বৃহস্পতিবার ০৯ এপ্রিল ২০২০

২৬ চৈত্র ১৪২৬

ই-পেপার

আসাদুজ্জামান আজম

প্রিন্ট সংস্করণ

মার্চ ২৬,২০২০, ০১:৩৬

মার্চ ২৬,২০২০, ০১:৩৬

মাদ্রাসার নিয়োগে কর্তৃত্ব ফেরত চান ডিসিরা

সারাদেশে সকল মাদ্রাসায় অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষ, সুপার এবং কর্মচারী নিয়োগে কর্তৃত্ব ফিরে পেতে চান জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা।

এক মাসের ব্যবধানে মাদ্রাসার নিয়োগে ক্ষমতা হারানোয় ক্ষুব্ধ জেলা প্রশাসকরা। মাঠপ্রশাসনে বিশৃঙ্খলার শঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা।

একই সঙ্গে পুনরায় বিষয়টি বিবেচনায় নিতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও কারিগরি এবং মাদ্রাসা বিভাগের প্রতি চিঠি দিয়েছেন ৩৫ জেলা প্রশাসক। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

জেলা প্রশাসকদের চিঠির সূত্র মতে, গত ১৮ ফেব্রুয়ারি শিক্ষক নিয়োগে জেলা প্রশাসকদের প্রতিনিধি রাখার আদেশ দেয়ার পর অনেক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগে জেলা প্রশাসক কর্তৃক প্রতিনিধি নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

এই মুহূর্তে জেলা প্রশাসক কর্তৃক নিয়োজিত প্রতিনিধি বাতিল করা হলে স্থানীয়পর্যায়ে বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে, তাছাড়া নিয়ম ও দুর্নীতি হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে। এছাড়া জঙ্গিবাদ দমন প্রক্রিয়াও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করেছেন জেলা প্রশাসকরা।

বিষয়টি নিশ্চিত করে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, এ ব্যাপারে পরবর্তী করণীয় ঠিক করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বসার উদ্যোগ নেয়া হবে। কারণ জেলা প্রশাসকদের নিয়োগ বোর্ডে রাখার সিদ্ধান্তটি ছিলো মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের।

সারা দেশের মাদ্রাসাগুলোতে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।

এরপর গত ১৮ ফেব্রুয়ারি মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের পাঠানো হয়।

ওই আদেশে বলা হয়, পরবর্তী নির্দেশনা না দেয়া পর্যন্ত দাখিল, আলিম, ফাজিল ও কামিল মাদ্রাসার শিক্ষক-কর্মচারীসহ সকল পদে নিয়োগের জন্য স্ব স্ব জেলার জেলা প্রশাসক মহাপরিচালকের প্রতিনিধি হবে/মনোনয়ন দিবেন। ওই আদেশের পর মাদ্রাসায় মাঠপ্রশাসনের কর্তৃত্ব সৃষ্টি হয়। যা ইতিবাচক হিসেবে নেয় জেলা প্রশাসকরা।

কিন্তু এক মাসের মাথায় ওই আদেশটি বাতিল করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। গত ১৯ মার্চ পৃথক আরেকটি আদেশ জারি করে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর।

মহাপরিচালক সফিউদ্দিন আহমদ স্বাক্ষরিত আদেশে ওই আদেশে বলা হয়, গত ১৮ ফেব্রুয়ারি মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের আদেশটি বাতিল করে পুনরায় ডিজির প্রতিনিধিরাই নিয়োগ বোর্ডে থাকবেন।

তবে জেলা প্রশাসক/উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা যথারীতি শিক্ষার মান উন্নয়নে মাদ্রাসাসমূহ পরিদর্শন করবেন।আদেশ বাতিল খবরে ক্ষুব্ধ হয়েছেন জেলা প্রশাসকরা।

গত দুই দিন অন্তত ৩৫ জেলার ডিসি মন্ত্রিপরিষদ সচিব, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা বিভাগের সচিবের কাছে স্থানীয় প্রশাসনকে ডিজির প্রতিনিধি করার আদেশটি পুনর্বহাল করার জন্য চিঠি দিয়েছেন।

চিঠিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এমন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে স্থানীয়পর্যায়ে বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা। আদেশটি বাতিল করে নিয়োগ প্রক্রিয়া জেলা প্রশাসকদের নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য দাবি করেছেন তারা।

কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসক সারওয়ার মুর্শেদ চৌধুরী চিঠিতে বলেন, এ আদেশের ফলে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগে আবার বিশৃঙ্খলা, দুর্নীতি বাড়বে।

জেলা প্রশাসন মহাপরিচালকের প্রতিনিধি হওয়ার নির্দেশনা দেয়ার পর স্থানীয় প্রশাসন দক্ষতা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে নিয়োগ কার্যক্রম পালন করার কারণে এক মাসেই স্থানীয়দের কাছে প্রশংসিত হয়েছিল।

বরিশালের ডিসি এস এম অজিয়র রহমান বলেন, আমাদের দেশে জঙ্গিবাদ ও চরমপন্থা একটি মারাত্মক সমস্যা। যা বিভিন্ন সময়ে দেখা যায়। সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপে তা নিয়ন্ত্রণে থাকলেও পুনরায় তা বিস্তারের আশঙ্কা রয়েছে। জঙ্গিবাদ দমনে অতীতে জেলা প্রশাসন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

অনেক সময় মাদ্রাসাগুলো জঙ্গিবাদ বিস্তার রোধে মাদ্রাসা প্রশাসনিক পদসহ শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া উচিত।

