রবিবার ৩১ মে ২০২০

১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

ই-পেপার

এনায়েত উল্লাহ

মে ১৮,২০২০, ০১:৪৭

মে ১৮,২০২০, ০১:৪৭

ঈদের পর মাদ্রাসা খোলার দাবি

স্বাস্থ্যবিধি মেনে ঈদের পর দেশের সকল কওমি মাদ্রাসা খুলে দিতে আহ্বান জানিয়েছেন আলেমরা। একইসঙ্গে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও খুলে দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

আলেমরা জানান, ইতোমধ্যেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলে দিয়েছেন এ ভাইরাস কতদিন থাকবে সেটা বলা যাচ্ছে না।
তারা এটাও বলেছেন যে করোনা ভাইরাস স্থায়ীভাবে কোনো না কোনো এলাকায় থেকে যেতে পারে। যেহেতু এটা দীর্ঘ সময় অবস্থানের একটা সম্ভাবনা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দীর্ঘ সময় বন্ধ রাখলে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে।

বিশেষ করে এদেশের হাজার হাজার শিক্ষার্থীরা হেফজ বিভাগে পড়ে। দীর্ঘ সময় যদি তারা কুরআনুল কারীম তেলাওয়াত না করে তাহলে ভুলে যাবে।

হেফজখানায় ছোট ছোট শিক্ষার্থীরা পড়েন। তারা বাড়িতে পড়তে চায় না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে থাকলে একটা নিয়ম-শৃঙ্খলা মধ্যে থাকে। সেখানে পড়তে হয়। এ কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেয়ার দাবি জানান তারা।

জানা গেছে, দেশে প্রায় বিশ থেকে পঁচিশ হাজার কওমি মাদরাসা রয়েছে। এতে প্রায় পঁচিশ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী গত শিক্ষাবর্ষের বার্ষিক পরীক্ষা, বেফাক ও আল-হাইআতুল উলইয়ার কেন্দ্রীয় পরীক্ষা দিতে পারেনি।

অন্যদিকে নিয়ম অনুযায়ী ঈদুল ফিতরের পর থেকে কওমি মাদরাসাসমূহের নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হতে যাচ্ছে। এ সময়টা কওমি মাদরাসাসমূহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ওলামায়ে কেরাম আরো বলেন, লকডাউন পরিস্থিতি জারির প্রায় দেড় মাস পর সরকার যখন জনগণের কল্যাণে সবকিছুই শর্তসাপেক্ষে উন্মুক্ত করে দিতে শুরু করেছেন, সেহেতু দেশের শান্তি প্রিয় সুশৃঙ্খল এবং সবচেয়ে বেশি নিয়ম মেনে চলতে অভ্যস্ত ও আনুগত্যশীল কওমি মাদ্রাসাগুলো খুলে দিন।

শিক্ষার্থীদের আরো একটি শিক্ষাবর্ষে কুরআন ও হাদীসের শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত থাকুক এটা কাম্য হতে পারে না। সুতরাং যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে ঈদের ছুটির পর কুরআন-হাদীস চর্চার কেন্দ্রস্থল কওমি মাদরাসাসমূহ খুলে দিতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে সরকারের প্রতি দাবি জানান।

এ বিষয়ে বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের মহাপরিচালক অধ্যাপক মাওলানা জুবায়ের আহমদ চৌধুরী আমার সংবাদকে বলেন, যেহেতু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইতিমধ্যেই ঘোষণা দিয়েছেন যে প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস স্বল্প সময়ের মধ্যে শেষ হওয়ার কোনো উপায় তারা দেখছেন না।

পাশাপাশি করোনা ভাইরাস নির্দিষ্ট এলাকায় স্থায়ীভাবে থেকে যেতে পারে বলেও তারা সন্দেহ প্রকাশ করেছে।এহেন পরিস্থিতিতে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মাসের পর মাস যদি বন্ধ থাকে তাহলে শিক্ষার অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যাবে। দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে অনেক শিক্ষার্থী ঝড়ে পড়তে পারে।

পাশাপাশি বিগত দিনে তারা যে শিক্ষা গ্রহণ করেছে তা চর্চা না করার কারণে ভুলে যেতে পারে। যেহেতু দেশের সব জায়গায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে লকডাউন শিথিল করা হয়েছে সেখানে কওমি মাদ্রাসা দেশের একটি সুশৃঙ্খল প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে খুলে দেয়ার দাবি জানাচ্ছি। পাশাপাশি দেশের সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।

বেফাক মহাপরিচালকের সাথে কথা বলে জানা যায়, দেশের বৃহৎ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে প্রায় ১৫ হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যাতে ১৪ থেকে ১৫ লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে।

