সোমবার ৩০ মার্চ ২০২০

১৬ চৈত্র ১৪২৬

ই-পেপার

আবদুর রহিম ও মাহমুদুল হাসান

প্রিন্ট সংস্করণ

মার্চ ২২,২০২০, ১২:৫৩

মার্চ ২২,২০২০, ০১:৪৩

করোনা প্রতিরোধ

সক্ষমতা কতটুকু?

  • জনশক্তির ১ শতাংশও যদি আক্রান্ত হয় তাহলে আমরা হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে পারবো না: বে-নজির আহমেদ (সাবেক পরিচালক , রোগ নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর)
  • চিকিৎসকদের নিরাপত্তা প্রস্তুতি অপ্রতুল, চিকিৎসকরা আক্রান্ত হতে থাকলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হবে: অধ্যাপক ডা. মাহমুদুর রহমান (সাবেক পরিচালক, রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট)
  • আমাদের এত বেশি সক্ষমতা নেই, ডেভেলপমেন্ট পার্টনারদের থেকে নিয়ে যতটুকু আছে সবটা দিয়েই কাজ করছি: ডা. আয়শা আক্তার (সহকারী পরিচালক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর)
  • দুই-চারটা লোক আক্রান্ত হচ্ছে, কিন্তু ৩০ থেকে ৪০ জনের সংখ্যায় পৌঁছে গেলে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে: ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, (গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি)

এখনো উদাসীনতা! মুখে সতর্কতা; বাস্তবে উল্টো। নির্দেশনা মানছেন না সরকারি কর্মকর্তারাও। করোনা মোকাবিলায় উন্নত রাষ্ট্রগুলো শহর লকডাউন, জরুরি অবস্থা, কারফিউ জারি করলেও বাংলাদেশে এখনো যথাযথ সাবধানতা দেখা যাচ্ছে না।

গতকালও হয়েছে উৎসবের ভোট, জনসমাগম! ক্যামেরার সামনে মন্ত্রী-এমপিদের রাজনৈতিক ব্রিফিংও চলছে। সচেতন মহল বলছে, করোনা মোকাবিলায় বাংলাদেশ বড় ধরনের ঝুঁকিতে রয়েছে।

বিদেশফেরতদের ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করা যায়নি। আক্রান্তদের পরীক্ষাও নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। করোনায় এখনো কতজন মৃত্যুঝুঁকিতে রয়েছে তার সুনিশ্চিত তালিকাও সুনিশ্চিত হচ্ছে না।

চীন, কোরিয়া, তাইওয়ান, হংকংয়ের মতো দেশ লাখ লাখ মানুষকে করোনা পরীক্ষা করে এবং সে অনুযায়ী মানুষকে সম্পৃক্ত করতে ভূমিকা দেখালেও সে তুলনায় বাংলাদেশে এই প্রস্তুতিগুলো এখনো পুরোপুরি দৃশ্যমান হয়নি।

করোনায় আক্রান্ত সন্দেহভাজনদের ঢাকায় পরীক্ষার পদ্ধতি চালু হলেও ঢাকার বাইরে এখনো পরীক্ষা শুরু হয়নি। প্রকৃত আক্রান্ত কারা শুরুতে ডাক্তাররাও জানতে পারছেন না।

তাই রোগীর মাধ্যমে ডাক্তাররাও আক্রান্তের বড় ঝুঁকিতে রয়েছেন। শুধু সচেতনতা ও কার্যত পদক্ষেপের অভাবে সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কাও সৃষ্টি হচ্ছে।

সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ওয়াজ মাহফিল, তীর্থযাত্রাসহ সব ধরনের ধর্মীয়, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সমাবেশ বন্ধের নির্দেশনা দিলেও পুরোপুরি মানছে না কেউ। আন্তর্জাতিক পর্যায়সহ সকল মাধ্যম থেকে পুরো দেশ লকডাউনের দাবি উঠেছে।

