মঙ্গলবার ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০

১২ ফাল্গুন ১৪২৬

ই-পেপার

আসাদুজ্জামান আজম

প্রিন্ট সংস্করণ

ফেব্রুয়ারি ১৪,২০২০, ০৯:১৭

ফেব্রুয়ারি ১৫,২০২০, ০৩:১৭

বিশেষ প্রতিষ্ঠানের দৌরাত্ম্য

দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের অন্যতম রুট চট্টগ্রাম বন্দর। বন্দরটির বহির্নোঙরে কন্টেইনারবাহী জাহাজের জটে ব্যবসায়ীদের ভাগ্য আটকে থাকার অভিযোগ অহরহ। মূলত অব্যবস্থাপনা আর অপারেটর প্রতিষ্ঠানের দৌরাত্ম্যে হয়রানি শিকার হন ব্যবসায়ীরা।

দীর্ঘ সময় ধরে চলা এ অভিযোগ নিষ্পত্তি হচ্ছে না। বরং নতুন করে হয়রানি আরো বাড়ার শঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। এর নেপথ্যে বিশেষ প্রতিষ্ঠানটি আবারো বন্দর অপারেটর হিসেবে নিয়োগের তোড়জোড় শুরু করেছে।

বন্দর ব্যবসায়ীদের করা অভিযোগ সূত্রে এমনটাই জানা গেছে। সূত্র মতে, চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে কন্টেইনারবাহী জাহাজের জট নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নেই। বন্দরে জেনারেল কন্টেইনার বার্থে (জিসিবি) ছয়টি বার্থ রয়েছে এবং ছয়টি অপারেটর বার্থ প্রতিযোগিতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

কিন্তু কন্টেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) ও নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) এই দুটি টার্মিনালে বার্থের সংখ্যা সাতটি। সাতটি বার্থে একজন বার্থ অপারেটর পরিচালনা করে আসছেন। দুটি টার্মিনালের সাতটি বার্থে মাত্র একজন অপারেটর থাকায় কন্টেইনার লোডিং-আনলোডিংয়ে দীর্ঘসূত্রতার সৃষ্টি হয়। দিনের পর দিন ব্যবসায়ীরা পণ্য পেতে হয়রানির সম্মুখীন হন।

এছাড়া কোনো প্রতিযোগিতা না থাকায় অপারেটর প্রতিষ্ঠান দায়সারাভাবে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। প্রতিষ্ঠানটিকে ম্যানেজ করতে নানা ধরনের সিস্টেমের মধ্য দিয়ে যেতে হয় ব্যবসায়ীদের। এসব কারণে টার্মিনালে জাহাজের গড় অবস্থান জিসিবির তুলনায় অনেক বেশি।

দুটি টার্মিনাল তৈরির সময় দু’জন পৃথক অপারেটর নিয়োগ দেয়ার প্রয়োজন থাকলেও তা করা হয়নি। ফলে একজন অপারেটরের মাধ্যমে দুটি টার্মিনাল পরিচালনা করায় বন্দর ব্যবহারকারীরা কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন না। মূলত মাত্র এক অপারেটর দিয়ে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করায় এ অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

এদিকে, অপারেটর সংখ্যা না বাড়িয়ে একই প্রতিষ্ঠানকে নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনালে অপারেটর হিসেবে নিয়োগ দিতে তোড়জোড় শুরু করেছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। অভিযোগে জানা যায়, ২০০৭ সালে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেডকে কোনো টেন্ডার ছাড়াই চট্টগ্রাম কন্টেইনার টার্মিনালের (সিসিটি) কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের কাজ দেয়।

এরপর থেকে এখন পর্যন্ত সেই প্রতিষ্ঠান এককভাবে কাজ করতে থাকে। সম্প্রতি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ সিসিটির কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের জন্য দরপত্র আহ্বান করে। ওই দরপত্রে এমন শর্ত আরোপ করা হয়, এতে ওই প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য কেউ দরপত্রে অংশগ্রহণ করতে পারেনি।

ফলে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় গত ২৮ আগস্ট চট্টগ্রাম বন্দরের চিটাগাং কন্টেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) পরিচালনায় ছয় বছরের জন্য নিয়োগ পায় সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেড।

