বয় করছে। এমনকি দুস্থদের মাঝে খাদ্য সহায়তাও প্রদান করছে তারা।’

তিনি বলেন, ‘পুলিশ কোয়ারেন্টাইন বাস্তবায়ন করতে বাড়ি বাড়ি যাচ্ছে। অনেকের বাড়ি গিয়ে জরুরি ত্রাণ ও খাবার পৌঁছে দিয়েছে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করার জন্য প্রশাসনের সঙ্গে বাজার নিয়ন্ত্রণ অভিযানে গিয়েছে। এভাবে মানুষের সংস্পর্শে যেতে হয়েছে পুলিশকে। পুলিশের ডিউটির ধরনটাই এরকম যে মানুষের সংস্পর্শে না এসে দায়িত্ব পালন করা সম্ভব হয় না।’

মোহাম্মদ সালাম কবির, পুলিশ সুপার (জয়পুরহাট) : জয়পুরহাট পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সালাম কবির বলেন, ‘করোনা ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধ, সচেতনতা ও স্বাস্থ্যসুরক্ষার জন্য নিম্নোক্ত উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। সকল পুলিশ অফিসার ও ফোর্সদের করোনা ভাইরাস সংক্রমণ-সংক্রান্ত সচেতন করা হয়েছে এবং নিয়মিতভাবে ব্রিফিং করা হচ্ছে।

প্রত্যেক পুলিশ সদস্যের মাঝে মাস্ক, হ্যান্ডগ্লাভস, সাবান এবং স্যানিটাইজারসহ প্রত্যেকটি ইউনিটে সাবান, স্প্রে মেশিন, রেইন কোট, পিপিই বিতরণ করা হয়েছে। করোনা উপসর্গ বা আক্রান্ত পুলিশ সদস্যদের জন্য পুলিশ লাইন্স হাসপাতালে ২০ বেডের আইসোলেশন ওয়ার্ড তৈরি করা হয়েছে।

সকল পুলিশ ইউনিটে পুলিশ সদস্যদের এবং বহিরাগত সেবাপ্রার্থীদের প্রবেশের আগে নিজেদের জন্য হ্যান্ডওয়াশ/সাবান দ্বারা নিয়মিত হাত ধোয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করা হয়েছে।

সকল ইউনিটের পুলিশ সদস্যের পরিধেয় পোশাক-পরিচ্ছদ নিয়মিতভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে ও নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে। সকল পুলিশ ইউনিটে ফ্লোর নিয়মিতভাবে সকালে ও রাতে জীবাণুনাশক দ্বারা পরিষ্কার করা হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘জেলা পুলিশ হাসপাতালে জরুরি প্রয়োজনে অক্সিজেন সিলিন্ডার, লেবুলাইজার ও প্রয়োজনীয় ওষুধ ক্রয় করা হয়েছে এবং ফোর্সদের অগ্রিম ৩ মাসের রেশন সংগ্রহ করা হয়েছে।

প্রত্যেক চেকপোস্টে পালাক্রমে ডিউটিরত পুলিশ সদস্যদের জন্য এক বোতল মিনারেল ওয়াটার, শুকনা খাবার, প্যাকেটজাত কেক সরবরাহ করা হচ্ছে। উিউটি শেষে ব্যারাকে ফেরত আসার পর সকল পুলিশ সদস্যকে সাবান ব্যবহারপূর্বক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হওয়ার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

প্রত্যেক থানা/ইউনিটে পুলিশ সদস্যদের কমপক্ষে দিনে দুই বার করে ইনফ্রারেড থার্মোমিটার দ্বারা শরীরের তাপমাত্রা পরিমাপ করা হচ্ছে।

এছাড়াও বহিরাগত দর্শনার্থীদের প্রবেশের পূর্বে তাপমাত্রা মাপা হচ্ছে। বয়স্ক ও রোগমুক্ত পুলিশ সদস্যদের থানার বাইরে জরুরি ডিউটিতে না দেয়া এবং তাদের পৃথক কমপার্টমেন্টের থাকার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।’

প্রত্যেক পুলিশ ইউনিটের সব সদস্যকে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চেকপোস্ট ডিউটিসহ অন্যান্য কাজকর্ম করার জন্য ব্রিফ করা ও নিয়মিত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ (পুলিশ সুপার, অতি. পুলিশ সুপার ও সহ. পুলিশ সুপার) তা পরিদর্শনপূর্বক রিপোর্ট নেয়া হচ্ছে। জয়পুরহাট থানায় মোট নমুনা সংগ্রহ-১৭২৯, নেগেটিভ-১৫৮৫, পজেটিভ-৭৩। এর মধ্য বেশির ভাগই সুস্থ হয়ে গেছেন।

আব্দুল মান্নান মিয়া, পুলিশ সুপার (নওগাঁ) : নওগাঁ পুলিশ সুপার প্রকৌশলী আবদুল মান্নান মিয়া বিপিএম বলেন, ‘প্রতিদিন অসংখ্য সাহায্যপ্রার্থী মানুষের ফোন/মেসেজ আসে আমাদের কাছে। আমরা প্রতিটি সাহায্যপ্রার্থী অসহায় মানুষকে সাহায্য করার চেষ্টা করে চলেছি। সেটা দিন হোক বা গভীর রাত, পুলিশ সদস্যরা মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে চলছে। ভবিষ্যতেও এ চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘করোনার প্রথম থেকেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশক্রমে আমরা করোনাযুদ্ধের সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে কাজ করে চলেছি।

মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমাদের সরাসরি দিকনির্দেশনা দিয়েছেন এবং আমাদের অভিভাবক ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ মহোদয় সার্বক্ষণিক আমাদের নির্দেশনা দিয়েছেন এবং যোগদানের কিছুদিনের মধ্যেই তিনি করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় পুলিশ সদস্যদের করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়ক প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা-সংবলিত স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর প্রণয়ন করে দিয়েছেন।

প্রতিটি পুলিশ ইউনিট সেই মোতাবেক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। পুলিশ সদস্যদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তার ভেতরে রেখে তারা যেন সর্বোত্তম সেবা প্রদান করতে পারে সে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।

