বুধবার ০১ এপ্রিল ২০২০

১৮ চৈত্র ১৪২৬

ই-পেপার

মীর আব্দুল আলীম

প্রিন্ট সংস্করণ

মার্চ ১৮,২০২০, ১০:৫৭

মার্চ ১৮,২০২০, ০৩:৩২

‘মুজিববর্ষ’ এবং বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ

২০২০ এর ১৭ মার্চ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ পালিত হলো। তার চেয়ে অর্ধবয়সের বাংলাদেশের জন্ম এ মহান মানুষটির হাত ধরেই। যে মানুষটি একদিন জাতিকে লাল পতাকার ‘বাংলাদেশ’ উপহার দিলেন, তাকে কি করে ভুলে বাঙালি?

জন্মশতবর্ষে বঙ্গবন্ধুকে আজ শ্রদ্ধাভরে স্বরণ করছে গোটা দেশ। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে ২০২১ সালের ২৬ মার্চ পর্যন্ত সময়কে ‘মুজিববর্ষ’ ঘোষণা করা হয়েছে।

শতবছর আগে ১৭ মার্চ প্রিয় এ মানুষটির জন্ম। তিনি গর্জে উঠেন ৭ মার্চ; সেই গর্জনেই অর্জন ১৬ ডিসেম্বর। পৃথিবির বুকে নাম লেখালো স্বাধীন বাংলাদেশ। একজন বঙ্গবন্ধু; একটাই বাংলাদেশ। তার মেধা, প্রজ্ঞা, সততা, সাহস সর্বোবরি দেশ প্রেমেই বাংলাদেশের জন্ম হলো।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে (তৎকালীন রেসকোর্স) ১৯ মিনিটের এক জাদুকরি ভাষণে বাঙালি জাতিকে স্বপ্নে বিভোর করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভরাট কণ্ঠের এই আওয়াজে সারা দেশ মুখর হয়।

এরপরই সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ, ৯ মাসের লড়াই এবং স্বাধীনতা অর্জিত হয়। পরে ভয়াল ১৫ আগস্ট। দিন গড়িয়েছে অনেক। আজ বঙ্গবন্ধু নেই। আছে তার স্মৃতি। ‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব, এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব, ইনশাআল্লাহ।’ বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণ আজও বাংলার প্রতিটি মানুষের হূদয়ে গাঁথা আছে।

তিনি ভালোবেসেছিলেন বাঙালি জাতিকে। বীর হতে চাননি যিনি; ভয় পাননি শহীদ হতে। রক্ত দিয়ে যিনি দেশবাসীর ভালোবাসার ঋণ পরিশোধ করতে প্রস্তুত ছিলেন সর্বদা- তাকে কী করে স্মরণ না করে বাঙালি? বঙ্গবন্ধু ক্ষমতাকে ভালোবাসেননি, হূদয় দিয়ে দেশকে ভালোবেসেছেন, দেশের মানুষকে ভালোবেসেছেন। অর্থ লোভ তাকে ছোঁয়নি কখনো। দেশের ভালোবাসার কাছে তার কাছে অর্থ ছিলো তুচ্ছ। এমন নেতা কি আর জন্মাবে কখনো এদেশে? বঙ্গবন্ধু হয়ে আর আসবেন না কখনো কেউ।

এক বঙ্গবন্ধু, এক বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ। বাংলাকে ভালোবাসার এমন মানুষ আর কখনোই আসবে না এদেশে। তার মতো করে কেউ বাংলাকে আর ভালোবাসবে না; বাঙালিকে তার মতো করে কেউ আর কেউ আগলে রাখবে না। আমরা সত্যি অকৃতজ্ঞ জাতি। যিনি আমাদের দেশমাতৃকাকে উপহার দিলেন, এই তাকেই কত না নির্মমভাবে হত্যা করা হলো। জাতির জনকের বাসভবনে রক্তের বন্যা বইয়ে দেয়া হলো সেদিন। শিশু রাসেলের কান্না আর আকুতিও ওদের হূদয় স্পর্শ করলো না।

শুধু তই নয়, হত্যাকারীরা তার কবর তিন মাস পর্যন্ত পাহারা দিয়েছে। সেখানে কাউকে আসতে দেয়া হয়নি। এমনকি দীর্ঘদিন বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের ছবি এদেশে নিষিদ্ধ ছিলো। বঙ্গবন্ধুর কবর দেখতে না দেয়া, তার হত্যার ছবি প্রকাশের নিষেধাজ্ঞার মূল কারণ ঘৃণ্য হন্তারক ওই সামরিক শাসকরা তাতে ভয় পেতো।

