বুধবার ০৩ জুন ২০২০

২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

ই-পেপার

ফারুক আলম

প্রিন্ট সংস্করণ

এপ্রিল ০৮,২০২০, ০২:৫০

এপ্রিল ০৮,২০২০, ০২:৫০

লকডাউনের সফলতায় সংশয়

নারায়ণগঞ্জ জেলাতেই এখন পর্যন্ত করোনা ভাইরাসে দুইজন মারা গেছেন। আক্রান্ত হয়েছেন এক চিকিৎসক। সর্দি, জ্বর ও কাশি নিয়ে মৃত্যু হয়েছে এক ব্যবসায়ীর। করোনা সন্দেহে কয়েকটি এলাকা করা হয়েছে লকডাউন।

তারপরও সচেতন হচ্ছে না সাধারণ মানুষ। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সামাজিক দূরত্ব বজায় না রেখেই চলছে অনেকে। অবাধে চলাচল করতে দেখা গেছে কয়েকটি এলাকাতে। নির্দেশনার তোয়াক্কা না করায় দেশের বিভিন্ন জায়গায় করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ায় লকডাউনের পরিধি দ্রুত বাড়ছে।

অথচ অধিকাংশ ক্ষেত্রে যে ব্যক্তি করোনায় আক্রান্ত সন্দেহে গোটা এলাকা লকডাউন করা হয়েছে, তার টেস্ট ও চিকিৎসা কোনোটাই হচ্ছে না। বরং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও পরিবারের লোকজন সামাজিকভাবে নানা নিগৃহের শিকার হচ্ছেন।

এ অবস্থায় করোনার উপসর্গ নিয়ে অনেকে জীবন ঝুঁকিতে থাকলেও বিষয়টি গোপন রেখে ঘরে অনুমানভিত্তিক চিকিৎসা নেয়ার চেষ্টা করছেন। এতে অঘোষিত লকডাউনের মূল লক্ষ্য অনেকটাই ভেস্তে যাচ্ছে।

লকডাউনকে উপেক্ষা করে বাজার-দোকানে ভিড়ের মধ্যেই চলছে কেনাকাটা। গত কয়েকদিনের মতো গতকালও শহর থেকে গ্রামের বাজার-হাটে সেই চেনা ছবিই দেখা যায়।

শহরের অন্যান্য বাজারেও যারা আসছেন, বাইরে বেরনো নিয়ে তাদের মতো করে যুক্তিও দিচ্ছেন। বিভিন্ন জায়গায় দোকান বন্ধ থাকলেও, সবজির বাজার খোলা ছিলো। কোথাও কোথাও ফলের দোকানও খোলা। লকডাউনের নিষেধাজ্ঞা উড়িয়ে চলছে দেদার কেনাকাটা।

চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, যে কারণে লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে, সেই ‘সোস্যাল ডিসটেন্সিং’-এর উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। ফলে সংক্রমণের আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। বাজার করতে গেলেও মাস্ক পরে যেতে হবে। একইসঙ্গে অন্য ক্রেতাদের সঙ্গে কম পক্ষে এক মিটার দূরত্ব বজায় রাখতেই হবে।

বাজারে যারা যাচ্ছেন, তাদের মধ্যে অনেকেই মাস্ক পরছেন না। অন্যদিকে সারা দেশে যে অঘোষিত লকডাউন রয়েছে তা ভেঙে নিম্ন আয়ের মানুষকে নিত্যদিনের দুমুঠো খাবার জোগাড় করতে রাস্তায় নামতে হচ্ছে।

আবার চাকরি হারানোর আশঙ্কায় অনেকে মৃত্যুরভয় উপেক্ষা করে কর্মস্থলে যোগ দিচ্ছে। ফলে মরণঘাতী করোনা ভাইরাস দ্রুতই চারদিকে সংক্রমিত হয়ে আনুষ্ঠানিক লকডাউনের পরিধি আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

স্বাস্থ্য বিভাগ ও স্থানীয় পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৯ মার্চ দেশে সর্বপ্রথম মাদারীপুরের শিবচর উপজেলাকে আনুষ্ঠানিকভাবে লকডাউন করা হলেও মাত্র দুসপ্তাহের ব্যবধানে আরও প্রায় অর্ধশত ছোটখাটো এলাকা, পাড়া-মহল্লায় এর পরিধি বাড়াতে হয়েছে।

এরপরও প্রতিদিন দেশের কোনো কোনো না জেলা থেকে নতুন এলাকা স্থানীয়ভাবে লকডাউন করে দেয়ার খবর আসছে। এ অবস্থা চলমান থাকলে একসময় গোটা দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে লকডাউন করে দিতে হবে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকেই।

এদিকে স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যে লক্ষ্য নিয়ে সরকারি-বেসরকারি অফিস, স্কুল-কলেজ ও ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘমেয়াদি ছুটি এবং গণপরিবহন বন্ধ করে সারা দেশে অঘোষিত লকডাউনের আওতায় আনা হয়েছে, এর মধ্যে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখা হলে তা নিঃসন্দেহে ভেস্তে যাবে।