এছাড়াও প্রতিটি সদস্যকে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স থেকে সরবরাহকৃত বিভিন্ন প্রকার ওষুধ, ভিটামিন সি প্রদান করা হয়েছে। প্রতিটি সদস্যের পর্যাপ্ত ভিটামিন সমৃদ্ধ খাবার নিশ্চিত করার জন্য প্রতিটি পুলিশ মেসে পুষ্টিকর খাবার প্রদান নিশ্চিত করা হয়েছে।

এই জেলা পুলিশের মোট ৪৫ জন সদস্য করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন যাদের মধ্যে ২৯ জন ইতোমধ্যে সুস্থ হয়েছেন এবং বাকি ১৫ জন শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ আছেন।’

লিটন কুমার সাহা, পুলিশ সুপার (নাটোর ) : করোনা রোধে জনসচেতনতামূলক লিফলেট ও মাস্ক বিতরণ করা হয় নাটোর জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে। সরকারি নির্দেশনা অনুসারে শপিংমল, দোকান-পাট বন্ধ। কাঁচা বাজার, ফার্মেসি, হাসপাতাল এবং জরুরি সেবা প্রতিষ্ঠান খোলা রাখা হয়। নাটোরের গণমাধ্যমকর্মীদের মাঝে পিপিই বিতরণ করেন পুলিশ সুপার। স্পেশাল রেসপন্স টিম গঠন করে স্বাস্থ্যসেবা দেয়া হয়েছে।

পুলিশ সুপার লিটন কুমার সাহা বলেন, ‘স্পেশাল রেসপন্স টিম জেলার যেকোনো এলাকায় করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের বিষয়ে দ্রুত সেবা প্রদান করবে। অসহায় ও দুস্থদের খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়। শহরের বিভিন্ন রাস্তা জীবাণুমুক্তকরণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে।

এসময় পুলিশ সুপার সবাইকে সচেতন হওয়ার, বারবার হাত ধোয়া এবং হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহারের পরামর্শ দেন। জেলার সকল থানায় এবং চেকপোস্ট কার্যক্রমের মাধ্যমে সরকারি নিদের্শনাসমূহ পালন, হোম কোয়ারেন্টাইন ও সাধারণ মানুষকে নিজগৃহে অবস্থান করাতে সর্বাত্মক কাজ করে যাচ্ছে পুলিশ, সেই সাথে সকল জনসাধারণকে সতর্ক অবস্থানে থেকে স্বাস্থ্যবিধি ও কোয়ারেন্টাইন সঠিকভাবে মেনে চলার পাশাপাশি প্রয়োজন ছাড়া অযথা ঘরের বাইরে না যেতে এবং কোনো ধরনের গুজবে কান না দেয়ার পরামর্শ প্রদান করা হয়। এর মধ্যে নাটোরে ৩৮ জন পুলিশ সদস্য আক্রান্ত হন, সুস্থ হন ২২ জন পুলিশ সদস্য।’

আলী আশরাফ ভুঞা, পুলিশ সুপার (বগুড়া) : বগুড়া পুলিশ সুপার আলী আশরাফ ভুঞা বলেন, ‘করোনা ভাইরাস প্রাদুর্ভাবের শুরু থেকে পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছেন। প্রচণ্ড ঝুঁকি নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের করোনামুক্ত রাখতে গিয়ে শতাধিক পুলিশ সদস্য আক্রান্ত হয়েছেন। এরপরও চাঙ্গা মনোবল নিয়ে তারা মাঠে রয়েছেন।

শুধু তাই নয়, পুলিশ সুপারের সার্বক্ষণিক তদারকিতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খুবই ভালো রয়েছে। অপরাধ যেগুলো ঘটেছে সেগুলোও উদঘাটন করে আসামি গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’

জানা গেছে, গত মার্চের শেষের দিকে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ শুরুতে জনগণকে সচেতন করতে বগুড়া পুলিশ প্রায় ২০ হাজার লিফলেট বিতরণ করে। পুলিশ সুপার আলী আশরাফ ভুঞার নেতৃত্বে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের মাঝে লিফলেটগুলো বিতরণ করা হয়। একমাত্র জলকামান দিয়ে জেলা সদর ও ১২ উপজেলায় জীবাণুনাশক ছিটানো হয়েছে।

এ কার্যক্রম এখনো অব্যাহত রয়েছে। মহাসড়কে চলাচলকারী যানবাহনেও এ কার্যক্রম চলমান আছে। পুলিশের প্রত্যেক স্থাপনার প্রবেশমুখে সচেতনতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন ও জীবাণুমুক্ত হয়ে প্রবেশের ব্যবস্থা চালু রয়েছে।

প্রত্যেক পুলিশ সদস্যের মাঝে সুরক্ষাসামগ্রী পিপিই, মাস্ক, গ্লাভস, স্যানিটাইজার ও চশমা বিতরণ করা হয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে মৃত ব্যক্তিদের দাফনের ব্যবস্থাও করে যাচ্ছে।

উল্লেখ্য, করোনাযুদ্ধে বগুড়া জেলা পুলিশের ১১৩ সদস্য করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। ফয়সাল নামের একজন কনস্টেবল জীবন উৎসর্গ করেছেন। ইতোমধ্যে আক্রান্ত ৭০ জন সুস্থ হয়ে কাজে যোগদান করেছেন এবং বাকি সবার অবস্থা স্থিতিশীল রয়েছে।

মো. শহিদুল্লাহ, পুলিশ সুপার (রাজশাহী) : রাজশাহী পুলিশ সুপার মো. শহিদুল্লাহ বিপিএম, পিপিএম বলেন, ‘দেশ ও জাতির প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে করোনাকালীন সময় সম্মুখযোদ্ধার ভূমিকায় ছিলো রাজশাহী পুলিশ। সব সময় মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। এদের মধ্যে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ৩৪ জন পুলিশ সদস্য আর সুস্থ হয়েছেন তিনজন পুলিশ।’

তিনি বলেন, ‘মানুষকে ঘরে থাকতে উদ্বুদ্ধ করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করি। জেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে করোনাকালীন স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার সতর্কবার্তা দিয়ে বিলবোর্ড স্থাপন করা হয়। বিদেশ থেকে আগত মানুষদের হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করতে স্টিকার তৈরি করে সকল থানায় পাঠানো হয়।’

