রবিবার ২৯ মার্চ ২০২০

১৫ চৈত্র ১৪২৬

ই-পেপার

শাহ আলম নূর

প্রিন্ট সংস্করণ

ফেব্রুয়ারি ২৫,২০২০, ০২:৫২

ফেব্রুয়ারি ২৫,২০২০, ০২:৫২

চিনি ও খাদ্যশিল্প কর্পোরেশন

গ্যারান্টি ছাড়াই ঋণ!


কোনো রকম গ্যারান্টি ছাড়াই চিনি ও খাদ্যশিল্প কর্পোরেশনকে দেয়া হয়েছে বিপুল পরিমাণে ঋণ। এতে রাষ্ট্রায়ত্ত চারটি ব্যাংকের আটকা পড়েছে বিপুল অঙ্কের টাকা।

এখন স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এসব ব্যাংকের। চিনি ও খাদ্যশিল্প কর্পোরেশনের চারটি ব্যাংকের পাওনা ৬৯৮১ কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু সোনালী ব্যাংকেরই পাওনা ছিলো চার হাজার ২৪৫ কোটি টাকা।

চিনি ও খাদ্যশিল্প কর্পোরেশনকে দেয়া ঋণের বেশির ভাগ ব্যাংকে নেই সরকারি কোনো গ্যারান্টি। এ ক্ষেত্রে ঋণ ফেরত পাওয়া নিয়ে শঙ্কার মধ্যে রয়েছে ব্যাংকগুলো। ঋণ বিতরণ করা ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি শঙ্কিত সোনালী ব্যাংক।

কারণ ব্যাংক কোম্পানি আইন ভঙ্গ করে তারা চিনি ও খাদ্যশিল্প কর্পোরেশনকে বড় অঙ্কের ঋণ বিতরণ করেছে। চিনি ও খাদ্যশিল্প কর্পোরেশনকে ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো অনুমোদনও নেয়নি ব্যাংকগুলো।

এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন ও সরকারি গ্যারান্টি ছাড়া প্রতিষ্ঠানটিকে বিপুল অঙ্কের ঋণ দেয়ায় সোনালী ব্যাংকসহ অধিকাংশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বিভিন্ন সময় তলব করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংকের সমঝোতা স্মারক নিয়ে সম্প্রতি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় চিনি ও খাদ্যশিল্প কর্পোরেশনে বিপুল অঙ্কের ঋণ কেন্দ্রীভূত হওয়ার বিষয়টি আলোচনা হয়।

সূত্র জানায়, সভায় জানানো হয় চিনি ও খাদ্যশিল্প কর্পোরেশনের কাছে সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংকের পাওনা রয়েছে ৬৯৮১ কোটি টাকা।

এর মধ্যে ২০১৯ সালে নতুন অনুমোদিত ৫১৩ কোটি টাকাসহ চিনি ও খাদ্যশিল্প কর্পোরেশনের কাছে সোনালী ব্যাংকেরই পাওনা ৪২৪৫ কোটি ৫৪ লাখ টাকা।

এদিকে ঋণের বিপরীতে জনতা ও অগ্রণী ব্যাংকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের গ্যারান্টির মেয়াদ এরই মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে। অন্যদিকে সোনালী ও রূপালী ব্যাংকের ঋণের বিপরীতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের গ্যারান্টি গ্রহণের শর্ত থাকলেও মন্ত্রণালয় কর্তৃক কোনো গ্যারান্টি প্রদান করা হয়নি।

এই বিপুল পরিমাণ ঋণের বিপরীতে অর্থ মন্ত্রণালয় কর্তৃক গ্যারান্টি প্রদান করা না হলে সোনালী ব্যাংকে আর্থিক বিপর্যয় সৃষ্টি হবে। ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, কোনো একক গ্রহীতার অনুকূলে একটি ব্যাংক তার মূলধনের ২৫ শতাংশের বেশি ঋণ দিতে পারবে না।

কিন্তু চিনি ও খাদ্যশিল্প কর্পোরেশনে সোনালী ব্যাংকের মূলধনের ৯০ শতাংশের বেশি ঋণ কেন্দ্রীভূত হয়। যা পরবর্তীতে ১০৬ শতাংশ ছাড়িয়েছে। একক ঋণগ্রহীতার অনুকূলে এত পরিমাণ ঋণ দিয়ে ঝুঁকিতে আছে ব্যাংকটি।

