মঙ্গলবার ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০

১৪ আশ্বিন ১৪২৭

ই-পেপার

অ্যাডভোকেট রোকনুজ্জামান খান

প্রিন্ট সংস্করণ

সেপ্টেম্বর ১৭,২০২০, ১২:৩৬

সেপ্টেম্বর ১৭,২০২০, ১২:৩৮

তুমি ছিলে আমার হূদয়ে বহমান অন্তঃসলীলা

পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কতই না ঘটনার সম্মুখীন হতে হয়। একটি খুন কেসের পোস্টমর্টেম রিপোর্টের বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আইনগত বিষয়ে কথা বলছিলেন অ্যাডভোকেট ফিরোজ আহমেদ শিকদার। প্রশ্ন জাগে নিহত ব্যক্তিটি কেমন ছিলো।

সে কি মেধাবী ছিলো নাকি স্থুল বুদ্ধির লোক। সে কি খুব রগচটা ছিলো? কিংবা খুন হওয়া ব্যক্তি কি ভয়ঙ্কর কোনো সন্ত্রাসী ছিলো নাকি বড় মাপের কোনো জননেতা। খুনি কি কারণে তাকে খুন করলো। তাকে কি ছুরিকাঘাত করা হয়েছিল নাকি শ্বাসরোধে হত্যা?

শরীরের আঘাত কি anti-mortem ছিলো নাকি post- mortem ছিলো। ডাক্তাররা কিডিসিজডের মৃত্যু homicidal in nature নাকি suicidal in nature  হিসেবে সব ব্যবচ্ছেদ করে অপিনিয়ন দিয়েছেন।

যদি শ্বাসরোধ হয় তাহলে বোর্ডের মতামত হবে” the death was due to Aspextia as a result of throttling which was anti- mortem and homicidal in nature. তাহলে এটা তো একটা ফ্রেস হত্যামামলা— কি বলেন খান ভাই। আমার উত্তর ছিলো— জি ভাই এটা একটা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, এভাবেই উত্তর দিলাম আমি।

এমনি ভাতবেই একটা হত্যামামলার বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করছিলেন মফস্বল শহরের একজন আইনজীবী। আমার কাছ থেকে জানতে চাচ্ছিলেন একই হত্যামামলার পিএম রিপোর্ট। তিনি আমার বাল্যবন্ধু ও সহকর্মী অ্যাডভোকেট ফিরোজ আহমেদ শিকদার। কিন্তু কেউ কি জানে যে, আর মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তার মৃত্যুর পোস্টমর্টেম নিয়ে হবে ভিন্ন ভিন্ন এনালাইসিস।

তিনি আমার বাল্যবন্ধু, আমার সুহূদ, আমার রাজনৈতিক যোদ্ধা আমার শরীরে বহমান এক অন্তঃসলীলা। তিনি মাগুরা জজকোর্টের সদ্য প্রয়াত আইনজীবী অ্যাডভোকেট ফিরোজ আহমেদ শিকদার। ঘটনা গত ৯ সেপ্টেম্বর ২০২০। প্রতিদিনের মতো মাগুরা কোর্ট-কাচারিতে লোকারণ্য।

বিজ্ঞ বিচারকরা চুলচেরা বিশ্লেষণ করে প্রতিটি মামলার অর্ডার দিচ্ছেন। দুপুর ২টার দিকে এজলাসে উঠলেন মহম্মদপুরের আমলি আদালতের বিচারক প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট হাসিবুল হোসেন লাবু। আদালত কক্ষে ১০-১২ জন আইনজীবী। একটার পর একটা মামলা উঠছে।

প্রয়াত বন্ধু ফিরোজ শিকদারের সাথে আমার যে মামলাটি শুনানি ছিলো তা একটি যৌতুক আইনের জামিনের মামলা। আসামি পক্ষে ছিলাম আমি আর বাদি পক্ষে ছিলেন ফিরোজ ভাই।

আমরা দাবি করেছিলাম যে, আসামি একজন নাবালক। মেয়ের বাবা ওই আসামিকে চাকরি দেয়ার কথা বলে সাত লাখ টাকা নিয়ে পরে কূটকৌশলের আশ্রয় নিয়ে ঘটনার দিন আসামিকে এই বলে সংবাদ দেন যে, বড় অফিসার তোমাকে দেখতে চেয়েছে তুমি একলা আমাদের বাড়িতে চলে আসো।

সরল বিশ্বাসে ছেলেটি বাদিপক্ষের বাড়িতে আসার পরপরই জোরপূর্বক প্রতারক লোকটি তার মেয়ের সাথে ছেলেটির বিয়ে দিয়ে দেন এবং চাকরি দেয়ার ওই সাত লাখ টাকা আত্মসাৎ করার জন্যই এই ছেলেটির নামে এই মিথ্যা যৌতুক মামলা।

