সোমবার ৩০ মার্চ ২০২০

১৬ চৈত্র ১৪২৬

ই-পেপার

শাহ আলম নূর

প্রিন্ট সংস্করণ

মার্চ ২৪,২০২০, ০২:২৬

মার্চ ২৪,২০২০, ০২:২৬

করোনায় বাতিল হচ্ছে অর্ডার

দেশের গার্মেন্ট সেক্টরে করোনা ভাইরাসের প্রভাব ইতোমধ্যে পড়তে শুরু করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশি অনেক ক্রেতা তাদের অর্ডার বাতিল করছেন। কাজের অর্ডার পাওয়ার পর অনেকেই ইতোমধ্যে পণ্য তৈরিও করেছেন।

এসব তৈরি পোশাক রপ্তানি করতে না পারায় অধিকাংশ কারাখানায় জমা হচ্ছে স্টকলট। ফলে এখাতের ক্ষতির পরিমাণ প্রতিদিনই বাড়ছে।

রপ্তানি অর্ডার বাতিল হওয়ায় মালিকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে দুশ্চিন্তা। তারা সময়মত শ্রমিকদের বেতন দিতে পারবেন কি না তা নিয়েও রয়েছে শঙ্কা। এদিকে অনেক শ্রমিকই এখন রয়েছেন চাকরি হারানোর আতঙ্কে।

বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) সভাপতি ড. রুবানা হক বলেন, দেশের ১০৮৯ কারখানার প্রায় ১২০০০ কোটি টাকার অর্ডার বাতিল ও স্থগিত। অর্ডার বাতিল হওয়া এসব পণ্য এখন স্টকলট হিসাবে বিক্রি করতে হবে। এসব কারখানায় কাজ করেন প্রায় ১২ লাখ শ্রমিক।

তিনি বলেন, করোনার প্রভাবে অনেক গার্মেন্ট কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এতে
গার্মেন্ট সেক্টরে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক পোশাকশিল্পের ওপর যে ধাক্কা এসেছে সেটা সামাল দিয়ে এ শিল্প টিকে আছে— এটা অনেক বেশি। কারখানাগুলোতে যে হাজার কোটি টাকার স্টকলট জমা হয়েছে তা কোনো না কোনো ক্রেতার অর্ডারেই তৈরি হয়েছিলো। কিন্তু তারা এখন অর্ডার বাতিল করছে। এসব স্টকলট এখন নামমাত্র মূল্যে খোলা বাজারে বিক্রি করতে হবে।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) সভাপতি সেলিম ওসমান বলেন, বড় বড় ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান অর্ডার বাতিল করায় গার্মেন্ট মালিকরা আতঙ্কিত। অর্ডার বাতিল ছাড়াও অনেকে তৈরিকৃত মাল শিপমেন্ট করতে বারণ করছেন। এ অবস্থায় শিল্পের একমাত্র সম্পদ শ্রমিকদের বাঁচিয়ে রাখতে হবে। শিপমেন্ট শুরু হলে অবস্থা স্বাভাবিক হয়ে আসবে।

তিনি বলেন, ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কারখানা মালিকদের কারখানা বন্ধের চিন্তা করা ঠিক হবে না। সরকারের সহযোগিতায় এই সংকট মোকাবিলা করা যাবে।

বিকেএমইএ সহ-সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘ইউরোপের ব্র্যান্ড ও ক্রেতা প্রতিষ্ঠান গত রোববার পর্যন্ত বিভিন্ন কারখানার ৭৩ লাখ ডলারের ক্রয়াদেশ স্থগিত করেছে। সেটি বেড়ে এক কোটি ডলারে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

গ্রীষ্ম মৌসুমেই সাধারণত ব্র্যান্ডগুলো বড় ব্যবসা করে। তার আগেই করোনা আঘাত হেনেছে। ইউরোপে এইচঅ্যান্ডএমের ৬২ শতাংশ বিক্রয়কেন্দ্র বন্ধ।