হাসিবুল আলম, পুলিশ সুপার (সিরাজগঞ্জ) : গত মার্চ মাস থেকেই করোনা প্রতিরোধে সামাজিক সচেতনতা তৈরির কাজ শুরু করে সিরাজগঞ্জ জেলা পুলিশ।

১২টি থানায় ৩০ হাজার লিফলেট বিতরণ করা হয়। এছাড়াও প্রতিটি থানায় মাইকিংয়ের মাধ্যমেও সচেতনতা তৈরির কার্যক্রম অব্যহত রাখা হয়।

২৫ মার্চ থেকে সামাজিক দূরত্বের জন্য সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণা দিলে লোকজনকে বাইরে বের হওয়ায় নিরুৎসাহিত করতে এবং ঘরে থাকতে উদ্বুদ্ধ করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন সিরাজগঞ্জ পুলিশ সুপার হাসিবুল আলম।

তিনি বলেন, ‘জেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে করোনাকালীন স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার সতর্কবার্তা দিয়ে বিলবোর্ড স্থাপন করা হয়। বিদেশ থেকে আগত মানুষদের হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করতে পাঁচ হাজার স্টিকার তৈরি করে সকল থানায় পাঠানো হয়।

বিদেশ ফেরত এবং ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ থেকে সিরাজগঞ্জে আসা প্রায় চার হাজার ২০০ মানুষের বাড়িতে হোম কোয়ারেন্টাইন স্টিকার লাগিয়ে লাল পতাকা টানিয়ে দেয়া হয়।

এসব লোকজনের হোম কোয়ারেন্টাইনকালীন স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালন নিশ্চিতকল্পে প্রতিটি বাড়িতে একজন এসআই পাঠিয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং চৌকিদার-দফাদারকে সম্পৃক্ত করে মনিটরিং করা হয়। এসব হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা অনেককে প্রয়োজনীয় খাদ্য ও নিত্যপণ্য সরবরাহ করা হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘ত্রাণ কার্যক্রমে দুর্নীতি রোধে পুলিশি অভিযানে প্রায় ২০ হাজার কেজি চাউল উদ্ধার হয়। এ সংক্রান্ত ১২ মামলায় ১৮ জনকে আইনের আওতায় আনা হলে ত্রাণ বিতরণে দুর্নীতি বন্ধ হয়।

করোনার কারণে হঠাৎ কর্মহীন হয়ে দুর্দশায় পড়েছেন কিন্তু আত্মসম্মানের কারণে কাউকে বলতে পারেননি বিধায় সরকারি ত্রাণ পাননি এমন দুই হাজার পরিবারের মধ্যে জেলা পুলিশের উদ্যোগে চাল, ডাল, আলু, তেলসহ খাদ্যসামগ্রী রাতের অন্ধকারে পৌঁছে দেয়া হয়।

এ কার্যক্রম এখনো অব্যাহত আছে। ৯৯৯-এ সংবাদ পেয়েও আমরা এমন অনেক পরিবারকে সহযোগিতা করেছি। করোনা রোগে কিংবা করোনা উপসর্গ নিয়ে মৃত পাঁচজনকে পুলিশ সদস্যরা দাফনের কার্য সম্পন্ন করেছে। পুলিশ সদস্যদের করোনার সংক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য?

বিভিন্ন প্রকার ওষুধ, ভিটামিন এবং সাবান, স্যানিটাইজার, পিপিইসহ সুরক্ষাসামগ্রী সরবরাহ করা হয়। জীবাণুনাশক টানেল স্থাপন, জীবাণুনাশক ওষুধ ও মেশিন সংগ্রহ করে পুলিশের অফিস, আবাসন এবং গাড়িগুলো নিয়মিত স্প্রে করা হচ্ছে। পুলিশ সদস্যদের পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে।’

এছাড়া কর্মহীন হয়ে পড়া দুই সহস্রাধিক দিন মজুর ও নিম্নআয়ের মানুয়ের দুঃখ-দুর্দশা লাঘবের জন্য বিভিন্ন ধরনের মানবিক সহায়তা কার্যক্রম চলমান রয়েছে বলে জানান এই পুলিশ সুপার।

এস এম তানভীর আরাফাত, পুলিশ সুপার (কুষ্টিয়া) : ‘বাংলাদেশ পুলিশের অন্যান্য ইউনিটের মতো আমরাও গ্রাম থেকে গ্রামে গিয়ে ডেম্যু করেছি। মানুষকে সচেতন করেছি। করোনা প্রতিরোধে মানুষকে কাউন্সেলিং করেছি। গোটা জেলায় আটটি চেকপোস্ট বসিয়েছি। চেকপোস্টগুলো এখনো চলছে।

চেকপোস্টের মাধ্যমে মানুষের অবাধ চলাফেরা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছি। দেশের মধ্যে আমরাই প্রথম কোয়ারেন্টাইনে লাল পতাকা ব্যবহার করি। পরবর্তীতে তা সবখানে চালু হয়েছিল।

এছাড়া বিদেশ ফেরত, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ ফেরত মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাদের ঘরে রাখতে সক্ষম হয়েছি। যাতে তাদের কারো দ্বারা করোনা সংক্রমণ না ছড়ায়। তাদের কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করেছি। পুলিশ পাঠিয়ে করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির বাড়িতে লকডাউন নিশ্চিত করেছি। তাদের বাড়িতে খাবার পাঠিয়েছি।’ কথাগুলো বলছিলেন কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার এস এম তানভীর আরাফাত।

তিনি বলেন, ‘আমরা এ পর্যন্ত ৯ হাজার ২০০ পরিবারকে ত্রাণ দিয়েছি। যা সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে। ১ এপ্রিল থেকে ২৬ মার্চ পর্যন্ত দৈনিক ২০০ লোককে খাবার খাইয়েছি। আমাদের পুলিশ নারীকল্যাণ সমিতি এ কাজে সহযোগিতা করে আমাদের। আমরা থানাগুলোকে দুইভাগে ভাগ করে ডিউটি শিফট করেছি।

