বৃহস্পতিবার ০৯ এপ্রিল ২০২০

২৬ চৈত্র ১৪২৬

ই-পেপার

আবদুর রহিম

প্রিন্ট সংস্করণ

মার্চ ২৬,২০২০, ১২:৫৬

মার্চ ২৬,২০২০, ১২:৫৬

মুক্ত খালেদা জিয়ার হাত ঢাকা হলুদ কাপড়ে!

হুইল চেয়ারে বসা! বাম হাত হলুদ কাপড়ে পুরোপুরি ঢাকা। পায়ে হাসপাতালের সাদা কাপড়ের জুতা। মুখে আকাশি রংয়ের মাস্ক। চোখে চশমা। কালো হিজাব কাপড়ে আবৃত চুল।

পরণে পিঙ্ক কালারের বোরকা। ডান পাশে সেবিকা ফাতেমা বামে কারারক্ষী এক নারী— এমন দৃশ্যেই গতকাল সোয়া ৪টায় দুই বছর ৪৭ দিন কারাবন্দির পর বিএসএমএমইউ থেকে বের হতে দেখা গেলো সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে।

বন্দি হওয়ার আগে তিনি হেঁটেই কারাগারে গিয়েছিলেন। হাত তুলে দলের লাখো নেতাকর্মীকে করে যান সম্বোধন। কিন্তু গতকাল তার মুক্তির পর স্লোগানে দলের হাজার হাজার নেতাকর্মীকে দেখলেও হাত তুলে সম্বোধন করেননি। গাড়িতে ওঠার পর মুখ খুললেও তখনো তিনি নীরব ছিলেন।

মুখে ছিলো না কোনো হাসি। প্রায় ঘণ্টাখানেক গাড়িতে থেকে বিকাল ৫টা ১৬ মিনিটে তিনি তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে গুলশান-২ এর ৭৯ নম্বর রোডের বাসভবন ফিরোজায় প্রবেশ করেন। এসময়ও দেখা গেছে খালেদা জিয়ার হাত হলুদ কাপড়ে ঢাকা।

সন্ধ্যায় খালেদা জিয়ার বাসা (ফিরোজা) থেকে বেরিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানান, চিকিৎসকের পরামর্শে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকবেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এমন সময়ে খালেদা জিয়া মুক্ত হলেন যখন নভেল করোনা ভাইরাসের মহামারিতে পুরো বিশ্বজুড়ে চলছে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা। বাংলাদেশও রয়েছে প্রায় অবরুদ্ধ। খালেদার মুক্তিতে দলের ব্যর্থতায় রাজনৈতিকভাবে নতুনভাবে মাঠে আসারও আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে।

খালেদা জিয়ার মুক্তির সফলতা পুরোটাই পরিবারের। রাজনৈতিক ব্যর্থতার পর খালেদা জিয়ার নির্দেশে পরিবারের চেষ্টায় আসে কার্যত সমাধান, দলের নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলোর এমনই দাবি।

ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১-এর উপধারা ১ অনুযায়ী বয়স বিবেচনায় মানবিক কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে দণ্ড স্থগিত করে ছয় মাসের জন্য বেগম জিয়াকে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি দেয়া হয়।

শর্ত অনুযায়ী, মুক্ত থাকাকালীন খালেদা জিয়া নিজ বাসায় থেকে চিকিৎসা গ্রহণ করবেন। ওই সময়ে তিনি দেশের বাইরে যেতে পারবেন না।

গত মঙ্গলবার বিকালে গুলশানে নিজ বাসায় এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বেগম জিয়ার দণ্ড স্থগিত করে তাকে ছয় মাসের জন্য মুক্তি দিতে সরকারের সিদ্ধান্তের কথা জানান আইনমন্ত্রী আনিসুল হক।

এরপরই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বেগম জিয়ার মুক্তির বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। গতকাল খালেদা জিয়া মুক্তি পাচ্ছেন এমন ইঙ্গিতের পর করোনা আতঙ্কের মধ্যেও দলের শতশত নেতাকর্মী সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে এক নজর দেখতে শাহবাগে ভিড় জমান।