তিনি বলেন, প্রতিদিনই গার্মেন্ট মালিকদের অর্ডার বাতিল হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে অহেতুক গার্মেন্ট চালু রেখে অনেকে শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন দিতে পারবেন না। ফলে শ্রমিকরা স্বাভাবিকভাবেই ক্ষুব্ধ হয়ে রাস্তায় নামবেন।

তিনি বলেন, এ মুহূর্তে ক্রেতারা বানানো পণ্যের অর্ডার বাতিল করছেন। এ অবস্থা দীর্ঘায়িত হলে কোনো গার্মেন্ট মালিক শ্রমিকদের বেতন দেয়া তো দূরের কথা, নিজের ঘরের জন্য চালও কিনতে পারবেন না।

এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইএবি) সালাম মুর্শেদী বলেন, অর্থ, বাণিজ্য ও শ্রম মন্ত্রণালয়ের অনেক ফান্ড আছে। এছাড়া চলমান প্রণোদনার তহবিলসহ নতুন বাজার সৃষ্টির জন্যও ফান্ড রয়েছে।

এই সংকট মোকাবিলায় এসব ফান্ড দ্রুত রিলিজ করতে হবে। পাশাপাশি করোনা মোকাবিলায় আলাদা বরাদ্দ দিলে গার্মেন্ট মালিকরা ওই সংকট উতরাতে পারবে।

বিজিএমইএ সাবেক সভাপতি আনোয়ার উল আলম পারভেজ বলেন, সাম্প্রতিক করোনার প্রভাবে ক্রেতারা অর্ডার বাতিল করছে। এ অবস্থায় গার্মেন্ট মালিকরা বেতন দেবে কীভাবে? টাকা আসবে কোত্থেকে? ইতোমধ্যে কম্বোডিয়া ও রেঙ্গুনে বেতন না দিয়ে কারখানা বন্ধ করে দিয়েছে।

কিন্তু বাস্তবতা হলো কালও যদি করোনা দেশ থেকে বিতাড়িত হয়, তাহলেও ৬ মাস গার্মেন্টে সমস্যা মোকাবিলা করতে হবে। এ অবস্থায় সরকার ২০-৩০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করতে পারে।

গার্মেন্ট সংশ্লিষ্টরা বলেন, এ শিল্পের যন্ত্রপাতি, ফেব্রিকস, সুতা, বোতাম, রঙের কেমিক্যাল ও কাঁচামালের চাহিদার ৭০ শতাংশের জোগানদাতা দেশ চীন থেকে আমদানি বন্ধ রয়েছে।

এসব সরঞ্জাম সংকটের কারণে ক্ষুদ্র ও মাঝারি গার্মেন্ট কারখানার উৎপাদন হুমকির মুখে পড়েছে। এতে অর্থনীতির পাশাপাশি ওইসব কারখানায় কর্মরতরা বিপাকে পড়বেন। তাদের বেতনভাতা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। চীনে গত বছরের নভেম্বরে প্রথম করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়।

সর্বশেষ ভাইরাসটি প্রায় ২০০ দেশে ছড়িয়ে পড়ার খবর পাওয়া গেছে। ভাইরাসটির কারণে ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। উন্নত দেশগুলোতে অনেক পোশাকের ব্র্যান্ড তাদের শত শত বিক্রয়কেন্দ্র বন্ধ করে দিয়েছে।

ইপিবির তথ্যে দেখা যায়, গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৩ হাজার ৪১৩ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে। তার মধ্যে ৬১ দশমিক ৯১ শতাংশ বা ২ হাজার ১১৩ কোটি ডলারের পোশাকের গন্তব্য ছিলো ইইউভুক্ত দেশ। আর যুক্তরাষ্ট্রে গেছে ৬১৩ কোটি ডলারের পোশাক।

আমারসংবাদ/এসটিএমএ