এক ভাগ ১০ দিন ডিউটি করে ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইনে থেকে পুনরায় ডিউটিতে যোগ দিচ্ছেন। এখন পর্যন্ত আমার জেলা পুলিশের ৩৪ জন সদস্য করোনা আক্রান্ত হয়েছেন, তার মধ্যে ২৬ জনই সুস্থ। বাকিরা এখনো আইসোলেশনে রয়েছেন।’

এস এম শফিউল্লাহ, পুলিশ সুপার (খুলনা) : খুলনা পুলিশ সুপার এস এম শফিউল্লাহ বলেন, ‘করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে খুলনায় সব ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। জনসাধারণকে জনবহুল এলাকা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। বিভাগ, জেলা ও উপজেলাপর্যায়ে আইসোলেশন ও কোয়ারেন্টাইন ইউনিট স্থাপনের করা হয়। তিনি বলেন, বিভিন্ন প্রবেশপথে মানুষদের সাবান ও পানি দিয়ে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা রাখা দরকার।

তিনি এ সময় অযথা জনসমাবেশ না করা এবং সচেতনতা বাড়াতে মাইকে প্রচার করা হয়। আইসোলেশন ইউনিট (পৃথক রেখে নিবিড় পরিচর্যা) স্থাপন করা হয়েছে। বিদেশ থেকে আসাদের ১৪ দিন নিজের বাড়িতে আলাদা কক্ষে রাখা হয়েছে।’

মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন, পুলিশ সুপার (যশোর) : মাঠপর্যায়ে কেমন আছেন, কীভাবে তারা করোনা মোকাবিলায় নিয়োজিত আছেন এসব বিষয়ে সার্বিক দিক তুলে ধরেছেন যশোরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন।

তিনি বলেন, ‘যশোর পুলিশ করোনামুক্ত থেকে সর্বোচ্চ সেবা দিয়ে যাচ্ছে। প্রত্যেকটি পুলিশ সদস্যের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আগেই পদক্ষেপ নিয়েছিলাম। প্রথমে পুলিশ লাইন্সের পুলিশ সদস্যদের তিন ভাগে ভাগ করে তাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা আলাদা করে ফেলি। যাতে একটি গ্রুপ আক্রান্ত হলে বিকল্প গ্রুপ দিয়ে কাজ করাতে পারি।

পরবর্তী সময়ে প্রত্যেকটি থানা, ফাঁড়ি, ক্যাম্পের পুলিশ সদস্যদের তিন ভাগে ভাগ করেছি। যশোর পুলিশের এ মডেল আইডিয়া পরবর্তী সময়ে খুলনা রেঞ্জের অন্যান্য জেলা পুলিশ বিভাগে অনুসরণ করা হয়েছে। আমরাই প্রথম পুলিশ লাইন, থানা, ফাঁড়ি ও ক্যাম্পের প্রধান ফটকে জীবাণুনাশক বুথ তৈরি করেছি। প্রত্যেকটি সদস্য যতবার প্রবেশ ও বের হয়েছেন, জীবাণুনাশক স্প্রে করা হয়েছে।

এতে তারা জীবাণুমুক্ত হয়েছেন। প্রথম থেকেই প্রত্যেক পুলিশ সদস্যকে পর্যাপ্ত সুরক্ষাসামগ্রী সরবরাহ করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত যশোর পুলিশ করোনামুক্ত আছে। আমার পুলিশ সদস্যদের মধ্যে কোনো আতঙ্ক নেই। দেশের ক্রান্তিলগ্নে পুলিশ সদস্যরা সর্বোচ্চ সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।’ করোনা মোকাবিলার চ্যালেঞ্জ নিয়ে আশরাফ হোসেন বলেন, ‘তিনটি চ্যালঞ্জ ছিলো।

প্রথমত, মানুষকে ঘরে রাখা ছিলো বড় চ্যালেঞ্জ। দ্বিতীয়ত, করোনামুক্ত থেকে জনগণের সেবা নিশ্চিত করা। তৃতীয়ত, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ থেকে আসা মানুষকে ঘরে রাখা।’ সচেতনতা প্রসঙ্গে পুলিশ সুপার বলেন, ‘জেলা পুলিশ প্রথম থেকেই ত্রাণ তহবিল গঠন করেছে।

এ পর্যন্ত ছয় সহস্রাধিক কর্মহীন শ্রমজীবী প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মাঝে ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি যারা হাত পেতে খাবার চাইতে পারেন না, তাদের বাড়ি বাড়ি খাবার পৌঁছে দিয়েছি।’

জাহিদুল ইসলাম, পুলিশ সুপার (চুয়াডাঙ্গা) : মার্চের শুরু থেকেই করোনা পরিস্থিতি এবং সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়ে আমরা প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলাম। গণমাধ্যম থেকে করোনা সম্পর্কে জানতে পেরে এটা মোকাবিলার কৌশল শেখার চেষ্টা করেছি। একইভাবে চুয়ডাঙ্গার জনগণকে সচেতন করার চেষ্টা করেছি। পোস্টারিং করেছি, মাইকিং করেছি, লিফলেট বিতরণ করেছি। পোস্টারে ‘আতঙ্ক নয়, সতর্কতাই সমাধান’ স্লোগানকে প্রতিপাদ্য হিসেবে নিয়ে প্রচার করেছি।

কথাগুলো বলছিলেন চুয়াডাঙ্গার পুলিশ সুপার জাহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশনা, প্রধানমন্ত্রীর ৩১ দফা নির্দেশনা পালন করেছি। পুলিশের গাড়ি, আর্মির গাড়ি, ম্যাজিস্ট্রেটের গাড়ি একসাথে টহল দেই। মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি ঘরে থাকতে হবে। লকডাউনের ৬৬ দিন অনেকাংশেই তারা মেনেছেও।

গত ঈদের কয়েকদিন আগে থেকে সাধারণ ছুটি বা অঘোষিত লকডাউন সরানোর পর আবার কিছুটা অবাধ হয়েছে সাধারণ মানুষের চলাফেরা। তবে তাতেও আমরা নিয়ন্ত্রণ এনেছি অনেকটাই।

