বুধবার ০৩ জুন ২০২০

২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

ই-পেপার

শাহ আলম নূর

প্রিন্ট সংস্করণ

মার্চ ১৫,২০২০, ০৪:২৪

মার্চ ১৫,২০২০, ০৪:২৪

ব্যাংকের টাকায় কানাডায় বিলাসী জীবন

বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে-বেনামে ৯৯০ কোটি টাকা ঋণ আর পরিশোধ করছেন না মোর্শেদ দম্পত্তি। বরং তারা এখন দেশ ত্যাগ করে কানাডাতে বিলাসী জীবন যাপন করছেন। দেশে না থাকার কারণে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিপুল টাকার ঋণ এখন আদায় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

বিপুল ঋণ নিয়ে মোর্শেদ মুরাদ ইব্রাহিম ও সাবেক এমপি বেগম মাহজাবিন বর্তমানে সপরিবারে কানাডার অন্টারিও প্রদেশের অসোয়া শহরে বিলাসবহুল জীবন যাপন করছেন।

তারা কানাডাতে অনেকটা নিভৃতেই বসবাস করছেন। তারা সবসময় বাংলাদেশের পরিচিতজনদের এড়িয়ে চলেন। পরিচিতজনদের সামনে তাদের খুব একটা দেখা যায় না।

সূত্র জানায়, প্রায় দুই বছর আগে বেসিক ব্যাংকের ২৯৬ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে জাতীয় পার্টি নেতা-নেত্রী দম্পতি মোর্শেদ মুরাদ ইব্রাহিম ও সাবেক এমপি বেগম মাহজাবিন মোর্শেদের বিরুদ্ধে দুটি মামলা করেছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

মামলা হওয়ার পর আত্মসাৎ করা অর্থ কিস্তিতে পরিশোধের শর্তে তাদের জামিন দিয়েছিল আদালত। কিন্তু শর্তানুযায়ী কিস্তি পরিশোধ না করা ও আদালতে হাজির না হওয়ায় গত বছরের ১৯ এপ্রিল তাদের জামিন বাতিল করে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে চট্টগ্রামের আদালত।

শুধু বেসিক ব্যাংকের টাকা আত্মসাতই নয়, মোর্শেদ মুরাদ নামে-বেনামে তার পারিবারিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে ৯৯০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে পরিশোধ করেননি বলে তথ্য মিলেছে।

এক অনুসন্ধানে দেখা যায়, মোর্শেদ পরিবারের কাছে শুধু রাষ্ট্রমালিকানাধীন বেসিক ব্যাংকেরই খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬৩৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১০২ কোটি টাকা ঋণের জিম্মাদার মোর্শেদ মুরাদ ইব্রাহিম।

পদ্মা ব্যাংকের ৭৬ কোটি টাকা, রূপালী ব্যাংকের ১১৩ কোটি টাকাসহ অন্যান্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে এই পরিবারের খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও ৩৬০ কোটি টাকা।

সব মিলিয়ে এই পরিবারের ৯৯০ কোটি টাকা খেলাপি ঋণের তথ্য মিলেছে। তবে দুদক ও ব্যাংকসংশ্লিষ্টরা বলছেন, তাদের প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও বেশি।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, মোর্শেদ পরিবারের বিভিন্ন ব্যবস্যাপ্রতিষ্ঠানের নামে দেশের বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ৯৯০ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ রয়েছে।

এর মধ্যে বেসিক ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখায় ক্রিস্টাল স্টিল অ্যান্ড শিপ ব্রেকিং লিমিটেডের নামে ১৩৪ কোটি ৯৩ লাখ ৬৬ হাজার টাকা, আইজি নেভিগেশনের নামে ১৪১ কোটি পাঁচ লাখ টাকা, ক্রিস্টাল ফিশারিজের নামে ১৮ কোটি টাকা এবং একই ব্যাংকের ঢাকার দিলকুশা শাখায় বে নেভিগেশনের নামে ১৩৭ কোটি টাকা।

মোর্শেদের ভাই রাশেদের মালিকানাধীন এমআরএফ ট্রেডিংয়ের নামে ৭০ কোটি টাকা ঋণ রয়েছে বেসিক ব্যাংকের চট্টগ্রামের জুবিলী রোড শাখায়, জিম্মাদার হিসেবে শীতল শিপ ব্রেকার্সের নামে ৭৮ কোটি টাকা ও শাহেদ শিপ ব্রেকার্সের নামে ৪৬ কোটি ১৪ লাখ টাকা, ফারমার্স ব্যাংকের চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ শাখায় ভাইয়ের স্ত্রী কানিজ ফাতেমার নামে ৩০ কোটি টাকা, চিটাগাং ফিশারিজের নামে ২৯ কোটি টাকা ও গরিবে নেওয়াজ ফিশিঙের নামে ১৭ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে।

