শুক্রবার ০৫ জুন ২০২০

২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

ই-পেপার

ফারুক আলম

প্রিন্ট সংস্করণ

এপ্রিল ০৩,২০২০, ০৭:৫৫

এপ্রিল ০৩,২০২০, ০৭:৫৫

বাড়িভাড়া মওকুফ চান ভাড়াটিয়ারা

  • বিদেশে ভাড়া মওকুফ, আমাদেরও করা উচিত : ভাড়াটিয়া পরিষদ
  • ইউটিলিটি সার্ভিস মওকুফে বাড়িভাড়া ছাড় : বাড়িওয়ালা
  • বাড়িভাড়া মওকুফে সিলেটের মেয়র আরিফুলের আহ্বান

ঢাকায় বসবাসরত ভাড়াটিয়ারা করোনা আতঙ্ক শেষে বাড়িভাড়া আতঙ্কে পড়তে যাচ্ছেন। যা একজন ভাড়াটিয়ার পুরো পরিবারের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। তাদের সন্তানদের লেখাপড়া থেকে শুরু করে পরিবারের খাবার জোগারের পর মাস শেষে বাড়িভাড়া দিতে গেলে বেশির ভাগ ভাড়াটিয়া দিশেহারা হয়ে পড়বেন। এজন্য মানবিক কারণে হলেও বাড়িওয়ালারা যেন মার্চ মাসের ভাড়া মওকুফ করেন এমনটি দাবি করছেন ভাড়াটিয়ারা।

ইতোমধ্যে মানবিকতার উদাহরণে দু-একজন বাড়িওয়ালা ভাড়া মওকুফ করেন, যা খুবই সামান্য। তবে সরকারের ইউটিলিটি সার্ভিস মওকুফ ও সরকারি নির্দেশনার ওপর বাড়িভাড়া মওকুফ সম্ভব বলে মনে করে নগরবাসী।

জানা যায়, ঢাকায় প্রায় দুই কোটি অধিবাসীর ৯০ শতাংশই ভাড়া বাড়িতে থাকেন। করোনা প্রাদুর্ভাবে এসব ভাড়াটিয়াদের বাড়িভাড়া মওকুফ করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া নেই।

১০ ভাগের কাছে জিম্মি ৯০ ভাগ। যাদের বাড়িভাড়ার হিসেব মিলিয়েই জীবন সংগ্রামে লিপ্ত হতে হয়। ১০ ভাগ বাড়িওয়ালাদের কাছে নগরীর কোটি মানুষ বড় অসহায়। মোদ্দাকথা ১০ ভাগ বাড়িওয়ালার কাছে নগরীর ৯০ ভাগ মানুষ জিম্মি। বছরের পর বছর ধরে বাড়িভাড়া বৃদ্ধি করা হচ্ছেস, এতে ভাড়াটিয়াদের দুর্গতির শেষ নেই।

কিন্তু করোনা ভাইরাসের মতো প্রাণঘাতী ভাইরাসেও বাড়িওয়ালারা ভাড়াটিয়াদের ওপর মানবিক হতে পারছেন না। যা অমানবিক বলে দেখছেন নগরের বিশেষজ্ঞরা। রাজধানী ঢাকায় বসবাসকারী নাগরিকদের উপার্জনের ৬৫ ভাগ ব্যয় হয় বাড়িভাড়ায়। বাকি ৪৫ ভাগ দিয়ে কোনো রকমে জীবিকা নির্বাহ করতে হয় তাদের।

এর মধ্যে করোনা ভাইরাসে অসহায় হয়ে পড়েছেন ভাড়াটিয়ারা। যাত্রাবাড়ী মাছের আড়তে কাজ করেন আব্দুল জলিল। তার পরিবারে তিন সন্তান মিলে পাঁচ সদস্যের বসবাস। দিন আনেন দিন খান।

অর্থাৎ দিনমজুরের কাজে কোনো রকম সংসার চলে। এর মাঝে করোনা আতঙ্কে গত ১০ দিন ধরে কাজ নেই। তিনি পাশের বাড়ির আরেক ভাড়াটিয়া মোবারকের কাছ থেকে পাঁচ হাজার টাকা সুদে নিয়েছেন। যা দিয়ে সংসারের বাজার করেছেন।