তিনি বলেন, হাত ধোয়া, মাস্ক ব্যবহার করা আর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে পারলেই মানুষ এ ভাইরাস থেকে মুক্ত থাকবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘করোনার শুরু থেকে আমরা পাঁচটি থানায় ইমার্জেন্সি টিম করেছি পাঁচটি। এই টিমগুলো সার্বক্ষণিক কাজ করে যাচ্ছে। রেড জোন, ইয়েলো জোন ও গ্রিন জোনের সিদ্ধান্ত আসার পর আমরা রেড জোনে লকডাউন কার্যকরে কাজ করেছি।

আমরা প্রায় এক লাখ মাস্ক বিতরণ করেছি। আট হাজার ১৯২টি পরিবারকে খাদ্য সহায়তা করেছি। নির্মাণশ্রমিক, হোটেলশ্রমিক রিকশাচালকসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার অসহায় হয়ে পড়াদের মাঝেও খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেছি। পাখির খাবারের জন্য দৈনিক দুই হাজার করে টাকা দিয়েছি। মাংস রান্না করে ফেলে রেখেছিলাম সে খাবার কুকুর বিড়াল খেয়েছিল। এ কাজটি করেছিল একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। আমরা তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলাম।

এছাড়া করোনা আক্রান্ত এক ব্যক্তির এক বিঘা জমির ভুট্টা তুলতে পারছিল না, সে ভুট্টা চুয়াডাঙ্গা জেলার পোশাক পরিহিত পুলিশ তুলে দিয়েছে। অন্য যারা লেবার চেয়েছে তাদের লেবার সরবরাহ করেছি। প্রকৃতপক্ষে আমি আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি জনগণের পাশে দাঁড়াতে। কেউ আমার কাছে এসে খালি হাতে ফিরে যায়নি। যতটুক পেরেছি সহযোগিতা করেছি।’

উল্লেখ্য, এ পর্যন্ত চুয়াডাঙ্গা জেলায় ৩০ জন পুলিশ সদস্য করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। তার মধ্যে ২৬ জন সুস্থ। বাকিরা এখনো আইসোলেশনে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

তবে তাদের অবস্থা গুরুতর নয়। এছাড়া আমি আমার জেলা পুলিশের সব সদস্যকে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য ভিটামিন সি, জিংক ট্যাবলেটসহ পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ করেছি।

মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন, পুলিশ সুপার (নড়াইল) : নড়াইলে মহামারি করোনা মোকাবিলায় নড়াইল জেলা পুলিশ সর্বদা নিরলসভাবে করে যাচ্ছে।

পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, ‘সারা বিশ্বের ন্যায় নড়াইলেও করোনা ভাইরাস রোধে নড়াইল জেলা পুলিশ সর্বদা নিরলসভাবে জনগণের সেবা করে যাচ্ছে। দিনরাত নিরলস প্ররিশ্রম করে যাচ্ছে নড়াইল জেলা পুলিশ। সবাই প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে বের হবেন না, আপনারা ঘরে থাকুন- এমন স্লোগানকে সামনে রেখে জনগণের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন তারা।’

খান মুহাম্মদ রেজোয়ান, পুলিশ সুপার (মাগুরা) : মাগুরার পুলিশ সুপার খান মুহাম্মদ রেজোয়ান বলেন, ‘মাগুরা জেলা পুলিশ করোনার শুরু থেকেই পুলিশ ও জনগণকে সুরক্ষিত রাখার ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। আমাদের সাড়ে ৯০০ ফোর্সের হাত ধোয়া, হ্যান্ডগ্লাভস, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, গাড়িতে স্প্রে করা- এ বিষয়গুলো নিশ্চিত করেছি। এখনো চলমান রয়েছে।পুলিশ সদস্যদের লিকুইড সাবান দিয়েছি, গরম পানির ভাপ নেয়ার জন্য হিটার দিয়েছি। নিজেদের সুরক্ষার পাশাপাশি আমরা জনগণকেও সুরক্ষিত রাখার কাজগুলো করছি। শুরু থেকেই লিফলেট বিতরণ করছি, মাইকিং করেছি, প্রচার-প্রচারণার কাজ এখনো অব্যাহত রেখেছি।

এছাড়া আমরা আমাদের এক মাসের রেশনের অর্থ দিয়ে ত্রাণ সাহায্য দিয়েছি গরিব-অসহায় মানুষের মাঝে। করোনা আক্রান্তদের হারবাল প্রোডাক্ট দিয়েছি। ওষুধ দিয়েছি। এখনো দিচ্ছি। আমার জেলা পুলিশ এবং জনগণের সুরক্ষার জন্য যে কাজ করা প্রয়োজন তার সবই করে যাচ্ছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখনো পর্যন্ত আমার জেলা পুলিশের সাতজন সদস্য করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। তার মধ্যে একজন ব্যতীত বাকি সবাই এখন সুস্থ রয়েছেন।’

এস এম মুরাদ আলী, পুলিশ সুপার (মেহেরপুর) : জেলার পুলিশ সুপার এস এম মুরাদ আলী বলেন, ‘করোনা প্রাদুর্ভাবের শুরু থেকেই আমরা প্রতিরোধের জন্য কাজ করছি। সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত ও জনগণকে ঘরে ফেরাতে আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী দোকানপাট ও শপিংমলগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করছে জেলা পুলিশের সদস্যরা।

এছাড়াও জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে অসহায় দুস্থ পরিবারের মাঝে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত আমাদের চলামান কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে মাঠপর্যায়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রশংসনীয় কাজ করছে পুলিশ।’

তিনি বলেন, ‘লোকজনকে সচেতন করা, কখনো লিফলেট হাতে, কখনো লাঠি হাতে, আবার কখনো খাদ্যসামগ্রী বিতরণে। প্রায় সবখানেই পুলিশের উপস্থিতি ব্যাপক। করোনা প্রতিরোধে জেলা প্রশাসনের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি মাঠে থাকছে জেলা পুলিশের সদস্যরা। মেহেরপুর জেলায় এ পর্যন্ত মোট করোনা রোগী সনাক্ত হয়েছে সাতজন। এদের মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে। যা অন্যান্য জেলার তুলনায় কম।’