এছাড়া বাংলাদেশের করোনা মোকাবিলায় কতটা সক্ষমতা রয়েছে এ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অভিজ্ঞদের দাবি, বাংলাদেশে জনসংখ্যার যদি ওয়ান পয়েন্টও আক্রান্ত হয়, তাহলে দেশের হাসপাতালে চিকিৎসা করানো সম্ভব হবে না।

বাংলাদেশে সেই আলোকে আইসিইউসহ সব ধরনের সুবিধা নেই। চিকিৎসকদের নিরাপত্তা প্রস্তুতি অনেক অপ্রতুল, চিকিৎসকরা আক্রান্ত হতে থাকলে পরিস্থিতি আরো কঠিন হবে। এখনো যারা রোগী হয়ে আসছে তারা আক্রান্ত কি-না, তা আগ থেকে বোঝা যাচ্ছে না।

এছাড়া এখন মাত্র দুই-চারটা লোক আক্রান্ত হচ্ছে কিন্তু ৩০ থেকে ৪০ জনের সংখ্যায় পৌঁছে গেলে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে বলেও মন্তব্য অনেকের।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক বে-নজির আহমেদ বলেন, এই ধরনের একজন ক্লিনার তিনি একটা জিনিস ঠিকভাবে মানলো না। তখন তার মাধ্যমেই যথেষ্ঠ ভাইরাস ছড়িয়ে গেলো। এখন করোনা সতর্কতায় আমরা যদি ১০ শতাংশও না মানি, সেটাও আমাদের জন্য ঝুঁকি।

তিনি বলেন, ধরেন বাংলাদেশে ১৬ কোটি লোক আছে, যদি ১০ শতাংশ ছড়ায় তাহলে প্রায় এক কোটি ৭০ লাখ— প্রায় দুই কোটি লোক আক্রান্ত হবে।

তাহলে দুই কোটি লোকের মধ্যে যদি পয়েন্ট ৫ বা পয়েন্ট ৪ বা পয়েন্ট ওয়ানও যদি সিভিআর হয়, তাহলে আমরা হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে পারবো না। এত আইসিইউ, এত সুবিধা আমাদের নেই।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. মাহমুদুর রহমান আমার সংবাদকে বলেন, প্রথমেই আমাদের ভাবতে হবে। আমাদের দেশে রোগটা ঠিক কতটুকু ছড়িয়েছে সেটা জানার জন্য দেশে একটা সার্ভে করা দরকার। কিন্তু সেটা আমরা দেখতে পাচ্ছি না।

যদি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুসারে এই সার্ভেটা করা সম্ভব হতো, তাহলে দেশের একটা স্বচ্ছ পরিস্থিতি উপলব্ধি করতে পারতাম। সেই আলোকে ব্যবস্থা নিতে পারতাম।

এটাই ভাইরাসের সংক্রামণ ঠেকানোর বড় একটি মাধ্যম। আমরা বলি, ভাইরাসের ট্রান্সমেশন ফ্রম ওয়ান টু বি আদার। এটা করতে হবে। আমাদের আরেকটা বিষয় সবাইকে জানাতে হবে।

যারা আক্রান্ত হবে তাদের মধ্যে ৮০ ভাগই বাসায় প্রাথমিক চিকিৎসা নিলেই ভালো হয়ে যাবে। এ জন্য বাসায় আইসোলেট থাকার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

এরপরে সে বিষয়টি সামনে আসে সেটা হলো— চিকিৎসকদের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি থেকে নিরাপত্তা দেয়া। এ ক্ষেত্রে এখনো আমাদের ঘাটতি রয়ে গেছে।

গণমাধ্যমে আসছে— এ ক্ষেত্রে আমাদের প্রস্তুতি অনেক অপ্রতুল রয়েছে। এটা ছাড়া চিকিৎসা দেয়াটাও কিন্তু কঠিন হবে এবং এর অভাবে যদি চিকিৎসকরা আক্রান্ত হন, তাহলে কিন্তু পরিস্থিতি আরো কঠিন হবে। এ

