বুধবার ০৩ জুন ২০২০

২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

ই-পেপার

নুর মোহাম্মদ মিঠু

প্রিন্ট সংস্করণ

এপ্রিল ০৩,২০২০, ০৩:০৩

এপ্রিল ০৩,২০২০, ০৩:০৩

সংকটেও আত্মসাতে জনপ্রতিনিধিরা

বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করলে করোনা ভাইরাসের বৈশ্বিক মহামারি বাংলাদেশে এখনো গুরুতর রূপ নেয়নি। সংক্রমণের মাত্রা এখনো নিম্নপর্যায়ে। সরকার ও দেশের জনগণের জন্য আপাতত দৃষ্টিতে এটি স্বস্তিদায়ক।

দেশবাসীর প্রত্যাশা সরকারের সামাজিক বিচ্ছিন্নতার নীতি এবং করোনা আক্রান্ত মানুষকে শনাক্ত ও তাদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করার কর্মসূচিতে সফল হবে সরকার।

কিন্তু করোনা সংকট দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে যে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে এবং অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি যে প্রভাব ফেলবে, তা কীভাবে সামাল দেবে সরকার সেটাই হালের বড় দুশ্চিন্তার কারণ।

সরকার ও দেশের মানুষের মধ্যে যখন এমন দুশ্চিন্তার ঘুরপাক খাচ্ছে ঠিক তখনই সংকট মোকাবিলায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারের দেয়া ত্রাণসামগ্রী আত্মসাতের মহড়ায় ব্যস্ত রয়েছে একশ্রেণির অসাধু জনপ্রতিনিধিরা।

জাতীয় অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় এসব জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা যেমন-তেমন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মাঝে সরকারের ত্রাণসহ অন্যান্য সুবিধা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা শতভাগ।

কিন্তু সরকারের দেয়া এসব সুবিধা জনগণের দৌরগোড়ায় কতটা পৌঁছাচ্ছে জনপ্রতিনিধিরা তা নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চাল আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।

করোনা ভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বা পুরোপুরি লকডাউনইকার্যকর উদ্যোগ বলে বলছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশ্বের সব দেশই এই কৌশল নিয়েছে।

কিন্তু এই কৌশলে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি যারা ক্ষতির মুখে পড়েছেন, তারা শহর ও গ্রামের দিনমজুর, রিকশাচালক, ভ্যানচালক, ছোট দোকানদার, পরিবহনশ্রমিক, রেস্তোরাঁর শ্রমিক, গৃহকর্মী, ফেরিওয়ালা বা হকারের মতো শ্রমজীবী শ্রেণির মানুষ। বাংলাদেশে এ ধরনের মানুষের সংখ্যা বর্তমানে দুই কোটিরও বেশি।

সরকার রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল গঠনের কথা বলেছে, তবে তার সুবিধা অনানুষ্ঠানিক খাত বা ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলো পাবে না। বাংলাদেশে অনানুষ্ঠানিক খাতেই ৮৬ শতাংশ শ্রমিক কাজ করেন।

ফলে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বা সবকিছু বন্ধ করে দেয়ার এক সপ্তাহ পার না হতেই দরিদ্র ও কর্মহীন মানুষের মধ্যে শুরু হয়েছে হাহাকার। আয়ের অভাবে জীবন ধারণ কঠিন হয়ে পড়েছে তাদের। সরকার সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় দরিদ্র মানুষের ঘরে ঘরে খাবার পৌঁছে দেয়ার কথা বলেছে।

কিন্তু সরকারের এ কার্যক্রম কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। তবে বাস্তবায়নে জনপ্রতিনিধিদের আত্মসাতের চিত্র উঠে এসেছে ঠিকই।

স্বাভাবিক অবস্থায় দরিদ্র ও অভাবী মানুষরা প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের কাছে সহায়তার জন্য যায়। কিন্তু এই মুহূর্তে সেই সুযোগও নেই। নিরাপত্তার জন্য সরকারই তাদের ঘরে থাকার পরামর্শ দিয়েছে।

এ অবস্থায় হতদরিদ্র ও নিম্নবিত্ত মানুষের ঘরে খাদ্যসংকটের যে খবর শোনা যাচ্ছে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলছেন সংশ্লিষ্টরা। কোনো কোনো স্থান থেকে ‘অবরুদ্ধ মানুষ’ টেলিফোন করে জানিয়েছেন, তারা খাবারের সংকটে রয়েছেন। এরপর প্রশাসন খবর পেয়ে তাদের কাছে খাবার পৌঁছে দিচ্ছেন।

কিন্তু এ ধরনের বিক্ষিপ্ত ও বিচ্ছিন্ন কার্যক্রম দিয়ে বিপুলসংখ্যক দরিদ্র মানুষের ঘরে খাবার পৌঁছানো আদৌ সম্ভব নয় বলে বলছেন বিশেষজ্ঞরা। সরকার সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় হতদরিদ্র মানুষের কাছে খাবারসহ অন্যান্য ত্রাণ সামগ্রী পৌঁছে দেয়ার যে পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে, তা বাস্তবায়নের জন্যই জনপ্রতিনিধিদের ব্যবহার করছে সরকার।

কিন্তু সেই জনপ্রতিনিধিরাই সরকারের দেয়া জনগণের জন্য ত্রাণসমাগ্রী আত্মসাতের মহড়া দিচ্ছেন।
ইতোমধ্যে মাদারীপুর, সাতক্ষীরা, ভোলা, পটুয়াখালী ও হবীগঞ্জে এসব ত্রাণ সামগ্রী আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে।

শুধু তাই নয়, আত্মসাতের তথ্য তুলে ধরে সংবাদ প্রকাশ ও আত্মসাতে বাধা দিলে নির্যাতন করা হয় বেশকজন সাংবাদিককেও। খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চাল আত্মসাতের এসব খবর দেশজুড়ে আলোচনায় আসার পর অনেকেই এখন বলছেন, এসব ত্রাণ সামগ্রী জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে নয় বরং প্রশাসনের মাধ্যমে বিতরণ হোক।

অনেকেই বলছেন, রাজনৈতিক প্রভাব প্রতিপত্তির জোরে চাল বিতরণের দায়িত্ব যেসব জনপ্রতিনিধিরা পাচ্ছে, তাদের বেশিরভাগই আত্মস্বার্থ উদ্ধারে ব্যস্ত থাকেন।

অতীতেও এরকম অসংখ্য ঘটনা দেখা গেছে, কর্মসূচি সফল না হলে জনপ্রতিনিধিরা প্রশাসনকে আর প্রশাসন জনপ্রতিনিধিদের দোষারোপ করে থাকে।

কিন্তু বর্তমানে একে অপরকে দোষারোপের সময় নয়। এ মুহূর্তে হতদরিদ্র ও অভাবী মানুষের কাছে খাবারসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছানোই জরুরি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি গুদামে প্রচুর খাদ্য কিংবা ত্রাণসমাগ্রী মজুত থাকলেই হবে না, সেই খাদ্য ও ত্রাণসামগ্রী হতদরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছানোরও ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে সরকারকেই। অন্যথায় প্রান্তিক জনজীবনে মানবিক বিপর্যয় নেমে আসার শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

আমারসংবাদ/এআই