আব্দুল জলিল বলেন, সপ্তাহ খানিক কাজ নেই, এর মধ্যেই মাস শেষ। শুনছি, ৪ এপ্রিল থেকে পুরোদমে কাজ শুরু হবে। তখন কাজ করে সুদের টাকা পরিশোধ করবো নাকি বাড়িভাড়া দেবো সেই চিন্তায় রাতে ঠিকমত ঘুম হয় না। আমার মতো ঢাকা শহরে কোটি কোটি মানুষ আছেন যারা বাড়িভাড়ার চাপে থাকবেন।

জানা গেছে, সিলেট নগরীর বাসা-বাড়ির মালিকদের এক মাসের পানির বিল মওকুফের ঘোষণা দিয়েছেন সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। এ ঘোষণা দিয়ে মালিকদের প্রতি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর এক মাসের বাসাভাড়া মওকুফ করার আহ্বান জানিয়েছেন মেয়র।

তবে ঢাকা দুই সিটি কর্পোরেশন থেকে এমন কোনো নির্দেশনা দেয়া হয়নি। যা ঢাকায় বসবাস করা ভাড়াটিয়াদের মধ্যে কিছুটা হলেও স্বস্তির বার্তা নিয়ে আসে।

তবে গতকাল একটি অনলাইন নিউজপোর্টালে ডিএনসিসির মেয়র আতিকুল ইসলাম সিটি কর্পোরেশনের হোল্ডিং ট্যাক্স মওকুফ করার কোনো ঘোষণা না দিলেও বস্তিবাসীর বাড়িওয়ালাদের মানবিক দেখিয়ে এক মাসের বাড়িভাড়া মওকুফের আহ্বান জানান।

জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে করোনা ভাইরাস প্রাদুর্ভাবে দুর্গত মানুষের স্বার্থে বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানির বিল ও ভাড়াটিয়াদের দুর্যোগকালীন মাসের ভাড়া মওকুফ এবং নিম্নবিত্ত মানুষের মাসের ঋণের কিস্তি মওকুফ, ই-রেশন চালু এবং দুর্যোগকালীন ভাতা প্রদানের দাবি জানিয়েছে ‘দেশ বাঁচাও মানুষ বাঁচাও’ আন্দোলন।

সরকারের কাছে বক্তারা আহ্বান জানায়, করোনা ভাইরাসের কারণে ইতোমধ্যে ঢাকার দোকান-মার্কেট বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। আর এসব বন্ধ হওয়ার ফলে মানুষের আয়ের উৎস কমে যাবে। মানুষ আর্থিক সংকটে পড়বে যার কারণে বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানির বিল মওকুফ, সরকারের ভর্তুকি ব্যবস্থা করতে হবে।

বাড়ির মালিকদের উদ্দেশে তারা বলেন, দেশের এই দুর্যোগকালীন সবাইকে সবার পাশে দাঁড়াতে হবে। তাই বাড়ির মালিকরা যেন দুর্যোগকালীন বাড়িভাড়া মওকুফ করে দেন।

বাড়িবাড়া মওকুফ করা নিয়ে বাড়িওয়ালাদের মধ্যে দেখে গেছে মিশ্রপ্রতিক্রিয়া। শর্তসাপেক্ষে ভাড়া মওকুফে রাজি তারা। করোনা ভাইরাসের সংক্রামক প্রতিরোধে একপ্রকার লকডাউনে আছে সারাদেশ। সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানই বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। শহর কিংবা নগর কোথাও তেমন রোজগারের পথ নেই।

তাই এ দুর্যোগকালে বিশেষ করে বাসাভাড়া মওকুফের দাবি জানাচ্ছেন ভাড়াটিয়ারা। এ দাবিতে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার ঢাকার ভাড়াটিয়ারা।

তারা বলছেন, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই এপ্রিল মাসের ঘরভাড়া অগ্রিম দিতে হবে। কিন্তু করোনা ভাইরাসের কারণে তাদের কাজ বন্ধ। যেখানে ঘর থেকেই বের হওয়া যাচ্ছে না, সেখানে এ অল্প দিনে কিভাবে ভাড়া দেয়া সম্ভব।

কারণ অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান করোনার কারণে আগামী মাসে বেতন দেবে কিনা সে অনিশ্চয়তা রয়েছে কর্মজীবীদের। সবমিলে দেশের এ দুর্যোগের সময় সব বাড়িওয়ালার উচিত ভাড়াটিয়াদের পাশে দাঁড়ানো।

রাজধানীর কয়েকজন বাড়িওয়ালার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা নিরুপায়। সরকার গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি ও হোল্ডিং ট্যাক্স মওকুফের ঘোষণা দিলে বাসাভাড়ায় ছাড় দেয়া সম্ভব, অন্যথায় নয়।