উল্লেখ্য, মেহেরপুর পুলিশ সুপার এসএম মুরাদ আলীর নির্দেশে করোনা প্রতিরোধে মেহেরপুর সদর, গাংনী ও মুজিবনগর থানার পুলিশ সদস্যরা প্রশংসনীয় কাজ করে চলছে। করোনা মোকাবিলায় সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন পুলিশ সুপার নিজেই।

মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান, পুলিশ সুপার (সাতক্ষীরা) : সাতক্ষীরার পুলিশ বিভাগ মহামারি করোনা সংকটকালে জেলার মানুষের পাশে থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা দিয়ে মানবিক পুলিশ হিসেবে প্রশংসিত হয়েছে।

করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে শুরু থেকে জেলাপুুলিশ ত্রাণ বিতরণ থেকে শুরু করে স্বাস্থ্যসুরক্ষা নিশ্চিত, করোনায় আক্রান্ত হলে তাদের পাশে দাঁড়ানো, করোনায় মৃতদের দাফন ও শেষকৃত্য করতে একটি প্রশিক্ষিত টিম প্রস্তুত করাসহ নানামুখী জনকল্যাণমূলক কাজ করে চলেছে।

করোনা ভাইরাস সংক্রমণের সংকটময় মুহূর্তের শুরু থেকেই সাতক্ষীরা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমানের (পিপিএম বার) সরাসরি তত্ত্বাবধানে জেলা পুলিশের প্রতিটি সদস্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

পুলিশ সুপার বলেন, ‘করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে জেলা পুলিশের প্রতিটি সদস্যকে ফেস মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, হ্যান্ডগ্লাভস, ফেসশিল্ড, সাবান, পিপিইসহ বিভিন্ন ধরনের ভিটামিন ওষুধসামগ্রী প্রদান করা হয়েছে।

আক্রান্ত পুরুষ ও নারী পুলিশ সদস্যদের জন্য আলাদা কোয়ারেন্টাইনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। করোনা ভাইরাস সংক্রমণের সংকটময় পরিস্থিতিতে চার হাজার অসহায় দুস্থ, মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের মাঝে খাদ্য সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। অনেক পরিবারকে নগদ অর্থও প্রদান করা হয়েছে। করোনা সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকে জেলার বিভিন্ন পয়েন্টে ট্রাকের মাধ্যমে জীবাণুনাশক স্প্রে করে।

এছাড়া করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় জেলার প্রতিটি থানায় মাইকিং এবং লিফলেট বিতরণ করে ব্যাপকভাবে জনসচেতনতামূলক প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে মানুষকে ঘরে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে।

এ ছাড়াও বিদেশ ফেরত বা দেশের অন্য জেলা থেকে আগতদের হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করতে শুরু থেকেই সক্রিয় সাতক্ষীরা জেলা পুলিশ।

তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিটি থানা এলাকায় আক্রান্তদের বাড়িতে লাল পতাকা টানিয়ে লকডাউন করা এবং তাদের সার্বিক সহাযোগিতা করা হচ্ছে। সাতক্ষীরা জেলার সঙ্গে যশোর জেলার সীমান্ত কলারোয়া উপজেলার বেলতলা এবং খুলনা জেলার সীমান্ত তালা থানার সুভাষিনিতে আন্তঃজেলা পুলিশ চেকপোস্ট স্থাপন করে বাইরের জেলা থেকে প্রবেশ বা বাহির নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।

ফেসবুক লাইভে সাতক্ষীরার পুলিশ সুপার জনসাধারণকে সচেতন করতে ও জনসাধারণের সমস্যা সম্পর্কে প্রশ্নোত্তর কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে কেউ মৃত্যুবরণ করলে মৃতদেহের দাফন ও শেষকৃত্য সম্পন্ন করতে জেলা পুলিশ কুইক রেসপন্স টিম গঠন করেছে।

এছাড়া পুলিশের পক্ষ থেকে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে বেশ কিছু বডি ব্যাগ হস্তান্তর করা হয়েছে।’ গত মার্চ মাসে দেশে করোনা সংক্রমণ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সাতক্ষীরা জেলা পুলিশ দ্রুত নানামুখী কর্মসূচি হাতে নেয়।

ওই সময় থেকে জেলা পুলিশ দীর্ঘ সময় দেশে সাধারণ ছুটিতে জেলার বিভিন্ন প্রান্তে দরিদ্র ও অসহায়, এমনকি মধ্যবিত্ত পরিবারের বিপুলসংখ্যক মানুষকে রাতের আঁধারে খাদ্য ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করে।

হায়াতুল ইসলাম খান, পুলিশ সুপার (পিরোজপুর) : পিরোজপুর জেলায় এ পর্যন্ত ২২ জন পুলিশ সদস্য আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ১০ জন সুস্থ হয়েছেন বাকি ১২ জন চিকিৎসাধীন। আর এই করোনা মোকাবিলা এবং দৈনন্দিন অপরাধ নিয়ন্ত্রণ আমরা সমান্তরালভাবে করে যাচ্ছি- বলেন জেলা পুলিশ সুপার।

পুলিশ সুপার বলেন, ‘করোনায় লকডাউনের কারণে বেকারত্ব বাড়বে, অপরাধ বাড়বে এসব আমরা মাথায় রেখেই নির্ধারিত ছক অনুযায়ী কাজ করে যাচ্ছি। আর লকডাউন কার্যকর, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি যাতে না হয়, খাদ্যদ্রব্য বিতরণ থেকে শুরু করে অন্যান্য কাজে কোথাও যাতে অনিয়ম না হয়, এগুলো যেমন দেখতেছি একই সাথে ক্রান্তিকালে চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি এগুলো যাতে না হয় এবং আইনশৃঙ্খলার যে বিষয়গুলো আমাদের সামনে আসতেছে সেগুলো আমরা সমন্বয় করে দেখতেছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘করোনার শুরু থেকেই পোস্টার-লিফলেট, মাইকিং এগুলোর মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত প্রচারণামূলক কার্যক্রম চালিয়েছি, এখনো চলছে।

