বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২০

২০ শ্রাবণ ১৪২৭

ই-পেপার

নূর মোহাম্মদ মিঠু

প্রিন্ট সংস্করণ

জুলাই ০৩,২০২০, ০৩:১৬

জুলাই ০৩,২০২০, ০৩:১৬

যাত্রী সংকটে গণপরিবহন: ৭১ লাখ শ্রমিক বেকারের আশঙ্কা

করোনা ভাইরাস সংক্রমণের কারণে প্রায় আড়াই মাস বন্ধ থাকার পর গণপরিবহন পুনরায় চলাচল শুরু হলেও আগের মতো নেই যাত্রী। সরকার নির্ধারিত স্বাস্থ্যবিধি না মানা এবং অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে যাত্রীরা গণপরিবহনে উঠছেন না।

শুরুর দিকে যাত্রীদের জন্য বাসের হেলপারদের হাতে হ্যান্ড স্যানিটাইজার থাকলেও এখন আর তা দেখা যাচ্ছে না। স্বাস্থ্যব্যবস্থা মনিটরিংয়ে বিআরটিএর ভ্রাম্যমাণ আদালতের তৎপরতাও এখন নেই।

এদিকে স্বাস্থ্যব্যবস্থা না মানা এবং বাড়তি ভাড়ার কারণে অনেক যাত্রী গণপরিবহন ব্যবহার পরিহার করছেন। এ কারণে গণপরিবহন মালিক-শ্রমিকরা আশানুরূপ লাভের মুখ দেখছেন না। দিন দিন যাত্রী সংকটও প্রকট হচ্ছে। স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ার কারণ সম্পর্কে রাজধানীতে চলাচলরত বিভিন্ন গণপরিবহন কর্মীদের সাথে কথা বলে আমার সংবাদ।

তারা আমার সংবাদকে বলেন, গণপরিবহন চলাচল শুরুর প্রথম দিকে মালিকরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে বাস চালাতে বলে। মালিকরাই হ্যান্ড স্যানিটাইজার ও জীবাণুনাশক স্প্রে কিনে দিয়েছিল। আমরা সেগুলো ব্যবহার করেছি।

যাত্রীরা বাসে ওঠার আগে তাদের হাতে হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়েছি। এখন আর মালিকরা তা কিনে দেয় না, আমরাও ব্যবহার করি না। রাস্তায় বাস নামিয়ে কোনো লাভ হচ্ছে না। ভাতের টাকা জোগাড় করাই কঠিন হচ্ছে, হ্যান্ড স্যানিটাইজার কিনবো কি দিয়ে?

তারা আরও জানান, গণপরিবহন চালুর পর যাত্রী পাওয়া গেছে। বাড়তি ভাড়া দিয়েও যাত্রীরা যাতায়াত করেছে। কিন্তু গত প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে যাত্রী পাওয়া যাচ্ছে না। রাজধানীসহ সারা দেশে করোনার সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার পর থেকেই যাত্রী সংকট চলছে।

সকালে ও বিকালের দিকে কিছু যাত্রী পাওয়া গেলেও সারাদিনে আর যাত্রী মিলছে না। যাত্রী না থাকায় আয়-রোজগার যা হচ্ছে তা দিয়ে চলা সম্ভব হচ্ছে না। মতিঝিলে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন এরশাদ মিয়া। গণপরিবহন চালুর পর তিনি বাসে যাতায়াত করতেন।

কিন্তু কিছুদিন ধরে তিনি বাসে উঠছেন না। রাজধানীতে সংক্রমণের হার বেড়ে যাওয়ায় সতর্কতার অংশ হিসেবেই তিনি ব্যক্তিগত দূরত্ব বজায় রাখতে গণপরিবহন ব্যবহার বন্ধ করে দিয়েছেন। কারণ সরকারের দেয়া নির্দেশনা অনুযায়ী স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না। যাত্রীদের মাস্ক ব্যবহারের কোনো কড়াকড়ি নেই। তাপমাত্রা আগেও মাপা হয়নি, এখনো হচ্ছে না।

