রবিবার ৩১ মে ২০২০

১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

ই-পেপার

শরিফ রুবেল

মে ১৬,২০২০, ০৩:১৯

মে ১৬,২০২০, ০৩:২৩

নতুন যাত্রায় বিচারবিভাগ!

*সফলভাবে চলছে ভার্চ্যুয়াল কোর্টের কার্যক্রম
*৩ দিনে ২৯৮৫ জনের জামিন
*প্রথম দফায় প্রশিক্ষণ পেছেছেন ৪০ জন
*প্রশিক্ষণের আওতায় আসবে ১ লাখ

করোনাভাইরাসের কারণে থমকে আছে দেশ। থমকে ছিলো বিচারবিভাগও। সীমাহীন ভোগান্তিতে ছিলো বিচারপ্রার্থী সাধারণ জনগণও। বেড়েছে মামলাজটও। মামলাজট ও বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি কমাতে চালু হয়েছে ভার্চ্যুয়াল আদালত। আর এতেই খুলে গিয়েছে বিচারবিভাগের বন্ধ দরজা। সূচনা হয়েছে নতুন দিগন্তের।

তথ্যপ্রযুক্তির নতুন যুগে পা রাখলো বিচার বিভাগ। এটি দেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে অভুত। এর মাধ্যমে বিদ্যমান পরিস্থিতির আপাতত অবসানের পথ খোলা হলেও সুফল সুদূরপ্রসারী। আসছে নতুন ব্যবস্থায় উচ্ছ্বসিত প্রযুক্তিমুখি তরুণ আইনজীবীরাও।

জানা যায়, স্বল্প পরিসরে চালু হওয়া ভার্চ্যুয়াল আদালতের কার্যক্রম সফলভাবেই চলছে। আইনজীবীরা নির্ধারিত ওয়েবসাইটের মাধ্যমে নিবন্ধন করে ভার্চ্যুয়াল আদালতে জামিন আবেদন করতে পারছেন।

জমা দিতে পারছেন প্রয়োজনীয় কাগজপত্র। ভার্চ্যুয়াল শুনানিতে অংশ নিয়ে আদালতের কাছে তাঁর বক্তব্য তুলে ধরতে ধরছেন। জামিনও হচ্ছে তুলনামুলকভাবে আগের চেয়ে বেশি।

গত বুধবার ভার্চ্যুয়াল আদালতে জামিন হয়েছে ১ হাজার ২০ জনের। এর আগের দিন মঙ্গলবার জামিন হয় ১৪৪ জনের। এদিন ডলফিস রক্ষায় একটি রিটের নির্দেশনা দেয়া হয়। ১৪ মে বৃহস্পতিবার ১৮২১ জন আসামির জামিন হয়েছে।

তবে এখনো প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম থাকা ও প্রশিক্ষণের বিষয়টি শতভাগ কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। এখনো আইনজীবীদের অনেকের বাসায় নেই কম্পিউটার, স্ক্যানার ও ইন্টারনেট সংযোগ। ফলে সবার পক্ষে হঠাৎ করেই এ পদ্ধতিতে শুনানি করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে।

এরপরও অনেকেই বলছেন, এ ব্যবস্থা চালু করা বিচার বিভাগের জন্য অনেক বড় একটি পদক্ষেপ। এখন আস্তে আস্তে এর সঙ্গে সবাই খাপ খাইয়ে নিতে পারবেন।

এদিকে ভার্চ্যুয়াল কোর্টে আবেদন দায়ের করার জন্য আইনজীবীদের যে ওয়েবসাইটে নিবন্ধন করতে হয়, সেখানে অনেকেই ঢুকতে পারছেন না। ফলে অনেকে এখনো নিবন্ধনই করতে পারেননি।

সুপ্রিম কোর্ট রেজিস্ট্র্রার জেনারেল দফতর সূত্র জানায়, গত ১০ মে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার অধ্যাদেশ জারি ও হাইকোর্ট রুলস পরিবর্তন করে ভার্চুয়াল কোর্ট চালুর নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয় সুপ্রিমকোর্ট প্রশাসন।