তাদের ভয়টা ছিলো এখানেই যে, তারা নিশ্চিত জানতো জীবিত বঙ্গবন্ধুর চেয়ে মৃত বঙ্গবন্ধু অনেক বেশি শক্তিশালী। তারা আরো জানতো সে সময় এসব ছবি প্রকাশ পেলে কোনো কিছুতেই বাঙালিকে দাবিয়ে রাখা যাবে না। সেই ১৫ আগস্ট। সিঁড়িতে পড়ে আছে বাঙালি জাতির প্রাণপ্রিয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের রক্তমাখা নিথর দেহ।

সিঁড়ি গড়িয়ে রক্ত চলে এসেছে বাহির আঙ্গিনায়। মহান সেই নেতার রক্ত সোঁদা মাটিতে মিশে গেছে। তিনি তো শুধু এ দেশের প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতি ছিলেন না, ছিলেন না দল বিশেষের প্রধান। দীর্ঘ দিবস, দীর্ঘ রজনী ঝড়-মেঘ ইতিহাসের পথে আমাদের যাত্রায় তিনি ছিলেন সঙ্গী ও পথপ্রদর্শক। তাকে ভুলব কেমন করে? তাকে কি ভোলা যায় কখনো? তাই তো ইতিহাসের এই মহানায়কের উদ্দেশে কবি লিখেছিলেন, “যতদিন রবে পদ্মা, যমুনা, গৌরী, মেঘনা বহমান/ ততদিন রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান”। অবিসংবাদিত এই নেতার জীবন চলার পথ ছিলো কণ্টকাকীর্ণ।

পাকিস্তানের সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তুলে ’৬০-এর দশক থেকেই তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের অগ্রনায়কে পরিণত হন। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ লাখো মানুষের উপস্থিতিতে ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু বজ্রদৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম’। তারই বজ্র নির্ঘোষ ঘোষণায় উদ্দীপ্ত, উজ্জীবিত জাতি স্বাধীনতার মূলমন্ত্র ধারণ করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল।

অদম্য সাহস ও আত্মত্যাগ, সাংগঠনিক শক্তি নিজের বাঙালিসত্ত্বার গভীর অনুরণন উপলব্ধি করেছিলেন তিনি। কখনো স্বভাবের প্রেরণায়, কখনো সযত্ন উৎসাহে তার উন্মোচন ঘটিয়েছিলেন। দেশবাসীকেও তেমনি অনুপ্রাণিত করেছিলেন সেই সত্ত্বার জাগরণ ঘটাতে। দেশ ও মানুষের প্রতি ভালোবাসা থেকে এক মোহনীয় স্বপ্ন রচনা করেছিলেন তিনি ধীরে ধীরে, সেই স্বপ্ন সফল করার আহবান জানিয়েছিলেন সকলের প্রতি। কী বিপুল সাড়া তিনি পেয়েছিলেন, তার পরিচয় তো আমরা স্বচক্ষে দেখেছি।

১৯৭১ সালে যেভাবে তিনি অসহযোগ আন্দোলন সংগঠিত করেছিলেন, তাতে বিম্মিত হয়েছিল সারাবিশ্ব। ক্ষাত্র শক্তির সঙ্গে নৈতিক শক্তির দ্বন্দ্ব পৃথিবীতে এই প্রথম সংঘটিত হয়নি। কিন্তু বাংলাদেশের এই আন্দোলনের মধ্যদিয়ে যে-ঐক্য যে-শৃঙ্খলা যে-দুর্জয় সংকল্পের পরিচয় পাওয়া গিয়েছিল তার তুলনা হয় না।

তারপর সেই ৭ মাচের্র ভাষণ যে শুনেছে সে ভাষণ তারই শরীরে বয়ে গেছে বিদ্যুৎপ্রবাহ। কী ছিলো সে ভাষণে? কোনো অজ্ঞাত তথ্য নয়, কোনো অপ্রত্যাশিত ঘোষণা নয়, ভাষার কোনো কারুকার্য নয়, বলবার কোনো পরিশীলিত ভঙ্গি নয়। তাতে ছিলো এ দেশের সর্বশ্রেণীর মানুষের অকথিত বাণীর প্রকাশ, তাদের চেতনার নির্যাস, বক্তব্যের অবিসংবাদিত আন্তরিকতা।

বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে এই আন্তরিকতার বন্ধন গড়ে উঠেছিল বলেই তো শত্রুদেশে বন্দি থাকা সত্ত্বেও মহান মুক্তিযুদ্ধে তার প্রেরণা ছিলো সক্রিয়। স্বাধীনতা লাভের জন্য যেমন দৃঢ় সংকল্পবব্ধ ছিলো সকলে তেমনি প্রবল আকাঙ্ক্ষা ছিলো তার নেতৃত্বে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ গড়ে তোলার। বন্দিদশা থেকে মুক্তিলাভ করে দেশে প্রত্যাবর্তন করেই তিনি বলেছিলেন যদি দেশবাসী খাবার না পায়, যুবকরা চাকরি বা কাজ না পায়, তাহলে স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়ে যাবে; পূর্ণ হবে না। এই ছিলো তার স্বপ্নেরই অংশ। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের আগেই তাকে স্বপরিবারে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়া হলো।

বঙ্গবন্ধু ছিলেন এই মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামের এক বিশাল প্রতীক এবং নিরন্তর প্রেরণার উৎস। এইসব উপাদানের সমন্বয়েই বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস এবং এই ইতিহাসে সবচেয়ে উজ্জ্বল এবং সর্বোচ্চ স্থানটি যে বঙ্গবন্ধুর যুক্তিবাদী, বিচারশীল এবং ইতিহাসবোধ সম্পন্ন সকল মানুষই এটা স্বীকার করবেন।

এ ব্যাপারে বিতর্কের কোনো অবকাশ নেই। কিন্তু তবুও কিছু লোক বিতর্ক তুলেছেন। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা মহানায়ক বঙ্গবন্ধুর হত্যা দিবসকে ‘জাতীয় শোক দিবস’ হিসেবে পালনের সরকারি সিদ্ধান্তকে ক্ষমতার জোরে অন্যায়ভাবে বাতিলও করে দিয়েছিলো। তাদের এই সিদ্ধান্ত ছিলো অদূরদর্শী, জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার বিরোধী এবং ইতিহাসকে অস্বীকার করার নামান্তর। বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী নানা অস্বাভাবিক ঘটনাপ্রবাহের স্রোতে এই দিনটিকে ১৯৭৫ পরবর্তীকাল থেকে স্বীকৃতি দেয়া হয়নি।

রাজনৈতিক নানা স্বার্থ, স্বাধীনতাবিরোধীদের চক্রান্ত এবং কিছু লোকের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষের কারণে এটি সম্ভব হয়নি। কিন্তু ১৯৯৬ সালে আ.লীগ ক্ষমতায় এসে যখন এই দিনকে জাতীয় শোক দিবস হিসেবে ঘোষণা করলো তখন তাকে সকল গণতান্ত্রিক, ইতিহাসবোধ সম্পন্ন ও শুভবুদ্ধি দ্বারা পরিচালিত দলের মানুষেরই এটা মেনে নেয়া উচিত ছিলো। কারণ বঙ্গবন্ধু ছিলেন বাংলাদেশ আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা।

বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি প্রায় সিকি শতাব্দী সংগ্রাম করেছেন, জেল-জুলুম সহ্য করেছেন এবং তারই ফলে মানুষের মনে তার চিন্তা-চেতনা গভীরভাবে প্রভাব ফেলে এবং ধাপে ধাপে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনার মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশ আন্দোলনকে রাজনৈতিক সংগ্রামের চূড়ান্ত পর্যায়ে উন্নীত করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব একটি নাম, একটি ইতিহাস। বাঙালির ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ সন্তান তিনি। তার জীবন ছিলো সংগ্রামমুখর। সংগ্রামের মধ্যেই তিনি বড় হয়েছিলেন।

তার জন্ম তৎকালীন বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার টুিঙ্গপাড়ায়। ছাত্র অবস্থায় তিনি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ৫৪’র যুক্তফ্রন্টের সরকার গঠন, কপ, পিডিপির আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু সক্রিয়ভাবে অংশ নেন।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে মহানায়ক হিসেবে ’৭০-এর নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি আ.লীগকে এদেশের গণমানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীকে পরিণত করেন। অবিসংবাদিত এই নেতার জীবন চলার পথ ছিলো কণ্টকাকীর্ণ। পাকিস্তানের সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তুলে ’৬০-এর দশক থেকেই তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের অগ্রনায়কে পরিণত হন।

১৯৭১ সালে যেভাবে তিনি অসহযোগ আন্দোলন সংগঠিত করেছিলেন, তাতে বিস্মিত হয়েছিল সারা বিশ্ব। ক্ষাত্রশক্তির সঙ্গে নৈতিক শক্তির দ্বন্দ্ব পৃথিবীতে এই প্রথম সংঘটিত হয়নি। কিন্তু বাংলাদেশের এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে ঐক্য, যে শৃঙ্খলা, যে দুর্জয় সংকল্পের পরিচয় পাওয়া গিয়েছিল তার তুলনা হয় না।