মূলত স্বাস্থ্যবিধি ভেঙে পড়া যাত্রী সংকটের একটি অন্যতম কারণ। যাত্রী সংকটের দ্বিতীয় কারণটি হচ্ছে বাড়তি ভাড়া আদায়। ২০ টাকার ভাড়া ৩৫ থেকে ৪০ টাকা আদায় করা হচ্ছে। যে কারণে অনেকেই গণপরিবহন পরিহার করেছেন।

রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, বকশি বাজার, শাহবাগ, কাঁটাবন, সায়েন্স ল্যাবরেটরি, কলাবাগান, মোহাম্মদপুর, শ্যামলী, ফার্মগেট, বাংলামোটর, মগবাজার, মালিবাগ মোড়, খিলগাঁও-বাসাবো, মালিবাগ, কাকরাইল এলাকা সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, গণপরিবহনগুলো বেশ ফাঁকা।

হেলপাররা যাত্রীদের জন্য হাঁকডাক দিয়েই চলছে কিন্তু আশানুরূপ যাত্রী মিলছে না। কোনো কোনো বাস ১০ মিনিট পর্যন্ত একটি বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে যাত্রীর অপেক্ষা করছে। মিরপুরের দিকে চলাচলরত গণপরিবহনের সংখ্যা বেশি।

শাহবাগ ও সাইন্স ল্যাবরেটরি বাসস্ট্যান্ড থেকে সাত-আটজন যাত্রী নিয়ে ছেড়ে যেতে দেখা গেছে। খিলগাঁও থেকে একেবারেই যাত্রী শূন্য অবস্থায় মিডওয়ে পরিবহনের একটি বাসকে কমলাপুরের দিকে ছেড়ে যেতে দেখা যায়।

এই বাসের হেলপার সুমন জানায়, যাত্রী না থাকায় আমরা খুবই সমস্যায় আছি। সকালে আর বিকালের দিকে একটু যাত্রী থাকে। বাকি সময় খুবই সমস্যা। যাত্রী সংকটের কারণে অনেক মালিক বাস বন্ধ রেখেছে।

এ কারণে সারা দেশে ৭১ লাখ পরিবহন শ্রমিকের অনেকেই এখন বেকার। অনেকে গ্রামে চলে গেছে। আবার অনেকে অন্য কাজের চেষ্টা করছে। আর এই অবস্থা যদি চলতেই থাকে তাহলে নিরুপায় হলেও ইচ্ছাকৃত বেকার হবে ৭১ লাখ পরিবহন শ্রমিক।

মৌমিতা পরিবহনের সুপারভাইজার জানান, তেলের টাকা তুলতেই কষ্ট হচ্ছে। কিভাবে গাড়ি চালাবো বুঝতে পারছি না। বেশি ভাড়া আদায়ের ব্যাপারে পরিবহন কর্মকর্তারা জানান, সঠিক ভাড়া কত তা তারা জানে না।

মালিক যে ভাড়া নির্ধারণ করে দিয়েছে সেই ভাড়াই আদায় করে। মিরপুর থেকে গুলিস্তান পর্যন্ত এখন ৪৫ থেকে ৫০ টাকা নেয়া হচ্ছে। আবার মিরপুর থেকে সায়েদাবাদ পর্যন্ত এখন ৬০ টাকা দিতে হচ্ছে। আগে ২৪ টাকা ভাড়া ছিলো।

এদিকে দূরপাল্লার বাসগুলোতেও বিরাজ করছে একই অবস্থা। ধারণক্ষমতার অর্ধেক যাত্রী নিয়ে চলাচলের অনুমতি থাকলেও মূলত অর্ধেক যাত্রীও পাওয়া যাচ্ছে না।

আগে যেখানে ১০-১৫ মিনিট পরপর কাউন্টার থেকে ঢাকার উদ্দেশে বাস ছেড়ে যেতো সেখানে এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও পাঁচ-সাতজন যাত্রী মিলাতে কষ্ট হচ্ছে। কুমিল্লা থেকে ঢাকগামী এশিয়া ট্রান্সপোর্ট পরিবহনের একটি বাসের চালক ও সুপারভাইজার গতকাল যাত্রাবাড়ীর কাজলায় আমার সংবাদকে এমনটাই জানায়।

আমারসংবাদ/এআই