মন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে হংকং। সেখানে সার্স ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের সময় চিকিৎসকরা পিপিইর অভাবে নিজেরাই আক্রান্ত হয়েছিলেন। এখন কথা হলো, ইতালিতে কী হচ্ছে সেটা বিষয় নয়, কিন্তু আমাদের দেশে এই সঙ্কট মোকাবিলা না করলে বিপদে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ দিকে আমাদের নজর দিতে হবে।

যদিও আজকে (গতকাল) আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, সব বিষয়ে প্রস্তুতি নেয়া হবে। যতক্ষণ এ প্রস্তুতি শেষ না হচ্ছে ততক্ষণ কিন্তু এটা দুর্বল জায়গা রয়ে গেছে। তিনি বলেন, আমরা উহান থেকে দেখেছি ভাইরাস হাসপাতাল থেকে প্রায় ৫০ ভাগের বেশি ছড়ায়।

তাই ওই জায়গাগুলোর নিরাপত্তা বেশি জোরদার করতে হবে। যাতে ইনফেকশন কন্ট্রোল করা যায়। আমরা হয়তো সেখানে হান্ডেড পার্সেন্ট পারবো না, কিন্তু যতটা পারা যায়; সেটা কমিয়ে রাখতে হবে।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী আমার সংবাদকে বলেন, ‘প্রথমেই আমি বলবো, এটা একটা মহামারি। এর জন্য সম্মিলিত পদক্ষেপ নিতে হবে। নয়তো যেকোনো মুহূর্তে আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।

এখন হয়তো দুই-চারটা লোক আক্রান্ত হচ্ছে। কিন্তু এটা ৩০ থেকে ৪০ জনের সংখ্যায় পৌঁছে গেলে তখন কি করবেন? এ জন্য আমাদের পয়লা কাজ হলো— এ রোগের বিস্তার যেনো না হয় সে ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়া।

এছাড়া আমাদের কতগুলো তাত্ত্বিক ও সাহসি পদক্ষেপ নিতে হবে। একটা সাহসি পদক্ষেপ হলো— আমাদের সারা দেশের কারাগারগুলোকে খালি করতে হবে। সারা দেশের কারাগারে ৯০ হাজার লোক আছে। এটা আমাদের জন্য একটা আগ্নেয়গিরির মধ্যে বসে আছি।

এখানে ফাঁসির আসামি ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আসামি ছাড়া বাকিদের প্যারোল অথবা তিন মাসের কিংবা ছয় মাসের জামিন দিয়ে দিতে হবে। নয়তো সবাইকে ক্ষমা করে দিন। এরপর আমাদের কোর্টের অবস্থা বদলাতে হবে।

সেখানে যে মহাভিড় এটা এড়াতে হবে। অনেকগুলো মামলা মোকাদ্দমা যে অহেতুক সেটাও তো আমরা জানি। এ জন্য বেশি জরুরি কাজগুলো দুই পক্ষের উকিল আর বিচারকের উপস্থিতি করলেই ভালো হবে।

শুধু ফাইনাল জার্জমেন্টের দিন বাদি-বিবাদি উপস্থিত থাকবেন। এটা করলে আদালতে ভিড় কমবে।’

তিনি আরো বলেন, মসজিদ, মন্দির, প্যাগোডাসহ সব ধর্মীয় উপাসনালয়ের প্রবেশপথে পরীক্ষা করে লোক ঢুকাতে হবে। হাট-বাজার, বাসস্ট্যান্ডে যত কম সম্ভব লোক সমাগম করতে হবে।

বাচ্চারা যাতে অযথা ঘুরে না বেড়ায়, এ জন্য অলটারনেটিভ ব্যবস্থা করতে হবে। এ জন্য স্থানীয় পর্যায়ে খেলাধুলা, লাইব্রেরির উন্নয়ন করতে হবে। তারা তাহলে বাইরে দল বেঁধে ঘুরে বেড়াবে না।

