বুধবার ০৩ জুন ২০২০

২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

ই-পেপার

ফারুক আলম

এপ্রিল ০৩,২০২০, ০৩:১৫

এপ্রিল ০৩,২০২০, ০৩:১৫

করোনার পর ডেঙ্গু চ্যালেঞ্জ

সারা দেশে করোনা ভাইরাস আতঙ্কের মধ্যেও থেমে নেই এডিস মশার কামড়। প্রতিদিন ঢাকা মেডেকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন ডেঙ্গুরোগী। এডিসের কামড়ে বছরজুড়ে হাসপাতালে রোগী ভর্তি হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।

যা গত বছরের তুলনায় চলতি বছরের তিন মাসে ডেঙ্গুরোগী হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা বেশি। করোনার ভয়াবহ পরিস্থিতির মোকাবিলার পর এডিস মশানিধনের চ্যালেঞ্জে পড়তে যাচ্ছে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন।

কারণ গত কয়েক বছর আগেও বলা হতো, ডেঙ্গুরোগ একটি সুনির্দিষ্ট সময়ে হয়ে থাকে। বর্তমানে এটি আর কোনো সুনির্দিষ্ট সময়ে সীমাবদ্ধ নেই। বছরজুড়েই ডেঙ্গুরোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন।

জানা গেছে, ঢাকা দুই সিটি কর্পোরেশন ইতোমধ্যে করোনা ভাইরাস রোধে সকল কর্মকর্তা-কর্মচারী ব্যস্ত রয়েছেন। এতে কিউলেক্স মশা ও এডিস মশার দিকে নজর কমেছে। যা চলতি মাসের শেষের দিকে বোঝা যাবে।

করোনার ভয়াবহ পরিস্থিতি উত্তরণের পরবর্তী সময়ে ডেঙ্গু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি পড়তে যাচ্ছে দুই সিটি কর্পোরেশন। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে এখন চার দেয়ালে বন্দি রাজধানীবাসী।

কিন্তু ঘরেও নিস্তার নেই। ভীষণ যন্ত্রণাদায়ক হয়ে দাঁড়িয়েছে মশার উৎপাত। ক্রমেই তা বাড়ছে। করোনা মহামারিতে আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কায় নগরবাসীর দিন যখন কাটছে নিদারুণ উৎকণ্ঠায়, তখন মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো বিষফোঁড়া হয়ে দেখা দিয়েছে মশার যন্ত্রণা।

গত বছরের তথ্যমতে, মার্চের শেষদিকে রাজধানীতে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব ঘটে, যা পরে দেশের প্রতিটি জেলায় মহামারির মতো ছড়িয়ে যায়। সেই প্রকোপ ছিলো নভেম্বর মাসের শেষ পর্যন্ত। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিল যে, হাসপাতালগুলোর ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে যায়।

মেঝেতে, বারান্দায় বা যেখানে একটু ফাঁকা পাওয়া যায়, সেখানেই শয্যা পেতে আশ্রয় নেয় রোগীরা। তিক্ত সেই অভিজ্ঞতার পরও এ বছর এ পর্যন্ত কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন। করোনা নিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নগরজুড়ে মশার ওষুধ ছিটানো বন্ধপ্রায়।

সরেজমিন দেখা গেছে, ঢাকা দক্ষিণে ভিআইপি এলাকা হিসেবে পরিচিত মিন্টো রোড, হেয়ার রোড, রমনার কিছু এলাকায় নিয়মিত মশকনিধনকর্মীরা ওষুধ ছিটাচ্ছেন।

তবে আজিমপুর, নিউমার্কেট, শাহবাগ, খিলগাঁও, যাত্রাবাড়ী, লালবাগসহ ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোয় এসব উদ্যোগ দেখা যায়নি। শাহবাগ এলাকায় কয়েক দিন ধরে কোনো মশকনিধনকর্মীর তৎপরতা দেখা যায়নি। কেন?

এমন প্রশ্নে এ এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত সুপারভাইজার মিজানুর রহমান ফোনে বলেন, আমি অসুস্থ। এসবের খবর রাখি না। একই অবস্থা রয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ক্ষেত্রেও।

গুলশান, বনানীসহ অপেক্ষাকৃত ভিআইপি এলাকাগুলোয় মশার ওষুধ ছিটানো হলেও উত্তরা, মীরপুরসহ ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোয় মশকনিধনকর্মীদের দেখা নেই।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এডিস মশার পাশাপাশি ইদানীং কিউলেক্স মশার উপদ্রব বেড়ে গেছে ঢাকায়। কার্যকর পূর্ব প্রস্তুতি না নিতে পারলে আগামীতে পরিস্থিতি আরও মারাত্মক রূপ নিতে পারে।