অনেকে লোন নিয়ে বাড়ি করেছেন। করোনার কারণে ব্যাংক তো লোনের সুদ মওকুফ করবে না। আমাদের ছেলেমেয়েদের স্কুল-কলেজে ফি দিতে হয়। বুয়া, দারোয়ান ও ময়লা অপসারসহ বিভিন্ন খাতে বিল দিতে হয়। আমাদের সংসার আছে।

তবে সরকার ইউটিলিটিগুলো মওকুফ করলে আমরা বাড়িভাড়া নেব না। মোহাম্মদপুর এলাকার ভাড়াবাড়িতে দীর্ঘ ২০ বছর ধরে বসবাস করেন লায়লা আক্তার। তিনি বেসরকারি একটি কোম্পানিতে চাকরি করেন।

তিনি বলেন, বাড়িওয়ালারা ভাড়া কমানো দূরের কথা, করোনার পরিস্থিতির মধ্যেও বাড়িওয়ালা পানির বিল বাড়িয়েছে ৫০ টাকা। কারণ হিসেবে বাড়িওয়ালা দেখিয়েছেন, ঢাকা ওয়াসার পানির দাম বাড়ানোর বিষয়টি।

ইতোমধ্যে নোটিশও টানিয়ে দিয়েছে। করোনায় একদিকে যেমন স্বাস্থ্যঝুঁকিতে আছি, আবার বাসাভাড়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। এ সপ্তাহেই ভাড়া পরিশোধ করতে হবে। মালিক তা কিছু বুঝবে না। সরকারের উচিত করোনায় আাাদের মতো নিম্ন মধ্যবিত্তদের জন্য এটা ঘোষণা দেয়া। সরকার চাইলে সবই সম্ভব। এ মহাদুর্যোগে এক মাাসের ভাড়া মওকুফ করলে আমরা অনেক রেহাই পাব।

উত্তরা ১০ নাম্বার সেক্টরের শেষপ্রান্ত কামারপাড়ার আসাদুজ্জামান নামে এক বাড়িওয়ালা আমার সংবাদকে বলেন, দেশে করোনা ভাইরাসের কারণে ভাড়াটিয়াদের কর্ম বন্ধ। বিধায় বাড়িওয়ালারা কেন ভাড়া ছাড় দেবেন?

বাড়িওয়ালারা তো মাস শেষে ভাড়ার উপরে নির্ভর করে সংসার চলে। মাসের ভাড়া না পেলে কিভাবে সংসার চালাবেন। আর সরকার তো বাড়িওয়ালাদের মাসিক বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস ও হোল্ডিং ট্যাক্স মওকুফ করেনি।

তবে শুধু শুধু ভাড়াটিয়ারা কেন বাড়িওয়ালাদের ভাড়া মওকুফের কথা বলবেন। সরকার ইচ্ছা করলেই, এই সময়ে কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে। সরকারের নির্দেশনা অমান্য করবে এমন কোনো বাড়িওয়ালা রাজধানীতে আছে বলে মনে হয় না।

ভাড়াটিয়া পরিষদের সভাপতি মো. বাহারানে সুলতান বাহার আমার সংবাদকে বলেন, রাজধানীতে প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ ভাড়াবাড়িতে থাকেন। মাসের পর মাস এসব ভাড়াটিয়ারা বাড়িভাড়া দিচ্ছেন। জীবন ও জীবিকার তাগিদে তাদের প্রতিনিয়ত কর্মক্ষেত্রে যেতে হয়।

কিন্তু করোনার প্রাদুর্ভাবে সবকিছু স্থবির। যে শ্রমিকরা দিনজুরে কাজ করতেন তারা বেকার হয়ে পড়েছেন। যা মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দেখা দিয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি।

এ পরিস্থিতি থেকে জনগণকে কিছু রেহাই দেওয়ার জন্য আমরা সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই ভাড়াটিয়াদের বাসা ভাড়া ও দোকান ভাড়া মওকুফ করা হোক।

তিনি আরও বলেন, করোনা ভাইরাসের কারণে উগান্ডা ও কিউবায় বাসাভাড়া শতভাগ মওকুফ করা হয়েছে। আমেরিকায় ১০০ ডলার ভাড়া কমানো হয়েছে। বাংলাদেশেও সরকারের এ নিয়ে পদক্ষেপ জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

আমারসংবাদ/এআই