জেলা প্রশাসন নিয়োগ কমিটিতে থাকলে এ বিষয়টি স্থানীয়ভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এছাড়াও জেলা প্রশাসকরা সম্পৃক্ত থাকলে সরকারের বিভিন্ন গৃহীত নীতি পরিকল্পনা মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নে সহজতর হয়।

লালমনিরহাটের ডিসি আবু জাফর বলেন, মাদ্রাসা ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি সাধারণ স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরাই হয়ে থাকেন।

অনেক ক্ষেত্রে তারা পছন্দমতো ব্যক্তিকে নিয়োগের চেষ্টা করেন। অধিদপ্তর থেকে আগত কর্মকর্তারা প্রভাবশালী সভাপতির ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নিয়োগ সম্পন্ন সক্ষম হন না।

ফলে স্বচ্ছ নিয়োগ কার্যক্রমে তাদর দায়িত্বশীল ভূমিকার অভাবে অনিয়ম হয়ে থাকে। জেলা প্রশাসনের প্রতিনিধি নিয়োগ কমিটিতে থাকলে ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতির অনিয়মের জন্য চাপ সৃষ্টি করার সুযোগ পাবেন না। ফলে নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

রাজশাহী জেলা প্রশাসক হামিদুল হক মনে করেন, দেশের বেশির ভাগ মাদ্রাসা অনেকটা স্থানীয়ভাবে গড়ে উঠে এবং প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদের ব্যাপক প্রভাব থাকে।

তাই নিয়োগের ক্ষেত্রে পর্ষদের মধ্যে স্বজনপ্রীতি দেখা যায়, যা বিভিন্ন নিয়োগের সময় লক্ষণীয়। এটা কেবল জেলা প্রশাসনের পক্ষে রোধ করা সম্ভব।

কারণ স্থানীয়পর্যায়ে কেন্দ্রীয় সরকার তথা জনপ্রশাসন মস্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি হওয়ায় নিয়োগ, পদোন্নতি ও মানব সম্পদ উন্নয়নে অন্যতম ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান।

তাই মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো থেকে শুরু করে মাদ্রাসা শিক্ষার উৎকর্ষতা মানোন্নয়ন ও বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়নে মাদ্রাসা শিক্ষার নিয়োগের ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসনকে সম্পৃক্তকরণ ছিলো একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। তা পরিবর্তন করা যৌক্তিক হয়নি। না

টোরের জেলা প্রশাসক মো. শাহরিয়াজ পিএএ চিঠিতে বলেন, মাদ্রাসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা আনয়ন করা না গেলে বর্তমান সরকারের মানসম্মত শিক্ষা বাস্তবায়ন সম্ভবপর হবে না।

এমতাবস্থায় মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের ১৯ মার্চের আদেশ বাতিলপূর্বক এ নিয়োগ প্রক্রিয়া জেলা প্রশাসকের নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো।

একইভাবে অনুরোধ জানিয়েছেন মেহেরপুর, ফেনী, কুষ্টিয়া, মাগুরা, গাইবান্ধা, খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ভোলা, নীলফামারী, গাইবান্ধা, দিনাজপুর, যশোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, চাঁদপুর, রাজশাহী, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জসহ অন্তত ৩০টি জেলা প্রশাসক।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে সূত্র মতে, সারা দেশে আট হাজারের বেশি মাদ্রাসায় শিক্ষক নিয়োগ, তদারকি, এমপিওসহ শিক্ষা কার্যক্রমে স্থবিরতা নিয়ে জেলা প্রশাসক সম্মেলনে ক্ষোভ প্রকাশ করেন ডিসিরা।

বিষয়টি আমলে নিয়ে গত বছর ২ সেপ্টেম্বর কারিগরি ও মাদ্রাসা বিভাগের সচিবকে একটি নির্দেশনা দেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।

নির্দেশনায় বলা হয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় দুটি বিভাগের ভাগ হওয়ার পর কারিগরি ও মাদ্রাসা বিভাগের অধীনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তদারকির জন্য মাঠপর্যায়ে কর্মকর্তা না থাকায় শিক্ষা কার্যক্রম দারুণভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

এ অবস্থায় মাঠপর্যায়ে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কার্যক্রম তদারকি শিক্ষক নিয়োগের প্রতিনিধি ডিসি-ইউএনওদের দিতে বলা হয়।

মন্ত্রিপরিষদের এমন নির্দেশনা মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তার বাধার মুখে বাস্তবায়ন করতে পারেনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

বিষয়টি নিয়ে ১৮ ফেব্রুয়ারি প্রকাশ হওয়ার পর নড়েচড়ে বসে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা বিভাগের সচিব।

তিনি মহাপরিচালককের বিষয়টি খতিয়ে দেখে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিলে ওইদিনই অধিদপ্তর নির্দেশনা জারি করে।

ডিসিদের চিঠি পাওয়ার পর বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষামন্ত্রীকে জানিয়েছেন কারিগরি ও মাদ্রাসা বিভাগের বিভাগের সচিব। তবে এ ব্যাপারে চূড়ান্ত কোনো মতামত দেননি মন্ত্রী।

কারিগরি ও মাদ্রাসা বিভাগের সচিব মুনসী শাহাবুদ্দীন আহমেদ বলেন, ডিসিরা আগের আদেশটি পুনর্বহাল চেয়ে চিঠি দিয়েছে। এটা এখন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সঙ্গে বসে সমাধান খোঁজা হবে।

আমারসংবাদ/এআই