এছাড়া প্রায় তিন হাজার পরিবারকে আমরা আমাদের রেশনের টাকা দিয়ে চাল-ডাল, তেলসহ যাবতীয় সামগ্রীসহ খাদ্য সহায়তা করেছি। আমাদের ফেসবুক সাইটের মাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা করেছি। আমরা ইউনিয়ন পর্যন্ত মাইকিং করেছি।’

মো. মারুফ হোসেন, পুলিশ সুপার (বরগুনা) : করোনা সংকট শুরুর পর থেকেই সম্মুখসারির যোদ্ধা হিসেবে কাজ করছে বাংলাদেশ পুলিশ। করোনা মোকাবিলা, দৈনন্দিন অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, জেলা পুলিশ সদস্যদের সুরক্ষিত রাখাসহ যাবতীয় আইনি কার্যক্রম কিভাবে চলছে জানতে চেয়ে বরগুনার পুলিশ সুপার মো. মারুফ হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি তথ্য-উপাত্ত প্রস্তুত করে পরের দিন পাঠাবেন বলে জানান। তিনি ব্যস্ত থাকায় মোবাইল ফোনে কথা বলতে পারেননি।

মো. সাইফুল ইসলাম, পুলিশ সুপার (বরিশাল) : বরিশালের পুলিশ সুপার জানান, ‘আমরা শুরু থেকেই পুলিশ সদরদপ্তর যেভাবে ইনস্ট্রাকশন দিয়েছেন সেভাবে কাজ করে যাচ্ছি। যেমন প্রতিটি থানায় এবং জেলাতেও করোনা প্রতিরোধ কমিটি করেছি।

প্রতিটা থানায় থানায় ফোর্সকে আমরা তিন ভাগে ভাগ করেছি। যাতে কোনো টিমের একজন আক্রান্ত হলে অন্য টিম কাজ চালিয়ে যেতে পারে। কমেডি টিভির সঙ্গে অন্য একটি টিমের সরাসরি সাক্ষাতের সুযোগ নেই। স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তাদের আলাদা করেছি।

এতে আমাদের টোটাল ট্রেনটা এফেক্টেড হচ্ছে না। পুলিশ লাইন্স ও আমরা একই ব্যবস্থা করেছি। প্রতিটি ফ্লোরে ফ্লোরে আলাদা করে ভাগ করে দিয়েছি। আইসোলেশনের ব্যবস্থা করে দিয়েছি। যাদের উপসর্গ দেখা দিয়েছে তাদের আমরা আইসোলেশনে রাখছি।

বিভিন্ন কাজে বাইরে যাচ্ছে যেমন জরুরি কাজে ঢাকায় যাচ্ছে, মামলার সাক্ষী দিতে যাচ্ছে, বাড়িতে যাচ্ছে, যেখানেই যাচ্ছি ফিরে এলে উপসর্গ না থাকলেও তাদের আইসোলেশনে রাখছি ১৪ দিন এবং সে আইসোলেশন প্রস্তুত করেছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের প্রতিটি ইউনিটের জন্য দ্বিগুণ সুরক্ষাসামগ্রী প্রস্তুত রেখেছি। মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার থেকে শুরু করে যা যা লাগে তার সবই ব্যবস্থা করেছি জেলা পুলিশ থেকে।

তাছাড়া তাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন সি, জিংক ট্যাবলেটসহ পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করেছি। প্রতিটা থানায় ব্যবস্থা করেছি যাতে দিনে অন্তত একটি ডিম খাবে।

এতে করে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে। দৈনন্দিন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এবং করোনা মোকাবিলায় যাদের চেকপোস্টে পাঠাচ্ছি তাদের পূর্ণাঙ্গ সুরক্ষাসামগ্রী দিয়ে পাঠাচ্ছি। যাতে করোনা থেকে সুরক্ষিত থাকতে পারেন। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে আমরা ভালো সুফল পেয়েছি এখন পর্যন্ত অন্যান্য জেলা থেকে এখানে করোনা সংক্রমণ কম রয়েছে।’

উল্লেখ্য, মার্চের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত বরিশাল জেলা পুলিশের ৭১ জন সদস্য করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ২২ জন সুস্থ হয়েছেন। বাকিরা বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

সরকার মোহাম্মদ কায়সার, পুলিশ সুপার (ভোলা) : করোনা সংক্রমণের শুরু থেকেই ভোলা জেলা পুলিশ নিজস্ব নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি করোনা প্রতিরোধে কাজ করে যাচ্ছে। পুলিশ সুপার জানান, ‘টেলিভিশন ইন্টারনেট সুবিধা দিয়ে ১০ জনের গ্রুপ করে আলাদাভাবে আবাসস্থল নিশ্চিত করেছি যাতে এক গ্রুপের সংক্রমণের কারণে অন্য গ্রুপের সংক্রমণ না ছড়ায়। একটি গ্রুপ ডিউটি করে ১৪ দিনের জন্য কোয়ারেন্টাইনে চলে যেতো, অন্য গ্রুপ ডিউটি করে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

এভাবে ডিউটি করে আমাদের পুলিশ লাইন্স এখন পর্যন্ত সুরক্ষিত। থানার পুলিশ সদস্যদের জন্যও আমরা বাইরে বিভিন্ন স্কুল-কলেজে আবাসস্থলের ব্যবস্থা করেছি। যাতে থানায় একসাথে গাদাগাদি করে থাকতে না হয়।

শুরুতে ভালো থাকলেও গত ঈদের পর থেকে ভোলা জেলায় আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে গেছে। জনগণকে সচেতন করার জন্য আমাদের সাথে নৌবাহিনীও আছে। আমরা জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে মাইকিং করেছিলাম। আমরা নিজেরাও মাঠপর্যায়ে গিয়ে জনগণের সাথে কথা বলেছিলাম।

জনগণের একটা গ্রুপ সচেতন হয়, মানে এটা আমরা পুরোপুরি করতে পারিনি। সব লোককে আসলে একইভাবে সচেতন করা সম্ভবও না। বিশেষ করে গ্রামের লোকজন আমাদের অনুপস্থিতিতে বাজারে চলে আসে। শহরকেন্দ্রিক আমাদের আয়োজন ফলপ্রসূ ছিলো, মফস্বলের বিষয়ে আমি নিজেই পুরোপুরি সন্তুষ্ট না।’