সভা শেষে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সাংবাদিকদের বলেন, সিসিটিতে অপারেটর নিয়োগের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হলে চারটি প্রতিষ্ঠান দরপত্র কিনলেও একটি প্রতিষ্ঠানই কেবল তা দাখিল করে। টিইসি কর্তৃক মূল্যায়িত ও সুপারিশকৃত সাপলিমেন্টারি রেসপন্সিভ হিসেবে সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেডকে ছয় বছরের জন্য টার্মিনাল অপারেট নিয়োগের কাজ সর্বসম্মতিক্রমে দেয়া হয়।

এরপর একইভাবে নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) অপরাটের নিয়োগ দিতে প্রক্রিয়া শুরু করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। এখানেও একইভাবে একটি কোম্পানিকে কাজ দিতে দরপত্রে সবরকম শর্ত জুড়ে দেয়া হয়। যাতে পছন্দের ওই কোম্পানির বাইরে কোনো কোম্পানি অংশগ্রহণ করতে না পারে।

পরবর্তীতে দরপত্র বাতিল করে অপারেটর নিয়োগের শর্ত শিথিলের দাবি জানিয়ে গত ৫ ফেব্রুয়ারি নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী ও মন্ত্রিপরিষদ সচিব বরাবর আবেদন করেছে এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস লিমিটেড। আবেদনে নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনালে (এনসিটি) অপারেটর নিয়োগের দরপত্র বাতিল করে নতুন দরপত্র আহ্বানের অনুরোধ জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

চিঠিতে বলা হয়, চট্টগ্রাম বন্দরে কার্গো এবং কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করার জন্য আইন ও বিধি অনুসারে স্টিভিডোরিং লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠান নিয়োজিত ছিলো। ২০০৭ সালে চট্টগ্রাম বন্দরে সংস্কার কর্মসূচির আওতায় লাইসেন্সধারী স্টিভিডোরিং প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যোগ্য, দক্ষ ও সুনামধারী প্রতিষ্ঠান বাছাই করে জেটিতে বার্থ অপারেটর এবং বহির্নোঙ্গরে শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর পদ্ধতি চালু করে।

যার পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৭ সালের ২৮ নভেম্বর বার্থ অপারেটর সংক্রান্ত গ্যাজেট প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে ওই গ্যাজেট পরিবর্তন করে গত ২০১৮ সালের ১০ মে টার্মিনাল অপারেটরের সংজ্ঞা সংযোজন করে নতুন গ্যাজেট প্রকাশিত হয়।

চিঠিতে দাবি করা হয়, বিশ্বব্যাপী টার্মিনাল অপারেটরের সংজ্ঞার সাথে চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনাল অপারেটরের সংজ্ঞার কোনো মিল নেই। সারা পৃথিবীতে টার্মিনাল অপারেটর টার্মিনাল তৈরি করা, যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা ও ট্যারিফ নির্ধারণ করাসহ যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনা করে। বাংলাদেশে টার্মিনাল নির্মাণ, যন্ত্রপাতি সরবরাহ ও ট্যারিফ নির্ধারণের ক্ষমতা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের।

এখানে টার্মিনাল অপারেটর শুধু জনবল সরবরাহ করে জাহাজে কন্টেইনার লোডিং-আনলোডিংসহ কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনা করে।

বার্থ অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফজলে একরাম চৌধুরী বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ গত ২০১৯ সালের ২১ মার্চ কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের জন্য নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনালে (এনসিটি) টেন্ডার আহ্বান করে।

টেন্ডারের শর্তে কন্টেইনার টার্মিনাল ও টার্মিনাল অপারেটরের পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়েছে। এখানে টার্মিনাল শব্দটি ব্যবহার করে প্রতিযোগিতাকে সঙ্কুচিত করা হয়েছে। যাতে একটিমাত্র প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশগ্রহণ করার সুযোগ পায়। অথচ টার্মিনাল অপারেটর ও বার্থ অপারেটরের কাজের ধরণ একই রকম।

আমারসংবাদ/এসটিএমএ