বৃহস্পতিবার ০৪ জুন ২০২০

২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

ই-পেপার

রাসেল মাহমুদ

এপ্রিল ০৩,২০২০, ০৩:২০

এপ্রিল ০৩,২০২০, ০৩:২০

বিশ্বব্যাপী শিক্ষা চলছে অনলাইনে

চীন থেকে উৎপত্তি ও বিস্তার লাভের পর মরণব্যাধি করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বব্যাপী। আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল।

করোনার সংক্রমণ রোধে লকডাউনকেই নিরাপদ ও কার্যকর মাধ্যম বলে বিবেচিত করেছেন বিশ্বনেতারা। ফলে স্থবির হয়ে পড়েছে রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি অংশ।

এ অবস্থায় বিকল্প মাধ্যমে কাজ চালিয়ে নিতেও চেষ্টা করা হচ্ছে। তারই ধারাবাহিকতায় বিশ্বব্যাপী শিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখতে অনলাইন প্লাটফর্মকেই বেছে নিয়েছেন নীতিনির্ধারকরা।

তাই বর্তমানে পাঠদান ও গ্রহণের মাধ্যম হয়েছে ইন্টারনেট। এতে কার্যত বন্ধ হওয়া শিক্ষা কার্যক্রম ধীরগতিতে হলেও চালু রয়েছে।

জানা গেছে, চীনের উহান থেকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাসে এখন পর্যন্ত ৪৭ হাজারেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। আর আক্রান্ত হয়েছে ৯ লাখ ৩৫ হাজার ১৯৭ জন। ভয়াবহ এই করোনা মোকাবিলায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়সহ যুক্তরাষ্ট্রের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষকরা সরাসরি শিক্ষা দিতে আগ্রহী নন। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের বসন্তকালীন ছুটি পরবর্তী নির্দেশনা না দেয়া পর্যন্ত ক্যাম্পাসে আসা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে।

ক্যামব্রিজ ও ম্যাসাচুসেটস বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পরবর্তী সেমিস্টার শেষ না হওয়া পর্যন্ত ক্যাম্পাসে না যেতে বলেছে। করোনার উৎপত্তিস্থল উহানসহ চীনের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনো বন্ধ রয়েছে।

ডেনমার্ক, পোল্যান্ড, জাপান, ইতালি, স্পেনে স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জার্মানিতে সংক্রমিত এলাকায় স্কুল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।

পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও স্কুল, কলেজ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। আর বাংলাদেশে গত ১৭ মার্চ থেকে বন্ধ রয়েছে সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সব মিলিয়ে বিশ্বের প্রায় ১৮৫টি দেশে জাতীয়ভাবেই বন্ধ রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

ফলে এসব দেশের ১৫৪ কোটি ২৪ লাখ ১২ হাজার শিক্ষার্থী যেতে পারছে না শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। এ অবস্থায় প্রায় প্রতিটি দেশই শিক্ষা কার্যক্রম চালু রেখেছে অনলাইনে। এ জন্য দেশ ভেদে ব্যবহার করা হচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন কিছু সফটওয়্যার বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম।

যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, চীনসহ বিভিন্ন দেশ গুগল ক্লাসরুম, জুম, হ্যাংআউট, স্কাইপের মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করে লাইভ ক্লাসরুমের মাধ্যমে পাঠদান পরিচালনা করে যাচ্ছে বলে জানা গেছে।

এছাড়া ম্যাসেঞ্জার গ্রুপ বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন পেজ বা গ্রুপে সব সময় ধারণকৃত ক্লাস প্রচারিত হচ্ছে।

চীনের হুঝো ইউনিভার্সিটিতে ভিজ্যুয়াল আর্ট ডিজাইনের স্নাতকোত্তর অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থী রাহাত কবির জানিয়েছেন তার বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস, এসাইনমেন্ট সব হচ্ছে অনলাইনে। লাইভ ক্লাসের মাধ্যমে তারা পড়ালেখা করছে। আর লাইভ ক্লাসের জন্য আলীবাবার তৈরি ডিংটক অ্যাপটি ব্যবহার করা হচ্ছে।

রাহাত কবির বলেন, করোনার কারণে সমগ্র চীনজুড়ে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। এর মধ্যেও পড়ালেখায় কিন্তু কোনো ছাড় নেই। নিয়মিত অ্যাসাইনমেন্ট করতে হচ্ছে।

যে যেখানেই থাকুক, অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে হবে সময়মতো। গ্রুপ অ্যাসাইনমেন্টও করতে হচ্ছে। আমরা একেকজন একেক জায়গায় আছি। অনলাইনে আলোচনা করে সব ঠিকঠাক করে নিতে হচ্ছে। এরই মধ্যে অবশ্য অনলাইনে অনেক বিভাগের লাইভ ক্লাস শুরু হয়ে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালু রেখেছে। স্কুল পর্যায়ের শিক্ষকরা প্রতিটি আলাদা বিষয়ের জন্য ম্যাসেঞ্জার গ্রুপ তৈরি করেছেন। আর এসব গ্রুপে যুক্ত রয়েছেন অভিভাবকরা।

বিষয়ভিত্তিক গ্রুপগুলোতে নিয়মিত চলছে পড়ালেখা। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে বসবাসরত বাংলাদেশি নাগরিক আরিফ নেওয়াজ ফরাজী জানান, তার দুই সন্তান একটি স্কুলে পড়ে। প্রতিটি বিষয়ের শিক্ষকের ম্যাসেঞ্জার গ্রুপ আছে।