নাবালক হিসেবে আমরা আসামির জন্মসনদ ও স্কুল সার্টিফিকেট দিয়ে প্রমাণ করতে চেয়েছিলাম আসামির বয়স ১৭ বছর। অপরদিকে বাদি পক্ষের প্রয়াত বন্ধু অ্যাডভোকেট ফিরোজ শিকদার চিরকালের মতো স্বভাবসুলভ ভঙ্গীমায় হাসিপরিহাস্যে প্রাণবন্ত করে সাবমিশন দিচ্ছিলেন বাদির পক্ষে। আমরা বলি এ বিয়ে আসামির সম্মতিতে হয়নি।

ফিরোজ বলেন, এই আসামি বাদিকে বিয়ে করার জন্য নাকি পাগল হয়েছিলেন।  সেনসেটিভ এই মামলার শুনানিতে অংশ নেন বিজ্ঞ আইনজীবী অ্যাডভোকেট সাজিদুর রহমান সংগ্রাম এবং অ্যাডভোকেট তরিকুল ইসলাম তারা মিয়া। তুমুল শুনানি। আদালত অঙ্গন তখন এক হাস্যরসে উজ্জীবিত।

বিজ্ঞ আদালতের অবজারভেশন ছিলো আসামির বয়স, আইন এবং ঘটনা প্রবাহ। একপর্যায়ে বিজ্ঞ আদালত তার আদেশ নামায় লিখলেন যে, যেহেতু আসামির বয়স নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে ফলে এ মামলাটি আসামির বয়স ডিসাইড করবে বিজ্ঞ শিশু আদালত।

আদেশটি ছিলো পারফেক্ট এতে কোনো সন্দেহ নেই। এতে আমরা উভয় পক্ষই সন্তুষ্ট ছিলাম। আমরা উভয়পক্ষ যখন আদালতে নিজ নিজ পক্ষে কাগজপত্র দাখিল করি এবং সেই কাগজ যখন ফেরত নেই তখন পেশকার ভুলক্রমে আমার দাখিল করা একটি অঙ্গীকারনামা ফিরোজের কাগজের সাথে দিয়ে দেন। আমি ফিরোজ ভাইকে বললাম, আমার একটি  অঙ্গীকারনামা আপনার কাগজের মধ্যে চলে গেছে।

ফিরোজ নিজেই খুঁজে বের করে ফেরত দিলেন আমার কাগজ এবং রসিকতা করে বললেন, নেন আপনার ভুয়া কাগজ তারপর আমাকে বললেন, চলেন চেম্বারে যাই। আমি বললাম, আমার আরও মামলা আছে, দেরি হবে।

ফিরোজ ভাই বললেন, আমি গেলাম বন্ধু। কে জানতো এটিই ছিলো তার শেষ কথা। আদালত কক্ষ থেকে পা বাড়ালেন অ্যাডভোকেট ফিরোজ আহমেদ শিকদার। তখন দুপুর ২টা ৪৬ মিনিট। মাত্র ৮-১০ পা।

সময়ের ব্যবধান ২০-৩০ সেকেন্ড। আদালত কক্ষ থেকে বেরোনোর সাথে সাথেই পাকা শানের উপর স্ট্রোক করে চিৎ হয়ে পড়ে যান তিনি। চারদিকে শোরগোল। আইনজীবী, পুলিশ, মোহরার সবাই ছুটে যাই ফিরোজ ভাইয়ের কাছে।

তার শ্বাস-প্রশ্বাস নাই। তার নিথর দেহ নিয়ে ছুটে যাই মাগুরা সদর হাসপাতালে। কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ১৯০৬ সালে মাগুরা বার তৈরি হয়েছে কিন্তু পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কোর্টভবনে অন্য কোনো আইনজীবী এমনভাবে প্রয়াত হননি। যার সাথে এক মিনিট আগেও রূপ রস গন্ধ শব্দ স্পর্শ  মিলিয়ে হাসি পরিহাস্যে প্রাণবন্ত এক মামলার শুনানি করলাম তিনি এখন মহাশূন্যোলোকে।

তার মরদেহ নিয়ে যখন অ্যাম্বুলেন্সে তার বেলতলার বাসার দিকে যাচ্ছিলাম তখন মনে পড়ছিল কত কথা। আমি কোথায় যাচ্ছি, কাকে নিয়ে যাচ্ছি, কি হয়েছে এটা কি ঘুমের ঘোরে। তুমি ছিলে আমার সুহূদ। আমার হূদয়ে বহমান অন্তঃসলীলা। আমার রাজনৈতিক যোদ্ধা, আমার পরামর্শদাতা।