ঢল নামে সাধারণ মানুষেরও। অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছেন, সরকার যে শর্তে খালেদা জিয়ার সাজা ছয় মাসের জন্য স্থগিত করেছে সেই শর্ত ভঙ্গ করলে তা বাতিল হয়ে যাবে।

গতকাল বিকাল সোয়া ৪টায় বিএসএমএমইউ হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেয়া হয় খালেদা জিয়াকে। এরপর তিনি ছোট ভাই শামীম ইস্কান্দারের জিম্মায় একটি প্রাইভেটকারে করে গুলশানের বাসভবন ‘ফিরোজা’র উদ্দেশ্যে রওনা দেন। শামীম ইস্কান্দার নিজে গাড়ি চালান।

এসময় শামীমের স্ত্রী কানিজ ফাতেমাও ওই গাড়িতে ছিলেন। শাহবাগ থেকে গুলশান পর্যন্ত রাস্তার দুপাশে দাঁড়িয়ে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ বেগম জিয়াকে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানাতে দেখা গেছে।

তবে গাড়িবহরটি বিকাল ৫টার দিকে কারওয়ান বাজার অতিক্রম করার সময় বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী দেখে পুলিশ লাঠিচার্জ করে। এতে বেশ কয়েকজন আহত হন। নেতাকর্মীরা তবুও সরে যায়নি।

গাড়িবহরটি ফার্মগেট এলাকায় গেলে আবারো লাঠিচার্জ করে পুলিশ। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এলাকায় গাড়িবহরের সাথে থাকা মোটরসাইকেল বহরেও বাধা দেয়া হয়।

বিকাল ৫টা ১৬ মিনিটে তিনি কারওয়ানবাজার মোড় হয়ে ফার্মগেট, মহাখালী ফ্লাইওভার হয়ে গুলশান-২-এর ৭৯ নম্বর রোডের বাসভবন ফিরোজায় প্রবেশ করেন।

কারাগারে যাওয়ার আগে ৮ ফেব্রুয়ারি ফিরোজা থেকেই আদালতের উদ্দেশে বেরিয়েছিলেন তিনি। ২০১২ সালের ২১ এপ্রিল গুলশান-২ এর ৭৯ নম্বর রোডের বাসভবন ‘ফিরোজা’য় ওঠেন তিনি। এই বাড়িটি বিএনপি নেতা অবসরপ্রাপ্ত মেজর কামরুল ইসলামের ছেলে তানভীর ইসলামের।

বাড়িটিতে প্রায় সাতটি বেডরুম, লিভিং রুম, একটি সবুজ লন, বাগানসহ আধুনিক সুযোগ-সুবিধা আছে। ক্যান্টনমেন্টের মঈনুল হোসেন রোডের বাড়িটি আদালতের রায়ে হারানোর পর কিছুদিন খালেদা জিয়া তার ভাই শামীম ইস্কান্দারের বাড়িতে ছিলেন।

এরপর ফিরোজায় বসবাস শুরু করেন। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি এই বাড়ি থেকেই পুরান ঢাকার আলিয়া মাদ্রাসা মাঠের অস্থায়ী আদালতে গিয়েছিলেন তিনি। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায়ে সাজা হওয়ায় সেখান থেকে সরাসরি তাকে পুরান ঢাকার সাবেক কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। এখন এ বাড়িতেই আগামী ছয় মাস খালেদা জিয়ার চিকিৎসা চলবে।

উল্লেখ্য, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় নিম্ন আদালত ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিলেন। সেদিনই তাকে কারাগারে রাখা হয়।

এ মামলায় হাইকোর্ট ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর এক রায়ে খালেদা জিয়ার সাজা বাড়িয়ে ১০ বছর করেছেন।হাইকোর্টের এ রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিল বিভাগে বিচারাধীন।

এছাড়া জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ২০১৮ সালের ২৯ অক্টোবর খালেদা জিয়াকে সাত বছর কারাদণ্ড দিয়ে রায় ঘোষণা করেন ঢাকার বিশেষ জজ আদালত।

এরপর এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন খালেদা জিয়া। এই আপিল হাইকোর্টে বিচারাধীন।

আমারসংবাদ/এআই