এসময় তিনি আরও বলেন কওমি মাদ্রাসার শিক্ষাবর্ষ রমজান থেকে রমজান সে হিসেবে রমজানের পূর্ব মুহূর্তে আমাদের বার্ষিক পরীক্ষা হয়ে থাকে। বোর্ডের কেন্দ্রীয় পরীক্ষাও বাকি রয়েছে। যেকারণে ঈদের ছুটির পর মাদ্রাসাগুলি খুলে না দেয়া হলে অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যাবে।

বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের বাহিরেও ভাড়ায় চালিত কিছু হিফজ মাদ্রাসা রয়েছে। যারা শুধুমাত্র হেফজ বিভাগের শিক্ষার্থীদের অধ্যায়ন করিয়ে থাকেন। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা কুরআনুল কারীম মুখস্ত করেন। এ মাদ্রাসাগুলি পরিচালনার জন্য একটি আলাদা বোর্ড রয়েছে।

বাংলাদেশ প্রাইভেট হিফজ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান হাফেজ ক্বারী নেছার আহমাদ আন নাছিরী আমার সংবাদকে বলেন, আমাদের বোর্ডের অধীনে প্রায় এক হাজারেরও উপরে মাদ্রাসা রয়েছে। যেখানে এক লাখের উপর শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। হেফজ বিভাগে যে সমস্ত শিক্ষার্থীরা পড়ে তারা বয়সে খুবই ছোট।

যে কারণে বাড়িতে তারা অধ্যায়ন করতে চায় না। হেফজ বিভাগের শিক্ষার্থীরা যদি নিয়মিত চর্চা না করে তাহলে তারা কুরআনুল কারীম ভুলে যাবে।

অন্যদিকে মাদ্রাসার শৃঙ্খলার মধ্যে না থাকলে তারা একা একা পড়তে চায় না। সে হিসেবে দেশের লাখো লাখো নবীন হাফেজদের চর্চা রক্ষা করার জন্য ঈদের পর মাদ্রাসাগুলি খুলে দেয়া আবশ্যক। আমাদের শিক্ষার্থীরা শৃঙ্খলার মধ্যে থাকে।

সুতরাং স্বাস্থ্যবিধি মানার শর্তে আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলি খুলে দেওয়া হোক। আমি আশা করছি আমাদের কোনো প্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্য বিধি লংঘন হবে না।

এই বিষয়ের সাথে একমত পোষণ করেছেন জাতীয় দ্বীনি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ও শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠের ইমাম ফরিদ উদ্দিন মাসউদ।

তিনি আমার সংবাদকে বলেন, আমি দীর্ঘদিন যাবত এই মাদ্রাসাগুলি খুলে দেওয়ার কথা বলে আসছি। কেননা করোনা ভাইরাস যেহেতু দীর্ঘ সময় ধরে অবস্থান করা একটি ভাইরাস। সাথে সাথে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বলছে খুব অল্প সময়ের মধ্যে এটি শেষ হয়ে যাওয়ার মতো না।

সুতরাং দীর্ঘ সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলে দেশের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যাবে। তাই দেশের অন্যান্য প্রতিষ্ঠান যেরকম স্বাস্থ্যবিধি মেনে খুলে রাখার কথা বলা হয়েছে। আমি মনে করি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার শর্তে খুলে দেয়া হোক। এতে করে দেশ অনেক বড় ক্ষতি থেকে বেঁচে যাবে।

তিনি আরো বলেন, এই ক্ষেত্রে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষকেউ অনেক দায়িত্বশীল হতে হবে। যেন শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীরা অবশ্যই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলেন। অন্যথায় শিক্ষাব্যবস্থাকে বাঁচাতে গিয়ে প্রাণহানি ঘটতে পারে। এ বিষয়টা অবশ্যই প্রতিষ্ঠান প্রধানদের খেয়াল রাখতে হবে।

বোর্ডের চেয়ারম্যানের সাথে কথা বলে জানা গেছে এই বোর্ডের অধীনে সারাদেশে ১ হাজারের ওপর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে এতে আড়াই থেকে তিন লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। শুধু শিক্ষকরাই নয় শিক্ষার্থীরাও দীর্ঘদিন বাড়িতে থাকার পর মাদ্রাসায় আসার কথা বলছেন।

এ বিষয়ে জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম মাদানিয়া যাত্রাবাড়ী মাদ্রাসার কাফিয়ার শিক্ষার্থী হাফেজ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আমার সংবাদকে বলেন, শিক্ষা জীবন শুরুর পর থেকে এত বড় বন্ধ কোনো দিন পায়নি। দীর্ঘদিন বাড়িতে থাকতে থাকতে বিরক্ত হয়ে গিয়েছি।

পাশাপাশি দীর্ঘদিন কুরআন ও হাদিসের সাথে সম্পর্ক না থাকায় নিজের ভেতরে কেমন জানি অস্থিরতা কাজ করছে। তাই সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে ঈদের পর মাদ্রাসাগুলি খুলে দেয়া হোক।

আমারসংবাদ/এআই