রবিবার ১২ জুলাই ২০২০

২৮ আষাঢ় ১৪২৭

ই-পেপার

এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান

প্রিন্ট সংস্করণ

জুন ২৯,২০২০, ১০:২৮

জুন ২৯,২০২০, ১০:২৮

ফায়ার সার্ভিসে নিয়োগে ভেঙেছে ‘সিন্ডিকেট’

২০১৯ সালের মার্চ মাসে ৫৭২ জন ফায়ারম্যান নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর। প্রতিটি নিয়োগের শর্তেই উল্লেখ থাকে, ‘কর্তৃপক্ষ পদের সংখ্যা হ্রাস বৃদ্ধি করতে পারে’। যথারীতি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির শর্ত মেনেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়েই ফায়ারম্যান নিয়োগের সংখ্যা বাড়ানো হয়।

আরও ২৯৬ জনকে বাড়িয়ে মোট ৮৬৮ জনের সংশোধিত নিয়োগপত্র প্রকাশ করা হয়। শারীরিক যোগ্যতা বাছাই, মৌখিক ও লিখিত পরীক্ষা শেষে ওই বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর তাদের নিয়োগ দেয়া হয়। নিয়োগ সম্পন্নের সময় কোনো কথা না হলেও রহস্যজনক কারণে প্রায় ৯ মাস পর হঠাৎ করেই সেই নিয়োগ নিয়েই সরব আলোচনা হচ্ছে।

কথিত চাকরিবঞ্চিত দু-এক প্রার্থী নিজেদের মতো করেই অভিযোগের ঝাঁপি খুলে বসেছেন। তারা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) হাবিবুর রহমান ও উপ-পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) মো. শামীম আহসান চৌধুরীর বিরুদ্ধে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে জনবল নিয়োগে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির লিখিত অভিযোগ করেছেন।

সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে দায়ের করা এ অভিযোগটিকে ‘মনগড়া’ বলেই আখ্যায়িত করেছে ফায়ার সার্ভিসের দায়িত্বশীল একটি সূত্র। গত ৩১ মে এ অভিযোগটি করেছেন গোপালগঞ্জের গোপালপুর গ্রামের মো. নূর আলম। সেখানে তিনি ফায়ারম্যান পদে ৪৩৮ জন থেকে বাড়িয়ে ৮৬৮ জনকে নিয়োগের কথা উল্লেখ করেছেন।

কিন্তু নিয়োগের শর্তের বিষয়ে ‘আপডেট’ না হয়েই এমন ‘ভিত্তিহীন’ অভিযোগ করেছেন, বলছিলেন ফায়ার সার্ভিসের এক উপ-পরিচালক। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরে দুর্নীতি ও অনিয়মমুক্ত নিয়োগব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে জানিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের সচিব মো. শহিদুজ্জামান আমার সংবাদকে বলেন, ‘নিয়োগ-বাণিজ্য বন্ধে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।

কোনোভাবেই দালাল চক্রের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ হয়রানি বা প্রতারিত যেন না হয় সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে মন্ত্রণালয় কাজ করছে। সিস্টেম পরিবর্তনের মাধ্যমে আমরা নিয়োগ-বাণিজ্যের অপবাদ দূর করতে চাই। নাম প্রকাশে আপত্তি জানিয়ে ফায়ার সার্ভিসের একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, লিখিত অভিযোগে নূর আলম সেই নিয়োগে প্রায় শত কোটি টাকা বাণিজ্যের অভিযোগ এনেছেন।

এতো বড় অঙ্কের বাণিজ্যের কথা বললেও এর স্বপক্ষে দালিলিক কোনো প্রমাণাদি উপস্থাপন করতে পারেননি। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা আমার সংবাদকে আরও বলছেন, দেশের যেকোনো দুর্যোগে-দুর্ঘটনায় সবার আগে জীবনবাজি রেখে ঝাঁপিয়ে পড়েন ফায়ারম্যানরাই। অতীতে দীর্ঘ সময় এ পদে নিয়োগে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট আধিপত্য বিস্তার করতো।

চাকরি প্রার্থীদের কাছ থেকে তারাই ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা তুলে এক শ্রেণির কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করতেন। ফিফটি ফিফটি লাভে সেই টাকা ভাগ-বাঁটোয়ারাও হতো। কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল ও সুরক্ষা সেবা বিভাগের সচিব মো. শহিদুজ্জামান নিয়োগ-বাণিজ্য বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

তারা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সাজ্জাদ হোসাইনকে নিয়োগে স্বচ্ছতা বজায় রাখারও নির্দেশন প্রদান করেন। ফলে অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের দায়িত্ব নিয়েই তিনি ‘মেধা ও যোগ্যতাই হবে নিয়োগের মাপকাঠি’— এ থিউরি বাস্তবায়ন শুরু করেন।