তুমি জীবনেও আমার ছিলে আর মৃত্যুর আগেও শেষ কথা তুমি আমাকেই বলেছিলে। আমি ওইদিন তোমাকে প্রাণভরে দেখেছি বন্ধু। আমি মন ভরে তোমার কথা শুনেছি। মৃত্যুর সময় তুমি আমাকে ছুঁয়ে দিলে আর বলেছিলে ‘বন্ধু গেলাম’। তোমার নিথর দেহ বাসায় নেয়ার আগেই শত শত মানুষ তোমার বাসায় ভিড় করবে। লোবান, আতর গোলাপ সুগন্ধি দিয়ে তোমার শরীরে ছিটিয়ে দেবে। বাসনার সাবান দিয়ে তোমাকে গোসল করাবো।

তোমার চোখে সুরমা দেবো। সাদা ধবধবে কাপুর পরিয়ে তোমাকে বিয়ের সাজনে সাজাবো। পালকি আনা হবে মসজিদ থেকে। কিছু মানুষ শুধু তুমার কথাই বলবে। পাড়া প্রতিবেশীরা একনজর দেখার জন্য উদ্বেলিত হবে। মুখের কাপড় খুলে রাখবো। বিয়ে বাড়ির আনন্দগীত গাইবে শুভাকাঙ্ক্ষীরা। সেই গীতে কোনো বাদ্যযন্ত্র থাকবে না। তারপর অনন্তকালের এক মহাযাত্রা। মাটির গহিনে চিরনিদ্রায় শায়িত হবে তুমি।

তারপর তুমি ফিরে যাবে তোমার রবের কাছে। মহাকালের গর্ভে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমাবে তুমি। তোমার সাথে আর কোনোদিন দেখা হবে না বন্ধু আর কথাও হবে না। তুমি আমাদের ফাঁকি দিলে। তোমার স্মৃতি নিয়ে কেন আমি দুঃসহ যন্ত্রণা বয়ে বেড়াবো। বার ভবনে তোমার ফাঁকা চেয়ারখানা কি আমাকে স্বাভাবিক রাখবে? আমার হূদয়ের রক্তক্ষরণ আর  চোখের জল কি তুমি ঠেকিয়ে দিতে পারবে বন্ধু? কি ছিলো না তোমার?

মেধা, অর্থ, যশ, সুনাম সুখ্যাতি সবই তো সৃষ্টিকর্তা প্রাণভরে তোমাকে দুহাতে বিলিয়ে দিয়েছিলেন। তোমার বাবা চেয়ারম্যান ছিলেন, তোমার ভাই বর্তমান চেয়ারম্যান, তুমি চেয়ারম্যান ছিলে। যেনো সাত পুরুষের রাজত্ব তোমাদের। মাগুরা বারের একজন প্রখ্যাত আইনজীবী তুমি। তোমার ছেলে লেফটেন্যান্ট, তোমার সহধর্মিণী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা, তোমার মেয়ে ডাক্তার, তোমার জামাইও ডাক্তার।

ফুলের এমন বাগিচা সাজিয়ে তোমার এ প্রস্থান কেন বন্ধু? ‘তোমার অব্যক্ত বেদনা কি এভাবে আমি যেদিন যাবো মারা চতুর্পাশে হয়ে খাঁড়া। আমায় তোরা ক্ষমা করে দিস আমার বন্ধুরা। আমায় রাসূল বলে মাটি দিতে নিস।’ লোকশিল্পী আব্দুল আলিমের কণ্ঠে প্রায়ই ভেসে আসতো তোমাদের মতো বিদায়ী বন্ধুদের নিয়ে একটি কালজয়ী গান ‘আমারে  সাজায়া দিও নওশার ই সাজন/হইলে পরে মাগো আমার বিয়ারই লগন।

আতর গোলাপ গুলে সাবান আমাকে করাইও স্নান/ইষ্টিকুটুম আইলে পরে নেয় যেনো মা কান্ধে করে/কাঁচা বাসের পালকি দিও সাদা পরাইও বসন।’ কখন অ্যাম্বুলেন্স এসে দাঁড়িয়ে গেলো ফিরোজ ভাইয়ের বাসার সামনে। হাজার জনতার ভিড়। স্বজনদের আহাজারি। চতুর্দিকে কান্নার  রোল। আমার স্বপ্নভঙ্গ হলো।

এটা স্বপ্ন নয়, এটা স্বপ্ন নয়— আমার অন্তরাত্মা এখন কঠিন এক বাস্তবতার মুখোমুখি। আমি একসময় বুঝতে পারলাম আমি চিরকালের মতো হারিয়েছি আমার পরম বাল্যবন্ধু ও মাগুরা বারের বিশিষ্ট আইনজীবী, বিশিষ্ট রাজনীতিক অ্যাডভোকেট ফিরোজ আহমেদ শিকদারকে। তিনি ইতোমধ্যেই চলে গেছেন না ফেরার দেশে। আর কোনোদিন দেখা হবে না। মহান রাব্বুল আলামিন যেনো তোমাকে বেহেশত নসিব করেন। ওপাড়ে ভালো থেকো বন্ধু, বিদায়।

লেখক : কলামিস্ট, বিশ্লেষক, আইনজীবী, মাগুরা বার

আমারসংবাদ/এআই