সোনালী ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, চিনিশিল্প কর্পোরেশনকে ঋণ হিসেবে এই অর্থ দেয়া হয়েছে। এটা বড় অ্যামাউন্ট এটা ঠিক, তবে যেহেতু আমরা সরকারি একটি প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিয়েছি, তাই এই টাকা আমরা ফিরে পাবো বলে আশা করছি।

সরকারের গ্যারান্টি না দেয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কিছু ঋণের সরকারি গ্যারান্টি ছিলো, সেটার মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে। অন্যগুলোতে কর্পোরেশনের গ্যারান্টি আছে। তবে যেগুলোর সরকারি গ্যারান্টির মেয়াদ শেষ হয়েছে, সেগুলো রিনিউ করার আবেদন করা হয়েছে। আশা করছি, সরকারের গ্যারান্টিও পাবো।

এদিকে চিনি ও খাদ্যশিল্প কর্পোরেশনের কাছে ১১০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের। এরপরও সমপ্রতি আরও ৩০০ কোটি টাকার ঋণ মঞ্জুর করা হয়েছে। জনতা ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, নতুনভাবে ৩০০ কোটি টাকার ঋণ মঞ্জুর করা হয়েছে।

তবে এজন্য এখানে শর্ত দেয়া হয়েছে। সরকারের গ্যারান্টি পেলেই এই অর্থ ছাড় করা হবে। এছাড়া কর্পোরেশনের আগের ঋণগুলো নবায়ন করা হয়েছে বলেও তারা জানান।

চিনি ও খাদ্যশিল্প কর্পোরেশনের কাছে সুদসহ ৬২৫ কোটি টাকার বেশি পাওনা রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকের। কিছুদিন আগে ওই টাকা ব্যাংকটি ফেরত চাইতে গেলে সংকটের কথা বলে উল্টো আরও ৫০০ কোটি টাকার ঋণ চেয়ে বসে প্রতিষ্ঠানটি।

অগ্রণী ব্যাংক সূত্র জানায়, বিভিন্ন সমস্যার কারণে টাকা ফেরত দিতে পারছে না চিনিশিল্প কর্পোরেশন। আবার এসব ঋণের সরকারি গ্যারান্টিও আনতে পারছে না কর্পোরেশন। গ্যারান্টি না পেলে ব্যাংকগুলো ঋণখেলাপি করে ফেলবে। তখন নতুন কোনো ঋণ পাবে না প্রতিষ্ঠানটি।

অন্যদিকে চিনি ও খাদ্যশিল্প কর্পোরেশনের কাছে রূপালী ব্যাংকের পাওনা রয়েছে ৫৮০ কোটি টাকা। বর্তমানে চরম আর্থিক সংকটে রয়েছে চিনি ও খাদ্যশিল্প কর্পোরেশন। নিজেদের সংকটের কথা তুলে ধরে কয়েক দফা শিল্প মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠিও পাঠিয়েছে চিনি ও খাদ্যশিল্প কর্পোরেশন।

এতে উল্লেখ করা হয়েছে, কর্পোরেশনে দীর্ঘদিন চরম আর্থিক সংকট বিরাজ করায় চিনিশিল্প প্রায় ধ্বংসের মুখে।

চিনি ও খাদ্যশিল্প কর্পোরেশনকে চেয়ারম্যান সনৎ কুমার সাহা বলেন, আমাদের প্রতি কেজি চিনির উৎপাদন খরচ ৬০ টাকা। বিপরীতে বাজারে চিনি বিক্রি করি ৫০ টাকায়। ফলে প্রতি কেজি চিনিতে আমাদের লোকসান তথা ট্রেডগ্যাপ ১০ টাকা। চিনির উৎপাদন মূল্য ও বিক্রয় মূল্যের পার্থক্য ভর্তুকি হিসাবে সরকারের দেয়ার কথা।

তিনি বলেন, ২০১২ সাল পর্যন্ত ট্রেডগ্যাপ হিসেবে সরকারের কাছে আমাদের পাওনা ছিলো ১৭০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিভিন্ন সময়ে ৪৩০ কোটি টাকা পাওয়া গেছে। বাকি রয়েছে আরও ১২৭০ কোটি টাকা।

আর ২০১২ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত আরও ১২০০ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। সব মিলে ট্রেডগ্যাপ পাওনা আড়াই হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এই অর্থ পেতে অনেক চেষ্টা করেছি কিন্তু কোনোভাবেই এই অর্থ পাচ্ছি না।

 আমারসংবাদ/এসটিএমএ