ওই গ্রুপে সব অভিভাবক যুক্ত আছেন। সেখানে পড়ালেখা দেয়া-নেয়া হচ্ছে। কোনো অভিভাবকের প্রশ্ন থাকলে তা লিখছেন। শিক্ষকরা এর উত্তর দিচ্ছেন। অর্থাৎ শিক্ষকের সঙ্গে সব সময়ের জন্য যোগাযোগ হচ্ছে।

ডেনমার্ক ও পোল্যান্ডে জুম অ্যাপ ও স্কাইপে লাইভ ক্লাস নেয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। ডেনমার্কে বসবাসরত বাংলদেশি নাগরিক আলতাফ হোসেন জানায়, এখানকার স্কুলগুলোতে জুম অ্যাপের মাধ্যমে ক্লাস নেয়া হচ্ছে। লাইভ ক্লাসের জন্য স্কাইপ ব্যবহার করা হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, পোল্যান্ড এবং ডেনমার্কের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতেও স্কাইপে লাইভ ক্লাস হচ্ছে। করোনার দিনগুলোতে অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালু রেখেছে জাপান। গত পহেলা এপ্রিল থেকে জাপানে নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হলেও বন্ধ রয়েছে স্কুলগুলো। তবে স্কুলগুলো খোলার বিষয়ে ইতোমধ্যে নোটিস জারি করা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালাচ্ছে। দূরশিখন পদ্ধতি যেমন ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ক্লাস নিচ্ছে দেশটির প্রসিদ্ধ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

এই পদ্ধতিতে আগামী ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত তাদের ক্লাস চলবে। এ জন্য ভিডিও সফটওয়্যার জুম ব্যবহার করবে তারা। এছাড়া ল্যাবগুলোতে শিফট চালু করা হয়েছে যাতে করে ভিড় না হয়। সামাজিক দূরত্বকরণের সব কৌশল নিচ্ছে জাপান।

ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষণারত বাংলাদেশি শিক্ষার্থী এস এম নাদিম মাহমুদ বলেন, আসলে আমরা সবাই নতুন একটি অভিজ্ঞতা অর্জন করছি। পৃথিবীর এই প্রাণসংহারের মিছিলে উদ্বিগ্নতা অবশ্যই কাজ করছে।

তবে আশার কথা হলো যে, প্রযুক্তি আমাদের সেই সমস্যাগুলো কিছুটা প্রশমিত করে দিচ্ছে। বাড়িতে বসেই ক্লাসমেটদের সাথে ক্লাস করার অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীদের সরাসরি ক্লাসের স্বাদ দেবে।

তিনি বলেন, চীন যে পদ্ধতিতে ক্লাস নিয়েছে, সেটি যে বাংলাদেশেও চালু হয়েছে তার জন্য অবশ্যই সরকারকে সাধুবাদ জানাই। এটি সত্যি আমাদের প্রয়োজন ছিলো। দূরশিখনের মাধ্যমে মেধা ও মননের চর্চায় আমাদের শিক্ষার্থীরা এগিয়ে যাবে বলে আমি বিশ্বাস করি।বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশও অনলাইন এবং ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে ক্লাস শুরু করেছে। বেশকিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইতোমধ্যে অনলাইনে ক্লাস নিচ্ছে। তবে এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।

অনলাইনে ক্লাস নেয়ার বিষয়টিকে ইতিবাচক উল্লেখ করে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আরজু সালেহ মিথিলা বলেন, বাংলাদেশ প্রযুক্তির দিক দিয়ে এখন আর পিছিয়ে নেই।

করোনার প্রাদুর্ভাব শুরুর পর থেকেই আমি বাসায় বসেই ক্লাস করছি। অ্যাসাইনমেন্ট, ডিজাইন সবকিছুই অনলাইনে সাবমিট করছি। একদম নিয়মিত ক্লাসের মতোই, কোনো হেরফের নেই। এতে সময়ও নষ্ট হচ্ছে কম।

এদিকে, মাধ্যমিক পর্যায়ের ক্লাস হচ্ছে টেলিভিশনের মাধ্যমে। আগামী ৫ এপ্রিল থেকে প্রাথমিকের ক্লাসও সংসদ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের মাধ্যমে প্রচার করা হবে বলে জানা গেছে।

তবে ইতোমধ্যে টেলিভিশনে প্রচারিত মাধ্যমিক পর্যায়ের ক্লাস নিয়ে কিছুটা অসন্তোষ রয়েছে শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের মধ্যে।

তারা বলছেন, যেভাবে টিভিতে ক্লাস সমপ্রচার করা হচ্ছে তাতে শিক্ষকের সঙ্গে কথাবার্তা আদান-প্রদানের সুযোগ নেই। শিক্ষক যা বোঝান তা না বুঝলেও কিছু করার থাকছে না।

এ জন্য তারা গুগল ক্লাসরুম, জুমসহ অন্যান্য অ্যাপের মাধ্যমে ক্লাস নেয়ার কথা বলেছেন। এতে শিক্ষককে প্রশ্ন করার সুযোগ আছে। এরপর শিক্ষক বিষয়টি বুঝিয়েও দিতে পারেন।

গত কয়েক বছরে দেশের সব মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে ল্যাপটপ প্রজেক্টরসহ সব সুবিধা রয়েছে। সেগুলো ব্যবহার করলেই লাইভ ক্লাস প্রচার করা সম্ভব বলেও মত দিয়েছেন তারা।

আমারসংবাদ/এআই