এমনকি গত ২৬ এপ্রিল ভার্চ্যুয়াল আদালতের প্রথমিক আলোচনা শুরু হওয়ার পর থেকেই সেই আলোকেই সংশ্লিস্টদের প্রশিক্ষণ পর্ব শুরু হয়। এখন সেটা শেষও হয়েছে। প্রথম দফায় ৪০ জনকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে।

জেলা আদালতের বিচারক, জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্র্রেট, সহায়ক কর্মকর্তা-কর্মচারি, আইনজীবীরা রয়েছেন প্রশিক্ষণার্থীদের মধ্যে। প্রশিক্ষণ হয়েছে ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে।

দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য এখনো প্রশিক্ষণ অব্যাহত রয়েছে। প্রশিক্ষণটি অল্প সময়ে গ্রহণ সম্ভব নয় বিধায় পর্যায়ক্রমে দ্রুতই সারা দেশের আদালতে ভার্চ্যুয়াল আদালত চালুর বিষয়ে আশাবাদী সংশ্লিষ্টরা।

সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সিরাজ হোসেন প্রমানিক বলেন, তথ্যপ্রযুক্তির যুগে ভার্চ্যুয়াল আদালত আরো আগে থেকেই চালু হওয়া উচিত ছিলো। কারণ বাংলাদেশ এখন প্রযুক্তিতে পিছিয়ে নেই। ভার্চুয়াল কোর্টের মাধ্যমে বিচারবিভাগে একটু নতুন মাত্রা যোগ হলো।

তবে যেহেতু এটি সংকটকালীন সময়ের জন্য, সীমিত আকারে করা হয়েছে। প্রকৃত ভার্চুয়াল কোর্ট নয়।পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়া হুট করে চালু হওয়ায় কিছু জটিলতা তৈরী হয়েছে। কোর্টের ওয়েবসাইটে লগ ইন করতে পারছি না। আমার জানা মতে, অনেক আইনজীবীই এখনো এই সমস্যার কারণে নিবন্ধন করতে পারেনি।

তিনি আরও বলেন, এই সিস্টেমে জামিন আবেদনের শুনানিতে অংশ নিতে হলে একজন আইনজীবীর ল্যাপটপ বা ডেস্কটপ, স্ক্যানার ও ইন্টারনেট সংযোগ অবশ্যই প্রয়োজন, যা ৯০ ভাগ আইনজীবীর নেই। ফলে তারা আপাতত সমস্যায় পড়বেন। এ পদ্ধতির সুফল পাবেন না।

জানতে চাইলে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, এখন তথ্যপ্রযুক্তির যুগ তাই এর ব্যবহারের বিষয়ে আগে থেকেই সবাই পারদর্শী। আমি মনে করি যারা ল্যাপটপ বা কম্পিউটার চালাতে পারেন তাদের কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়।

বেশিরভাগ আইনজীবীই তো তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে দক্ষ। বর্তমান যুগে অনেকে বাসায় বসে ভাইবার, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপে কথা বলি। এটিও তো সেভাবে কথা বলার একটি সিস্টেম। বিচারক-আইনজীবী সবাই যুক্ত হয়ে শুনানি-আর্গুমেন্ট করবেন।

এর আগে ২৬ এপ্রিল প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত ফুলকোর্ট সভায় ভার্চ্যুয়াল কোর্ট চালুর প্রয়োজনীয় আইনগত প্রতিবন্ধকতা দূর করতে পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

ওই সভায় ভার্চুয়াল কোর্ট কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়ে বিচারক, আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দিতে সুপ্রিমকোর্টের বিচারিক সংস্কারসংক্রান্ত বিশেষ কমিটিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরপর প্রধান বিচারপতি এ-সংক্রান্ত আইনি জটিলতাগুলো দূর করার উদ্যোগ নেন।

পরে গত বৃহস্পতিবার ভিডিও কনফারেন্সসহ অন্যান্য ডিজিটাল মাধ্যমে আদালতের কার্যক্রম চালানোর সুযোগ তৈরি করতে আদালত কর্তৃক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার অধ্যাদেশ ২০২০-এর খসড়া অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। এরপর শনিবার এই অধ্যাদেশ জারি হয়।

আমারসংবাদ/এসআর/এআই