‘কোনো রকম অনিয়ম-দুর্নীতি সহ্য করা হবে না’— বলেও কঠিন বার্তা দেন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। ফায়ারম্যানসহ প্রতিটি পদেই নিজের সময়কার নিয়োগে ঘুষ লেনদেন বা উৎকোচ বন্ধ করতে নিজের কঠোর পদক্ষেপ বাস্তবায়ন শুরু করেন ডিজি। দুর্নীতির ‘কালোব্যাধি’ দূর করতে তার সক্রিয় পদক্ষেপ প্রকৃত মেধাবী ও যোগ্যদেরই চাকরি নিশ্চিত করেছে।

ফায়ার সার্ভিসের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা আমার সংবাদকে বলেন, ‘অধিদপ্তরের যেসব কর্মচারী আগে নিয়োগ-বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এরকম ডজনখানেক কর্মচারীকে বর্তমান ডিজি মহোদয় চাকরিচ্যুত করেছেন।

তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় প্রধানমন্ত্রীর দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির প্রতি আস্থা রেখেই তিনি এ কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। অনিয়ম-দুর্নীতি করলে পার পাওয়ার সুযোগ নেই— এমন বদ্ধমূল ধারণা সবার মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছেন ডিজি। সূত্র মতে, দুর্নীতির কলঙ্ক তিলক থেকে ফায়ার সার্ভিসকে বের করে আনতে ডিজির সময়োপযোগী কঠোর পদক্ষেপে সিন্ডিকেটের বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।

 এতে তাদের মাথায় হাত পড়েছে। সিন্ডিকেটের অঙ্গুলী হেলনেই অনেকেই বিভিন্ন মাধ্যমে ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আজগুবি ও বানোয়াট মিথ্যাচার করছেন। কিন্তু নিরপেক্ষ তদন্ত হলেই সিন্ডিকেটের থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে বলেও মনে করছে সূত্রটি।

একটি মাধ্যমের উদাহরণ টেনে ফায়ার সার্ভিসের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ফায়ারম্যানের ৩৬৮টি পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। শারীরিক যোগ্যতা বাছাই হলেও পরবর্তীতে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে মৌখিক ও লিখিত পরীক্ষা আটকে রয়েছে।

এ নিয়োগ পরীক্ষাতেও প্রভাব বিস্তার করতেই মরিয়া সিন্ডিকেট নানা অপকৌশলেই জল ঘোলা করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। ডিজি থেকে শুরু করে কর্মকর্তাদের চাপের মধ্যে রেখে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্যই তারা বিভিন্ন মাধ্যমকে ব্যবহার করছেন, যোগ করেন ওই কর্মকর্তারা।

সূত্র মতে, একটি প্রচারমাধ্যমের রিপোর্টে ২০১৬ সালের ফায়ারম্যান পদে নিয়োগ-বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িতের অভিযোগ এনে সেই সময়কার পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) আনিস মাহমুদের স্ত্রীর কয়েকজন গাড়ি চালকের সঙ্গে ফাঁস হওয়া ফোনালাপটি অপ্রাসঙ্গিকভাবেই বর্তমান পরিচালকের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। কিন্তু ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) হাবিবুর রহমান এ পদে যোগদানই করেছেন ২০১৮ সালের ১১ নভেম্বর।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) হাবিবুর রহমান আমার সংবাদকে বলেন, ‘নিয়োগে যারা সুবিধা করতে পারেননি তারাই ঈর্ষান্বিত হয়ে স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপকৌশল নিয়েছেন। কিন্তু প্রকৃত চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।’

২০১৯ সালের নিয়োগে ২৯৬ জন ফায়ারম্যান বাড়ানোর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ওই সময় বেশকটি নতুন ফায়ার স্টেশন চালু হয়। এ বিষয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর একটি নির্দেশনা রয়েছে। কোনো স্টেশন চালু হওয়ার পর জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করা যাবে না।

স্টেশন চালু হওয়ার পূর্বেই জনবল নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ সমাপ্ত করতে হবে। যাতে স্টেশন নির্মাণের সঙ্গে সঙ্গেই পুরো কার্যক্রম শুরু করা যায়। সেই নির্দেশনার প্রেক্ষিতেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন নিয়েই নিয়োগে জনবল বৃদ্ধি করা হয়েছে। পুরো বিষয়টিতেই শতভাগ স্বচ্ছতা বজায় রাখা হয়েছে।’

জানতে চাইলে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সাজ্জাদ হোসাইন আমার সংবাদকে বলেন, ‘নিয়োগে কোনো রকম অনিয়ম বা দুর্নীতির সুযোগ নেই। যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতেই ফায়ার সার্ভিসে চাকরি হয়। এটি বাস্তবায়নের ফলে যাদের স্বার্থহানি হয়েছে তারাই নিয়োগ নিয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছেন।’

আমারসংবাদ/এআই