সেজন্য মশকনিধন কার্যক্রম আরও জোরদার করতে হবে। যদিও এডিস ও কিউলেক্স মশানিধনের পদ্ধতি ভিন্ন ধরনের। তবে আগামী দুমাসের মধ্যে দুই সিটি কর্পোরেশন এক্ষেত্রে টেকসই কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে পারলে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে। নইলে নগরবাসীর কপালে দুর্ভোগ আছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, বিগত বছরগুলোয় দেখা গেছে, জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে এডিস মশার উপদ্রব ছিলো না।

কিন্তু এ বছর জানুয়ারির শুরু থেকেই নগরীতে এডিস মশার উৎপাত দেখা গেছে। তিনি বলেন, তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এডিস মশা বাড়বে, বাড়বে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও। তাই বৃষ্টি হওয়ার আগেই মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করার উদ্যোগ নিতে হবে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শরীফ আহমেদ আমার সংবাদকে বলেন, ঢাকার মশার ক্ষেত্রের তুলনায় তাদের জনবল ও সক্ষমতা অপ্রতুল। করোনা পরিস্থিতির মধ্যে মশকনিধন শূন্যের কোঠায় না নেয়া গেলেও সকলের সহযোগিতায় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা সম্ভব। মশকনিধনকর্মীরা মাঠে নিয়মিত ওষুধ প্রয়োগ করছেন।

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোমিনুর রহমান মামুন আমার সংবাদকে বলেন, করোনা পরিস্থিতির মধ্যে সিটি কর্পোরেশনের মশকনিধনকর্মীরা নিয়মিত ওষুধ দিচ্ছে।

এছাড়া কর্পোরেশনে আওতাধীন খালগুলোর ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করা হচ্ছে। গতবছরের তুলনায় মশানিধনে সিটি কর্পোরেশনে লোকবল ও যন্ত্রাংশ বেড়েছে। যা ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে ভাগ করে দেয়া হয়েছে।

নগরবাসীরা বলছেন, প্রতিদিন সকাল-বিকাল দুবার ওষুধ ছিটানোর পরও মশার যন্ত্রণা থেকে নিস্তার মেলা ভার। আর সিটি কর্পোরেশনের মশকনিধনকর্মীদের তৎপরতা কদাচিৎ চোখে পড়ছে। কাজেই মশার উৎপাত বেড়ে গেছে।

তারা বলছেন, করোনা-সংকটের মধ্যেই এ বছরও যদি গত বছরের মতো ডেঙ্গু ছড়িয়ে যায়, তা হলে পরিস্থিতি হবে খুবই ভয়াবহ।

মশার উপদ্রব সম্পর্কে রাজধানীর হাজারীবাগের বাসিন্দা জামাল উদ্দিন বলেন, দেশে করোনা ভাইরাসে মানুষ ভীষণ আতঙ্কে রয়েছে, এরমধ্যে সামনে ফের ডেঙ্গুরোগ তো আছেই। করোনা দেখা দেয়ায় ডেঙ্গুর কথা এখন পর্যন্ত সেভাবে আলোচনায় আসছে না।

কিন্তু গত মৌসুমে ডেঙ্গু মারাত্মক রূপ নেয়ার ক্ষেত্রে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের ব্যর্থতাকেই দায়ী করেছে রাজধানীবাসী। বছরব্যাপী মশকনিধন কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি তখন এতটা ভয়াবহ রূপ নিত না।

ইদানীং মশার উপদ্রব আবারো বেড়ে গেছে। এতই বেড়েছে যে, ঘরে-বাইরে সব জায়গায় মশা কামড়াচ্ছে। কোথাও শান্তি নেই। দিন নেই, রাত নেই সব সময়ই মশার উৎপাত।

ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের পরে বিজয়ী মেয়রদের শপথ অনুষ্ঠান হলেও তারা এখনো দায়িত্ব গ্রহণ করেননি। আগামী ১৭ মে বর্তমান মেয়রদের দায়িত্বকাল শেষ হবে।

এরপর নতুন মেয়ররা দায়িত্ব নেবেন। ঢাকা উত্তর সিটিতে দায়িত্ব পালন করছেন ভারপ্রাপ্ত মেয়র আর দক্ষিণের দায়িত্বে আছেন বর্তমান মেয়র সাঈদ খোকন।

মশকনিধনে ঢাকার দুই সিটি কর্তৃপক্ষ বেশ ঘটা করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের বিষয়ে জানালেও তা থেমে আছে সেখানেই। মাঠে তা এ পর্যন্ত দৃশ্যমান হয়নি, অভিযোগ সাধারণ মানুষের। উত্তরের কিছু এলাকায় মশার ওষুধ ছিটানো হলেও দক্ষিণে তা-ও হয়নি।

এর বাইরে উত্তর কর্তৃপক্ষ মশকনিধনে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে বেশকিছু ক্যাম্পেইন, সভা-সমাবেশও করেছে। মশা নির্মূলে কয়েকটি ওয়ার্ডে ক্রাশ প্রোগ্রামও চালানো হয়েছে। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় যৎসামান্য বলে জানান নগরবাসী।

আমারসংবাদ/এআই