মোর্শেদের নামে আরো যে সব ঋণ রয়েছে এর মধ্যে রূপালী ব্যাংকের ঢাকার মতিঝিল শাখায় ক্রিস্টাল গ্রুপের নামে ১১৩ কোটি টাকা, দ্য প্রিমিয়ার ব্যাংকের বনানী শাখায় ৭৫ কোটি টাকা, আল আরাফাহ ব্যাংকের চট্টগ্রাম নিজাম রোড শাখায় ১৩ কোটি টাকা, ট্রাস্ট ব্যাংকের ঢাকার দিলকুশা শাখায় ৫০ কোটি টাকা, প্রাইম ব্যাংকে মোর্শেদ মুরাদের ফারুক অ্যান্ড সন্সের নামে ২২ কোটি টাকা, সিটি ব্যাংকের গুলশান শাখায় তিন কোটি টাকা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিডি ফিন্যান্স থেকে নেয়া ১৫ কোটি টাকা এবং মোর্শেদ মুরাদ পরিবারের মালিকানায় থাকা প্রোটেকটিভ ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানির নামে তিন কোটি টাকার ঋণ রয়েছে।

বেসিক ব্যাংকের অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় ২০১৮ সালের ১০ জানুয়ারি চট্টগ্রামের ডবলমুরিং থানায় মোর্শেদ-মাহজাবিন দম্পতির বিরুদ্ধে দুটি মামলা করেন দুদকের সহকারী পরিচালক সিরাজুল হক। এর মধ্যে একটি মামলায় মোর্শেদ মুরাদের মালিকানাধীন ক্রিস্টাল স্টিল অ্যান্ড শিপ ব্রেকিং লিমিটেডের বিরুদ্ধে ১৩৪ কোটি ৯৩ লাখ ৬৬ হাজার ১৮৫ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়।

অপর মামলায় বেসিক ব্যাংকের চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ শাখা থেকে ঋণ নিয়ে পরিশোধ না করে ১৪১ কোটি পাঁচ লাখ ৪৫ হাজার ১০৫ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয় মাহজাবিন মোর্শেদের বিরুদ্ধে। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে মোর্শেদ মুরাদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ক্রিস্টাল স্টিল অ্যান্ড শিপ ব্রেকার্সে কর্মকর্ত ও কর্মচারীরা বলেন, অনেক দিন যাবত সেখানে যান না মোর্শেদ মুরাদ।

তিনি কোথায় আছেন, সে ব্যাপারেও কোনো ধারণা নেই তাদের। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে সেখানকার এক কর্মকর্তা বলেন, মোর্শেদ-মাহজাবিন দম্পতি বর্তমানে সপরিবারে কানাডায় থাকেন।

মোর্শেদ মুরাদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ক্রিস্টাল স্টিল অ্যান্ড শিপ ব্রেকার্স লিমিটেড, ক্রিস্টাল ল্যান্ড মার্ক লিমিটেড, ক্রিস্টাল ফিশারিজ লিমিটেড, ইব্রাহিম ফার্মস লিমিটেড, ম্যাক্স ট্রেড লিমিটেড, এমআরএফ ফিশারিজ লিমিটেড, ফারুক অ্যান্ড সন্স লিমিটেড, হামিদা দোজা লিমিটেড, আইজি নেভিগেশন, বে নেভিগেশনসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।

ব্যবসায়িক মন্দা ও ঋণখেলাপির কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগই দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। রূপালী ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, খেলাপি হয়ে যাওয়া ঋণ আদায়ের জন্য একাধিকবার মোর্শেদ মুরাদের সঙ্গে বৈঠক হয়।

কিন্তু ঋণটি পুনঃতফসিল করা সম্ভব না হওয়ায় নিলাম বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়। এ পরিস্থিতিতে জামানতের সম্পদ বিক্রি করে টাকা আদায় সম্ভব না হলে মামলা করা হবে বলে জানান রূপালী ব্যাংকের ওই কর্মকর্তা।

আমারসংবাদ/এসটিএমএ