বৃহস্পতিবার ০৪ জুন ২০২০

২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

ই-পেপার

শরিফ রুবেল

প্রিন্ট সংস্করণ

মার্চ ১৩,২০২০, ০১:১২

মার্চ ১৩,২০২০, ০১:১২

করোনার মাঝেই ডেঙ্গু সতর্ক করলেন হাইকোর্ট

  • দুই সিটি কর্পোরেশনের গাফিলতিতেই ডেঙ্গুর প্রকোপ বলছে প্রতিবেদন
  • মশক নিবারণী দপ্তরের মশা নিয়ন্ত্রণে কারিগরি ধারণা নেই
  • এক দশকেও পরীক্ষা করা হয়নি ওষুধের কার্যকারিতা

করোনা ভাইরাস। প্রাণঘাতি কোভিড-১৯ ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের অন্তত ১১০ দেশে। সেই তালিকায় আছে বাংলাদেশও। দেশে ইতোমধ্যে ৩ জন করোনায় আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে।

আক্রান্ত তিনজনই আপাতত সংকামুক্ত বলে জানিয়েছে আইআইডিসিআর। মহামারি এ ভাইরাসের সংক্রমণের মাঝেই আবার ডেঙ্গু নিয়ে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনকে আগাম সতর্ক করলেন হাইকোর্ট।

গত বছর ডেঙ্গুতে আক্রন্ত হয়ে এক লাখ এক হাজার ৩৫৪ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়। এরমধ্যে ১৭৯ জনের মৃত্যু হয়। তাই অতীত থেকে অভিজ্ঞতা নিয়ে ডেঙ্গুতে প্রাণহানি এড়াতে এবার আগে থেকেই প্রস্তুত থাকতে পরামর্শ দিয়েছেন আদালত।

এদিকে গত কয়েকদিনে মশার উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় ডেঙ্গু নিয়ে শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। সেটা মাথায় রেখেই আদালত বললেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতি যেকোনো সময় জেঁকে বসতে পারে সারা দেশে।

করোনার মাঝে ডেঙ্গু আক্রমণ করলে সেটা ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে বলেও মত দেন আদালত। ঢাকার বায়ু দূষণসংক্রান্ত এক জনস্বার্থমূলক রিটের শুনানিতে গত বুধবার বিচারপতি এফআরএম নাজমুল আহাসান ও বিচারপতি কেএম কামরুল কাদেরের হাইকোর্ট বেঞ্চ এই সতর্কতা জারি করেন।

এদিকে গত সোমবার ডেঙ্গু নিয়ে বিচার বিভাগীয় অনুসন্ধান কমিটির প্রতিবেদন হাইকোর্টে জামা দেয়া হয়। ওই প্রতিবেদনে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের গাফিলতিতেই ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েছে বলে উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়— মশক নিবারণী দপ্তরের মশা নিয়ন্ত্রণে কারিগরি ধারণা নাই। এক দশকেও পরীক্ষা করা হয়নি ডেঙ্গুর ওষুধের কার্যকারিতা।

কমিটি বলছে, মশা নিয়ন্ত্রণের কাজ সিটি কর্পোরেশনের হলেও এই সংস্থার একার পক্ষে এটা নিয়ন্ত্রণ করা বাস্তবিক পক্ষেই সম্ভব নয়। সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই মশক নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

এছাড়া দুবছর পরপর মশার ওষুধ (কীটনাশক) ও কেমিক্যালের কার্যকারিতা পরীক্ষা করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়াসহ ১০ দফা সুপারিশ করা হয়েছে ঐ প্রতিবেদনে।

২০১৯ সালে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া রোধে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের ব্যর্থতার কারণ ও দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিতকরণে বিচার বিভাগীয় অনুসন্ধানের নির্দেশ দেয় বিচারপতি তারিক-উল হাকিম ও বিচারপতি মো. ইকবাল কবিরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ।

ঐ নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ মো. হেলাল চৌধুরীকে সভাপতি এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হাবিবুর রহমানকে সদস্য করে গঠিত হয় অনুসন্ধান কমিটি।