উল্লেখ্য, ভোলায় এখন পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ১৮ জন পুলিশ সদস্য। সুস্থ হয়েছে ছয়জন।

মোহাম্মদ মইনুল হাসান, পুলিশ সুপার (পটুয়াখালী) : পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মইনুল হাসান জানান, ‘আমরা করোনার শুরু থেকেই যে সব বিদেশি নাগরিক এসেছে, তাদের কোয়ারান্টাইনে রাখার ব্যবস্থা করেছি। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুরসহ পার্শ্ববর্তী জেলা থেকে যারা আসছেন সড়কপথে এবং নৌপথে তাদেরকেই আমরা কোয়ারেন্টাইন করেছি। নিজস্ব ট্রলার দিয়ে পৌঁছে দিয়েছি স্ব-স্ব জায়গায়।

লিফলেট, ব্যানার-ফেস্টুন, মাইকিং করেছি, মানুষকে সচেতন করেছি। করোনার প্রতিষেধক নেই প্রতিরোধই একমাত্র আমরা সে কাজগুলো করেছি। সাংবাদিকদের আমরা সুরক্ষাসামগ্রী দিয়েছি। আমরা বিভিন্ন জায়গায় সাবান, পানির ব্যবস্থা করেছি এবং সেখানে স্লোগান লেখা ছিলো যে, হাত ধুলে বারবার ঝুঁকি কমবে করোনার। এই কাজগুলোর মধ্য দিয়ে আমরা জনগণকে মেসেজ দিয়েছি যে এই কাজগুলো করলে আমরা করোনা থেকে মুক্তি পাবো।’

তিনি আরও জানান, ‘দৈনন্দিন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আসামি ধরা, মামলা দেয়া, চেকপোস্ট করা- এই কাজগুলো কোথাও কিন্তু থেমে নেই। আমাদের আইজিপি স্যারের নির্দেশনায়, আইজিপি স্যারের বিশ্বমানের ফেসবুকের আলোকে কাজগুলো করছি।

প্রচলিত অপরাধ দমনের জন্য যেসব প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা যেমন টহল দেয়া, গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করা- এগুলো আমরা প্রতিনিয়তই করছি। কোনো ঘটনা ঘটলে সে ঘটনার প্রকৃত অপরাধীকে আইনের আওতায় আনতে সক্ষম হচ্ছি। পটুয়াখালী জেলা পুলিশ এখন পর্যন্ত যতজন সদস্য করোনা আক্রান্ত হয়েছেন এবং মোটামুটি সবাই সুস্থ হয়ে ফিরেছেন।’

ফাতিহা ইয়াসমিন, পুলিশ সুপার (ঝালকাঠি) : করোনা মোকাবিলায় জনগণ ও পুলিশ সদস্যদের রক্ষায় আমরা শুরু থেকেই সম্মুখ সারির যোদ্ধা হিসেবে মাঠে ছিলাম, এখনো আছি বলে জানিয়েছেন ঝালকাঠির পুলিশ সুপার ফাতিহা ইয়াসমিন।

তিনি বলেন, ‘দেশে করোনা ভাইরাসের অস্তিত্ব পাওয়া যায় ৮ মার্চ। সে থেকেই আমরা জনগণের চলাচল সীমিতকরণ, তারা যেন বাসায় অবস্থান করেন এবং বাসায় থাকা অবস্থায় দৈনন্দিন কিছু প্রয়োজন হয়, কেউ যদি ফোন করে জানায় তাহলে তাদের সাপোর্ট দিবো বলে আশ্বস্ত করেছি।

ঝালকাঠি শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত জনগণকে সচেতন করতে মাইকিং করেছি। লিফলেট বিতরণ করেছি, ফোনে কথা বলেছি। করোনা প্রতিরোধে তারা যেন ঘরে থাকে সেই আহ্বান করেছি। আমরা বাজারগুলোও নিয়ন্ত্রণ করেছি। ছোট স্থান থেকে বড় স্থানে স্থানান্তর করেছি যেন দোকানের দূরত্ব বজায় থাকে। রাস্তায় যাতে অবাধে যান চলাচল করতে না পারে সেজন্য রেস্ট্রিকশন আরোপ করেছিলাম।

কিছু সংখ্যক লোক ছাড়া ঝালকাঠির জনগণ মোটামুটি সচেতন, আমরা তাদের মাস্ক পড়াতে উদ্বুদ্ধ করেছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘নো মাস্ক নো সেল- এ পলিসি আমি গ্রহণ করেছিলাম, মার্কেটগুলোতে জনসমাগম দেখে। মাস্ক ছাড়া আসা ক্রেতার নিকট যাতে পণ্য বিক্রি না করে সেজন্য বিক্রেতাদের উদ্বুদ্ধ করেছি। ব্যাপক সাড়া পেয়েছি বিক্রেতাদের কাছ থেকে।

আমি আমার গোটা ঝালকাঠি জেলা পুলিশ সদস্যদের সুরক্ষিত রাখার জন্য হ্যান্ডগ্লাভস, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, ফেইস শিল্ডসহ সব ধরনের সুরক্ষাসামগ্রী কিনে ছিলাম এবং তাদের মাঝে বিতরণ করেছি। আল্লাহর অশেষ রহমতে আমার মোট ৮০০ জনের ফোর্সের মধ্যে এখন পর্যন্ত আটজন আক্রান্ত হয়েছে। তার মধ্যে ছয়জনই এখন সুস্থ।

আমার প্রতিটি অফিসার সম্পূর্ণ প্রটেক্টিভ গিয়ারে ডিউটি করেছেন। সেজন্য সংক্রমণের হার কম। তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে উন্নতমানের খাবার দিয়েছি, ভিটামিন সি জাতীয় খাবার দিয়েছি।’

পুলিশ সদস্যদের ব্যক্তিগত রেশন থেকে প্রায় এক হাজার থেকে ১২শ মানুষকে সহায়তা করা হয়েছে এবং এখনো এসব কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে বলে জানান পুলিশ সুপার।

আমারসংবাদ/বিবি