রবিবার ০৭ জুন ২০২০

২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

ই-পেপার

রফিকুল ইসলাম

প্রিন্ট সংস্করণ

এপ্রিল ০৮,২০২০, ০৩:০০

এপ্রিল ০৮,২০২০, ০৩:০০

ত্রাণ বিতরণে নেই সামাজিক দূরত্ব

করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে দেশজুড়ে চলছে অঘোষিত লকডাউন। করোনা আতঙ্কের এমন অবস্থায় একেবারেই বেকার হয়ে পড়েছে সকল কর্মজীবী-শ্রমজীবী মানুষ।

দেশের কর্মহীন এসব মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে সরকারি-বেসরকারি সকল প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। তারা প্রতিদিন ওই সকল শ্রমজীবী মানুষকে বিভিন্ন ত্রাণ বিতরণ করছেন।

কিন্তু শ্রমজীবী মানুষের মাঝে ত্রাণ বিতরণে মানা হচ্ছে না সামাজিক দূরত্ব। খাদ্যসামগ্রী বিতরণের এই প্রক্রিয়ায় বিপদের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে যখন জনসমাগম এড়ানোই প্রধান লক্ষ্য, তখন এই ত্রাণ বিতরণকে কেন্দ্র করে হাজারো মানুষের জমায়েত নিজের পায়ে কুড়াল মারার মতো বলে মনে করা হচ্ছে।

করোনা ভাইরাসে কারণে গত ২৬ মার্চ থেকে আগামী ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত দেশজুড়ে চলছে সাধারণ ছুটি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আহ্বানের পরই দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও মানুষ এগিয়ে এসেছেন। দিনমজুর ও ছিন্নমূল অসহায় মানুষদের জন্য রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে।

এতে কিছুটা হলেও উপকৃত হচ্ছেন নিম্ন আয়ের মানুষগুলো। কিন্তু ত্রাণ বিতরণ করতে গিয়ে গণজমায়েতের বিষয়টি মাথায় রাখছেন না কেউ। একই সাথে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে বিক্রি হচ্ছে টিসিবির খাদ্যসামগ্রী। টিসিবির প্রতিটি গাড়ির সামনেও গা ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে পণ্য নিতে দেখা গেছে সাধারণ ক্রেতাদের।

গত কয়েকদিনে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে পরিবার প্রতি ৫ কেজি চাল, ১ কেজি ডাল, ১ কেজি পেঁয়াজ, ২ কেজি আলু ও ১ লিটার করে তেল বিতরণ করা হয়। সংকট থাকা পর্যন্ত এ কার্যক্রম চলবে বলে জানিয়েছেন মেয়র আতিকুল ইসলাম।

৫৪টি সাধারণ ওয়ার্ড ও ১৮টি সংরক্ষিত ওয়ার্ডেও একই পরিমাণে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করা হবে। কিন্তু প্রতিদিনই ত্রাণ বিতরণ করতে গিয়ে ব্যাপক গণজমায়েত হচ্ছে।

করোনা ভাইরাসের কারণে কর্মহীন হয়ে পড়া ছিন্নমূল ৫০ হাজার মানুষের মাঝে খাদ্যবিতরণ কর্মসূচি শুরু করেছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন। গত শনিবার মাসব্যাপী এ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন তিনি।

তবে এখানেও একই অবস্থা— গণজমায়েত ঘটিয়ে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়। অন্যান্য প্রতিষ্ঠান এবং সংস্থার ত্রাণ বিতরণেও একই চিত্র দেখা গেছে।

ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশসহ বিভিন্ন ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান যারা গত কয়েকদিনে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেছে, তার প্রায় সবক্ষেত্রে ব্যাপক লোকসমাগম হয়েছে। ত্রাণ নিতে কাড়াকাড়ির কারণে একপর্যায়ে দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এ কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে।

তারা ওয়ার্ডভিত্তিতে নিম্ন আয়ের মানুষের তালিকা করে ঘরে ঘরে ত্রাণ পৌঁছে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এ সিদ্ধান্ত নিলেও অন্যরা গণজমায়েত ঘটিয়েই খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করছেন। এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সচেতন মহল।

এভাবে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ কতটা নিরাপদ, জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, এভাবে আসলে ত্রাণ বিতরণ করা ঠিক নয়, যেখানে গণজমায়েত হয়। তবে আমরা চেষ্টা করেছি, দূরত্ব বজায় রেখে এই কার্যক্রম পরিচালনা করতে। কিন্তু বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়ার পরই তা বন্ধ করে দিয়েছি।

তিনি বলেন, এখন আমরা মাসব্যাপী খাদ্যসামগ্রী বিতরণের জন্য ওয়ার্ডভিত্তিক কমিটি করছি। ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৪৯টির তালিকা তৈরি হয়েছে। আমরা ছিন্নমূল কর্মহীন মানুষের ঘরে ঘরে গিয়ে ত্রাণ পৌঁছে দিতে চাই।

প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের কারণে কর্মহীন গরিব মানুষের মধ্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ অব্যাহত রেখেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন।

একইসঙ্গে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। মসজিদ, মন্দির, গির্জা, বৌদ্ধবিহারে থার্মাল থার্মোমিটার এবং হাসপাতালে পিপিই বিতরণ করেছে আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ উপকমিটি।

গতকালও ধানমণ্ডি আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের প্রতিনিধির হাতে এসব সামগ্রী তুলে দেন দলের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী।

গতকাল মঙ্গলবার ভ্যান দিয়ে অসহায় শ্রমজীবী মানুষের বাড়ি বাড়ি খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দিয়েছেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক গাজী সারোয়ার হোসেন বাবু। দিনভর তিনি প্রায় ৬ শতাধিক প্যাকেট খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেন।

ডেমরার কোনাপাড়া ও ইস্টার্ন হাউজিং এলাকা আওয়ামী লীগের একদল তরুণ স্বেচ্ছাসেবী কর্মহীন অসহায় শ্রমজীবী মানুষের মাঝে চাল-৫ কেজি,ডাল ২ কেজি, তেল ২ কেজি, আলু ৩ কেজি, পেঁয়াজ ২ কেজি ও ২টা লাইফ বয় শাবান বিতরণ করেছেন। গত সোমবার দুপুরে নিজ উদ্যোগে এ খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়।

একইদিন ঢাকা-৫ আসনের সংসদ সদস্য হাবিবুর রহমান মোল্লার পুত্র ও ডেমরা থানা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক মশিউর রহমান মোল্লা সজল ৬০, ৬১, ৬২, ৬৩, ৬৪ ও ৬৫ নং ওয়ার্ড এলাকায় অসহায় মানুষদের ঘরে ঘরে নীরবে খাবার পৌঁছে দিচ্ছেন।

হলি ফ্যামিলি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম বলেন, এভাবে জমায়েত ঘটিয়ে খাদ্যসামগ্রী বিতরণে হয়তো নিম্ন আয়ের মানুষের উপকার হবে, তবে সেই সাথে চরম বিপদের আশঙ্কাও তৈরি হবে।

কারণ, এখন এমন এক মুহূর্ত যেখানে সামাজিক দূরত্ব তৈরি করাই করোনা প্রতিরোধের প্রধান এবং একমাত্র উপায়। সুতরাং পেটের ক্ষুধা নিবারণ করতে গিয়ে বিপদ ডেকে আনা মানে জীবন বিপন্ন হওয়া।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাস সংকট মোকাবিলায় সকলকে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি ও সতর্কতা মেনে গণসচেতনতা সৃষ্টি করবেন।

আমারসংবাদ/এসটিএমএ