বুধবার ১৫ জুলাই ২০২০

৩১ আষাঢ় ১৪২৭

ই-পেপার

বিশেষ প্রতিনিধি

মে ৩০,২০২০, ০২:০৯

মে ৩০,২০২০, ০২:০৯

সিন্ডিকেটের কূটকৌশলেই ‘বদলি’ সিএমএসডি পরিচালক

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে এখনো দৌরাত্ম্য কমেনি চিহ্নিত সেই মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠু সিন্ডিকেটের। মন্ত্রণালয়টিতে সরকারি অর্থ লোপাটের মিশন নিয়ে আদাজল খেয়েই তৎপরতা চালাচ্ছে ঘাপটি মেরে থাকা সুবিধাভোগী সিন্ডিকেটটি। এমনকী কেন্দ্রীয় ঔষধাগারে (সিএমএসডি) উচ্চমূল্যে নিুমানের যন্ত্রপাতি সরবরাহ কাজে বিশেষ সুবিধা করতে না পারায় এবার তাদের ‘টার্গেট’ হয়েছেন সংশ্লিষ্ট পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শহিদ উল্লাহ।

দায়িত্বের মাত্র ছয় মাসের মাথায় ‘রহস্যময়’ বদলির ‘দুর্ভাগ্য’ বরণ করতে হয়েছে তাকে। এন-৯৫ মাস্ক কেলেঙ্কারির ঘটনায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে গঠিত তদন্ত কমিটির দায়সারা ও অসম্পূর্ণ তদন্ত নিয়েও চলছে চরম বিতর্ক।

এসবের ধারাবাহিকতায় দীর্ঘদিনের প্রথা ভেঙে সেনাবাহিনীর মেডিকেল কোরের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার পরিবর্তে জনপ্রশাসন থেকে একজন অতিরিক্ত সচিবকে পরিচালক নিয়োগ দেয়ায় রীতিমতো তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।

অযৌক্তিক, অবাস্তব ও অনাকাক্সিক্ষত এ বদলি প্রত্যাহারের পাশাপাশি পদটিতে চিকিৎসক কর্মকর্তাকেই নিয়োগ দেয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) ও স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ)। ইতোমধ্যেই তারা জনপ্রশাসন সচিবকে এ বিষয়ে চিঠিও দিয়েছেন।

চিঠিটির অনুলিপি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিবকেও দেয়া হয়েছে। নিজেদের যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য দাবি বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিকে তাকিয়ে রয়েছেন বিএমএ ও স্বাচিপ নেতারা। তাদের দৃঢ় বিশ্বাস, প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপেই প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তার বদলে চিকিৎসক কর্মকর্তাই সিএমএসডিতে বহাল থাকবেন।

জানা যায়, দেশে করোনা মহামারি আকার নেয়ার আগে থেকেই প্রাণঘাতী ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু শুরু থেকেই এ যুদ্ধে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ভূমিকা মোটা দাগে জনমনে নানা প্রশ্ন তৈরি করে। কোভিড-১৯ সংক্রমণের প্রথমদিকে দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে পিপিই, মাস্কসহ অন্যান্য সুরক্ষা সামগ্রীর চাহিদা বা সরবরাহের পরিকল্পনার বিষয়েও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের কোনো ‘মাথাব্যথা’ বা তোড়জোড় না থাকায় একপর্যায়ে এসব সামগ্রী সরবরাহই বড় রকমের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

ওই সময়ে বেগতিক পরিস্থিতিতে যাতে সুরক্ষা সামগ্রীর কোনো সংকট তৈরি না হয় এজন্য নিজেদের উদ্যোগেই সুরক্ষা সামগ্রী মজুদ শুরু করে কেন্দ্রীয় ঔষধাগার (সিএমএসডি)। পরে গত ১০ মার্চ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক প্রায় ১৫ কোটি টাকার একটি চাহিদা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠায়।

মার্চের প্রথম সপ্তাহে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে পিপিইসহ অন্যান্য সুরক্ষা সামগ্রী পাঠাতে বলা হয় সিএমএসডিকে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের বাছাইকৃত সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান থেকেই মৌখিকভাবে পিপিইসহ অন্যান্য সুরক্ষা সামগ্রী কিনে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় দেশের সব হাসপাতালে পাঠায় সিএমএসডি। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহেই একইভাবে ওইসব হাসপাতালে পাঠানো হয় ২০টি নতুন পিসিআর ল্যাবের যন্ত্রপাতিও। সেই সময় প্রতিদিন পিপিইর গড় চাহিদা ছিলো ৪০ হাজার থেকে ৭০ হাজার। মান নিয়ন্ত্রণের জন্য একাধিক মনিটরিং টিম গঠন করে সিএমএসডি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কোন পদ্ধতিতে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ থেকে সুরক্ষা সামগ্রী কিনতে হবে, অর্থের সংস্থান আছে কীনা, স্পেসিফিকেশন কী হবে, কী পরিমাণ কিনতে হবে তার কোনো নির্দেশনা দেয়নি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। পুরো বিষয়টিতে মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের মাঝে সমন্বয়হীনতার বিষয়টি প্রকট হয়ে দেখা দেয়। সুরক্ষা সামগ্রীর চাহিদা লাফিয়ে বাড়ার পর একেবারেই শেষ মুহূর্তে সংকটময় পরিস্থিতিতে পিপিআর-২০০৮’র আলোকে ডিপিএম পদ্ধতি অনুসরণ করে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সামগ্রী কেনার জন্য স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব সিএমএসডি কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দেন।

কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, কোভিড-১৯ যুদ্ধে সম্মুখযোদ্ধা চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্টদের জন্য মৌখিকভাবে ৯০০ কোটি টাকার সুরক্ষা সামগ্রী কেনা হলেও এখন পর্যন্ত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় অর্থ বরাদ্দ দিয়েছে মাত্র ১০০ কোটি টাকা। বারবার চিঠি চালাচালি হলেও অর্থ মন্ত্রণালয় এখনো পর্যন্ত বাদ বাকি টাকার ব্যবস্থা করেনি।

সূত্র মতে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মধ্যকার দ্বন্দ্বের প্রধান কারণ হয়ে উঠে স্বাস্থ্য সেক্টর জিম্মি করে রাখা মিঠুসহ তিনটি সিন্ডিকেট। মন্ত্রণালয়ের একজন প্রভাবশালী চেনা মুখকে ম্যানেজ করে উচ্চমূল্যে বিভিন্ন নিুমানের যন্ত্রপাতি মিঠুর পছন্দে কেনার একটি তালিকা মাস কয়েক আগে মন্ত্রণালয় থেকে অধিদপ্তরের অধীনস্থ সিএমএসডিতে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু বেঁকে বসেন সিএমএসডি কর্তৃপক্ষ। ডিপিএম পদ্ধতিতে মিঠুর মেডিটেক ইমাজিং লিমিটেড মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় বাদ পড়ে। এতে চরমভাবে ক্ষুব্ধ হন মিঠুসহ মন্ত্রণালয়ের সুবিধাভোগী সিন্ডিকেটটি। তারা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের বাছাইকৃত জেএমআই’র সাধারণ সার্জিক্যাল মাস্ককে ভুলবশত এন-৯৫ মাস্ক প্যাকেটে সরবরাহ করার বিষয়টিতে সিএমএসডি পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো.শহিদ উল্লাহকে জড়ানোর চেষ্টা করেন।

অভিযোগ রয়েছে, সিএমএসডি পরিচালক জেএমআইয়ের বিরুদ্ধে একাধিকবার কার্যকর অ্যাকশনে গেলেও তদন্ত প্রতিবেদনে সেই বিষয়টি রীতিমতো আড়াল করা হয়েছে। এমনকি অভিযুক্ত জেএমআই কোম্পানিতে না গিয়েই দায়সারাভাবে সিন্ডিকেটের ‘ছকে’ তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। এর মাধ্যমে একজনের দোষ আরেকজনের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে বলেও মত দিয়েছেন অনেকেই। সিএমএসডি পরিচালককেই ‘সাইজ’ করার জন্যই এমন কূটকৌশল ফর্মুলা বাস্তবায়ন হয়েছে কীনা এ বিষয়টিও তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখার জোর দাবি উঠেছে। এসব অভিযোগ অস্বীকার করে তদন্ত কমিটির প্রধান স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সাইদুর রহমান বলেন, ‘আমরা পাঁচদিন সময় বেশি নিয়ে তদন্ত সম্পন্ন করেছি। তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতেই বুঝেশুনেই আমরা তদন্ত প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাখিল করেছি।’

এদিকে, মাত্র ছয় মাসের মাথায় সিএমএসডি পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শহিদ উল্লাহকে অন্যায় ও অযৌক্তিকভাবে বদলি ও প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাকে সিএমএসডির পরিচালক পদে নিয়োগ দেয়ায় চরম ক্ষুব্ধ বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) ও স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ)। এ সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে তারা ইতোমধ্যেই জনপ্রশাসন সচিবকে চিঠি দিয়েছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাচিপ সভাপতি ডা. এম ইকবাল আর্সলান বলেন, ‘সিএমএসডির পরিচালক পদটি একটি টেকনিক্যাল পদ। এটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনস্থ একটি প্রতিষ্ঠান। নিয়োগ নীতিমালা অনুযায়ী অধিদপ্তরের যত পরিচালকের পদ আছে সব টেকনিক্যাল পদ। এই পদগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে টেকনিক্যাল লোকদের নিয়োগ দিয়ে আসা হচ্ছে।’

এ বিষয়ে একটি উদাহরণ টেনে ইকবাল আর্সলান বলেন, ‘এর আগে ২০১৪-১৫ সালের দিকে এমন একটি আদেশ হয়েছিল। এইচআইভি এইডস কর্মসূচির লাইন ডিরেক্টর পদে একজন যুগ্মসচিবকে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। সেটিকেও আমরা অশনি সংকেত হিসেবে মনে করেছিলাম। পরে আমাদের প্রতিবাদে আদেশটি বাতিল করতে বাধ্য হয়েছিল।’

স্বাচিপের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ডা. এম এ আজিজ বলেন, ‘প্রশাসন ক্যাডার থেকে সিএমএসডির পরিচালক নিয়োগ দেয়ার বিষয়টিকে আমরা অশনি সংকেত হিসেবেই মনে করছি। অবিলম্বে এ সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করতে হবে।’

একই বিষয়ে বিএমএর সভাপতি ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন বলেন, ‘সরকার যেকোনো সময় যে কাউকে বদলি করতে পারে। কিন্তু এরপরও একটি হিসাব থাকে কত বছর হলে কাকে বদলি করা যায়। আমি মনে করি সেই অর্থে অন্যায় ও অযৌক্তিকভাবেই বর্তমান পরিচালককে বদলি করা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘বদলি করে আবার প্রশাসন ক্যাডারকে দেয়া এটি ঠিক নয়। আমরা আশাবাদী সরকার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করবে। আমরা এজন্য প্রধানমন্ত্রীর দিকেই তাকিয়ে আছি। আমাদের বিশ্বাস এ পরিস্থিতি নিরসনে অতীতের মতোই বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন প্রধানমন্ত্রী।’

আমারসংবাদ/জেডআই