গত বুধবার আদালত ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের আইনজীবীদের উদ্দেশে বলেন, ইতোমধ্যে দেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের ঘটনা ঘটেছে। এই ঘনবসতিপূর্ণ ঢাকা শহরে যদি কোনোভাবে করোনার সাথে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব আবার শুরু হয়, তাহলে কিন্তু মানুষের যাওয়ার জায়গা থাকবে না। সুতরাং আপনারা সতর্ক হোন, মশানিধনে এবং ডেঙ্গু প্রতিরোধে যা যা করা দরকার দ্রুত তাই করুন।

এসময় আদালতে রিট আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এবিএম আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বাশার।

আর ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী সাঈদ আহমেদ রাজা ও উত্তর সিটি কর্পোরেশনের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী তৌফিক ইনাম টিপু।কমিটি সিটি কর্পোরেশন সরেজমিন পরিদর্শন এবং ২৭ জন বিশেষজ্ঞের মতামত গ্রহণ করে হাইকোর্টে এ প্রতিবেদন দেন।

‘এডিস মশা কীটনাশক প্রতিরোধী’
আইসিডিডিআরবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে উড়ন্ত মশা দমনে তথা অ্যাডাল্টিসাইডিংয়ের জন্য একই ধরনের কীটনাশক তথা টেট্রামেথ্রিন, পারমেথ্রিন ও প্রালারথ্রিনের ট্রাই কম্বিনেশন ব্যবহারের ফলে ঢাকার এডিস মশা কীটনাশক প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে।

ফলে পূর্ণবয়স্ক মশানিধনে ওষুধ পরিবর্তনের পরামর্শ দেয় আইসিডিডিআরবি ও সিডিসি; কিন্তু ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন এ বিষয়টি অনুধাবন ও বাস্তবায়ন করতে অনেক সময় নেয়।

এছাড়া গত ১০-১২ বছরে মশকনিধনে ব্যবহূত কীটনাশকের কার্যকারিতাও পরীক্ষা করা হয়নি। ফলে এডিস মশার লার্ভা ধ্বংসে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের শিথিলতা এবং এক দশকেরও অধিক সময় ধরে প্রয়োগকৃত ওষুধের কার্যকারিতা পরীক্ষা না করায় দুই সিটি কর্পোরেশনের আংশিক গাফিলতি প্রতীয়মান হয়েছে।

নিজস্ব জরিপব্যবস্থা নেই
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোনো সিটি কর্পোরেশনকে এককভাবে দায়ী করার অবকাশ নাই। কারণ বিদ্যমান ব্যবস্থায় মশা নিয়ন্ত্রণে সিটি কর্পোরেশনের নিজস্ব কোনো জরিপব্যবস্থা নেই। নেই কোনো কীটতত্ত্ববিদ, বিশেষজ্ঞ দল বা নিজস্ব ল্যাবরেটরির মাধ্যমে সিটি কর্পোরেশন সহজেই মশক নিবারণ বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ ও তাৎক্ষণিক মশার জীবনচক্র সম্পর্কে ধারণা নিতে পারে। এসবের জন্য সিটি কর্পোরেশনকে পুরোপুরি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ওপর নির্ভর করতে হবে।

সমন্বিত উদ্যোগ দরকার
ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়াসহ অন্যান্য মশাবাহিত ও সংক্রামক ব্যাধি নিবারণের জন্য সিটি কর্পোরেশনের সঙ্গে রাজউক, রিহ্যাব, ঢাকা ওয়াসা, পুলিশ, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট কর্তৃপক্ষ, সিভিল অ্যাভিয়েশন কর্তৃপক্ষ, বিআরটিএ, বিআরটিসি, বাংলাদেশ রেলওয়ে, পানি উন্নয়ন বোর্ড, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ, পরিবেশ অধিদপ্তর, আবহাওয়া অধিদপ্তরসহ নগরবাসীর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করে অনুসন্ধান কমিটি।

আমারসংবাদ/এসটিএমএ