কেননা লাখ লাখ শ্রমিক বিভিন্ন কারখানায় স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত (!) করে নির্ধারিত গণ্ডিতে কাজ করলেও দিন শেষে তারা বস্তি কিংবা ঘিঞ্জি এলাকার ঘরে ফিরে যাবে। সেখানে পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে মেলামেশা করবে।

কোনোভাবে এদের কেউ করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত হলে তা হুহু করে চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে, যা সামাল দেয়ার মতো পর্যাপ্ত চিকিৎসাব্যবস্থা দেশে নেই। তাই বিপুলসংখ্যক শ্রমজীবী মানুষকে ঘরের বাইরে রেখে অঘোষিত লকডাউনের কাঙ্ক্ষিত সফলতা পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম বলে মত দেন তারা।

অন্যদিকে গত ২৫ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত সব অফিস-আদালত ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি ঘোষণা করা হলেও বিশ্বের অন্যান্য দেশে করোনা ভাইরাসের প্রকোপ বৃদ্ধির গতি-পরিধি পর্যালোচনায় তা যথেষ্ট কি না তা নিয়েও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা ঘোর সংশয় প্রকাশ করেছেন।

তাদের মতে, নোভেল করোনা ভাইরাসের প্রকোপ থেকে দেশের নাগরিকদের রক্ষা করতে হলে মাত্র ২০ দিনের অঘোষিত লকডাউন যথেষ্ট নয়। এ স্বল্প সময়ের মধ্যে পরিস্থিতি পুরোপুরি বোঝা যাবে না।

দেশে করোনার সংক্রমণ রোধও অসম্ভব। এ প্রাণঘাতী ভাইরাসের হাত থেকে রক্ষা পেতে সারা দেশের মানুষকে ন্যূনতম ৫ থেকে ৭ সপ্তাহ ঘরে থাকার যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে। তা না হলে করোনা সংক্রমণের গতি আরও বাড়বে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের করোনা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকারী গবেষকরা বলেন, বাংলাদেশে প্রায় আড়াই সপ্তাহ ধরে চলা লকডাউনের ফলে সংক্রমণ ও নতুন আক্রান্তের সংখ্যা সাময়িক সময়ের জন্য হয়তো কিছুটা কমবে।

কিন্তু ফের তা ফিরে আসতে পারে। পরিস্থিতি দেখে তখন হয়তো সরকার কয়েক দিনের ছাড় দিয়ে ফের দীর্ঘমেয়াদি ছুটি ঘোষণা করে সারা দেশ অঘোষিত লকডাউন করবে। তবে এতে পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন হবে না। বরং মাঝে ছাড় দেয়ার কারণে ফের করোনা সংক্রমণ বাড়তে পারে। এ ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি ছুটি দিয়ে টানা লকডাউনের পক্ষে মত দেন তারা।

প্রতিবেশী দেশে ভারতে করোনা সংক্রমণের প্রাথমিক ধাপ, এর বিস্তৃতি, লকডাউন এবং বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টরা বলেন, বিশ্বের অধিক সংক্রমিত দেশগুলোর ভয়াবহতার দিকে না তাকালেও প্রতিবেশী ভারতের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে বাংলাদেশকে এখনই আরও কতটা বেশি সতর্ক হওয়া জরুরি তা অনায়াসেই জানা যাবে।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা হুঁশিয়ার করে বলেছেন, ৩৫ থেকে ৪৯ দিনের লকডাউনে দেশ হয়তো বেশখানিকটা পিছাবে।
তবে এ সময়টুকু লকডাউন মেনে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ না রুখলে দেশ অন্তত ৩০ বছর পিছিয়ে যাবে।

করোনার বর্তমান পরিস্থিতিতে ঘরে থাকার যুদ্ধের সময় আরও বাড়ানো জরুরি কি না— এ প্রশ্নের জবাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রো-ভিসি ও স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলনের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই মাহবুব বলেন, করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় লকডাউন নয়, দেশব্যাপী সাধারণ ছুটি দেয়া হয়েছে। সাধারণ ছুটিতে সারা দেশে মানুষকে কতটা ঘরে আটকে রাখা গেছে তা গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। এ অবস্থায় আগামী ১৪ এপ্রিলের পর সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে এ ব্যাপারে কী করণীয় তার দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়া জরুরি।

অন্যদিকে লকডাউন না করে দেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণার বিষয়টি নিয়ে বিশেষজ্ঞরা অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন। চিকিৎসক ও গবেষক ড. এম এ হাসান বলেন, সাধারণ ছুটি শব্দগুলোর মধ্য দিয়ে পরিস্থিতির গুরুত্ব কমিয়ে ফেলা হয়েছে।

এটি সাধারণ ছুটি নয়, সেটি মানুষকে বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছে সরকার। করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে গঠিত জাতীয় সমন্বয় কমিটির সদস্য এ বি এম আব্দুল্লাহ সরকারের এ পদক্ষেপকে ত্রুটিপূর্ণ বলে স্বীকার করেছেন।

তিনি বলেন, ছুটি শব্দটা বলা সরকারের ভুল হয়েছে। তাছাড়া এটা আরও আগেই নেয়া দরকার ছিলো। দরিদ্র মানুষের কথা বিবেচনা করে সরকার কিছুটা সময় নিয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

আমারসংবাদ/এসটিএমএ