আর যারা বিদেশ প্রত্যাগত তাদের জেল-জরিমানা আর পুলিশ দিয়ে হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখা যাবে না। তাদের বুঝিয়ে বলতে হবে, আপনারা আপনাদের বাড়ির বাইরে যাবেন না। রুমের বাইরে না বাড়ির বাইরে যেতে বারণ করতে হবে। এখানেই থাকবেন ১৪ দিন।

আর এখনো যারা আসছেন, তাদের বুঝিয়ে ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইনে রাখতে হবে। তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করতে হবে। তাদের ভালো খাবার দিতে হবে। ১৪ দিন রেখে তারপর ছাড়তে হবে।

আমাদের দেশের আইসোলেশন ইউনিট যথাসম্ভব বাড়াতে হবে। নয়তো ইতালির চেয়ে খারাপ অবস্থা আমাদের হবে। আর মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিতে হবে আপনারা কোলাকুলি করবেন না, হাত মেলাবেন না। সম্ভাষণ দেবেন সালাম আর নমস্কার।

এসব অভ্যাসের পরিবর্তন দরকার। আর আমাদের জন্য দোয়া করেন, করোনা পরীক্ষার যেই পদ্ধতি আমরা বাজারে এক মাস পরে আনতে পারবো, সেটা যেনো দুই সপ্তাহের মধ্যেই নিয়ে আসতে পারি।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন্স অ্যান্ড কন্ট্রোল রুমের সহকারী পরিচালক ডা. আয়শা আক্তার আমার সংবাদকে বলেন, ‘আমাদের প্রস্তুতি অব্যাহত রয়েছে। আমরা সম্মিলিতভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছি।

মন্ত্রী মহোদয় ঘোষণা দিয়েছেন ১০০ আইসিইউ বেড প্রস্তুত করা হচ্ছে। আরো ৩০০ প্রস্তুত করার প্রক্রিয়া চলছে। আমরা প্রতিদিন হিসাব করছি, আমাদের কখন কী দরকার। সেই আলোকে সেটা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে কিন্তু আমরা মাদারিপুর লকডাউন করে দিয়েছি।

বিমানবন্দরের ফ্লাইট বন্ধ করে দিয়েছি না। আমাদের মাথায় রয়েছে বিশ্বেও কি অবস্থা আর আমাদের দেশের কী অবস্থা। প্রতিটি মুহূর্তে কিন্তু পরিস্থিতি চেঞ্জ হচ্ছে। তখন কিন্তু আমাদের পরিকল্পনাও আপডেট করতে হচ্ছে। আমরা তখন ভাবছি কিভাবে আরো আপডেট করা যায়।

পারসোনাল প্রটেকশন ইকুইপমেন্ট (পিপিই) কিন্তু চায়না থেকে আসছে। আমাদের কাছে কিছু আছে। আমরা চাচ্ছি সারা দেশে হেলথ সেক্টরে যারা কাজ করছে তাদের সবাইকে পিপিই দেয়ার জন্য।

এটা কিভাবে কত দ্রুত দেয়া যায় সে বিষয় নিয়ে মিটিং করছি। আমাদের তো তত বেশি সক্ষমতা নেই। ডেভলপমেন্ট পার্টনারদের থেকে নিয়ে যতটুকু আছে সবটাই দিয়েই কিন্তু কাজ করে যাচ্ছি। দেখেন উন্নত বিশ্বে এত এত সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কিন্তু এই অবস্থা।

সেখানে আমরা উন্নয়নশীল দেশ হওয়া সত্ত্বেও কিন্তু যথাসাধ্য কাজ করছি। সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ে কিন্তু কাজ করছি। সব বিষয়ে সক্ষমতা না থাকা সত্ত্বেও তারপরও আমরা চাচ্ছি সব সক্ষমতা নিয়ে আরো কত ভালোভাবে কাজ করা যায়।

আমারসংবাদ/এসটিএমএ