 তারপর সেই ৭ মার্চের ভাষণ, কী ছিলো সে ভাষণে? কোনো অজ্ঞাত তথ্য নয়, কোনো অপ্রত্যাশিত ঘোষণা নয়, ভাষার কোনো কারুকার্য নয়, বলবার কোনো পরিশীলিত ভঙ্গি নয়। তাতে ছিলো এ দেশের সর্বশ্রেণীর মানুষের অকথিত বাণীর প্রকাশ, তাদের চেতনার নির্যাস, বক্তব্যের অবিসংবাদিত আন্তরিকতা। বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে এই আন্তরিকতার বন্ধন গড়ে উঠেছিল বলেই তো শত্রুদেশে বন্দি থাকা সত্ত্বেও মহান মুক্তিযুদ্ধে তার প্রেরণা ছিলা সক্রিয়।

স্বাধীনতা লাভের জন্য যেমন দৃঢ় সংকল্পবব্ধ ছিলো সকলে, তেমনি প্রবল আকাঙ্ক্ষা ছিলো তার নেতৃত্বে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ গড়ে তোলার। বিজয় এসেছে। বাঙালি জাতি পেয়েছে একটি স্বাধীন দেশ। বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশ নামের একটি দেশ সগর্বে স্থান করে নিয়েছে। কিন্তু এই অর্জনের নেপথ্যে যে মহান ব্যক্তিটির নিরঙ্কুশ অবদান তাকে ছাড়া কী এটি অর্থবহ হয়, নাকি হতে পারে? তাই গোটা জাতি অধীর অপেক্ষায় ছিলেন কবে ফিরবেন অবিসংবাদিত নেতা।

কবে পূর্ণতা পাবে বাংলাদেশ নামের দেশটি স্বাধীনতা অর্জন। সব অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে তিনি ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলার মাটিতে পা রাখলেন। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান লন্ডন-দিল্লি হয়ে আজন্ম লালিত স্বপ্নের স্বাধীন বাংলাদেশের মাটি স্পর্শ করেন পরম মমতায়।

সেদিন স্বজনহারানো সর্বস্বান্ত মানুষ হূদয় উজাড় করে তাদের প্রাণপ্রিয় নেতাকে বরণ করে নিয়েছিল। নেতা ও জনতার আনন্দাশ্রু মিলেমিশে এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হয় যা স্মৃতির আকাশ থেকে কখনো মুছবার নয়। তবে তিনি খুব সহজেই দেশে প্রত্যাবর্তন করতে পারেননি। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতির স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পথ ছিলো ভয়ঙ্করভাবে কণ্টকাকীর্ণ।

মুক্তিযুদ্ধকালে দীর্ঘ ৯টি মাস বঙ্গবন্ধুকে শুধু যে দুই হাজার মাইল দূরবর্তী পাকিস্তানের নির্জন একটি কারাগারের ‘ডেথ সেলে’ বন্দি করে রাখা হয়েছিল তাই নয়, পাশাপাশি তাকে ফাঁসিতে ঝোলানোর সর্বাত্মক প্রস্তুতিও চলছিল। সামরিক জান্তার গঠিত বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচারের নামে চলছিল প্রহসন। বিশ্বের বহু খ্যাতনামা রাষ্ট্রনায়কসহ অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি তার নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানান।

সর্বোপরি বঙ্গবন্ধুর প্রাণ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। প্রিয় মাতৃভূমিতে ফিরে আসার পর বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানে এক আবেগঘন বক্তায় বলেন, তিনি ফাঁসির জন্য প্রস্তুত ছিলেন।

বঙ্গবন্ধু এও বলেন যে, এই স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়ে যাবে যদি তার বাংলার মানুষ পেট ভরে খেতে না পায়, মা-বোনেরা কাপড় না পায়। তিনি যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তাহলে এশিয়ার ‘রাইজিং টাইগার’ হিসেবে বাংলাদেশের উন্নয়ন দেখে মুগ্ধ হতেন তো বটেই।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সেই মর্মান্তিক ঘটনার পর উন্নয়নের ধারা বাধাগ্রস্ত হয়। তবে বঙ্গবন্ধু আমৃত্যু যে সোনার বাংলার স্বপ্ন দেখিয়ে গেছেন জাতিকে, তা সফলতা পেতে শুরু করেছে তারই সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে। তার যোগ্য ও দক্ষ নেতৃত্ব এবং দূরদর্শী পরিকল্পনা, সময়োপযোগী পদক্ষেপেই বাংলাদেশ বিশ্বের বিস্ময় হয়ে দ্রুততার সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ এখন মধ্যম আয়ের দেশ। উন্নয়নের রোল মডেল।

বন্দিদশা থেকে মুক্তিলাভ করে দেশে প্রত্যাবর্তন করেই তিনি বলেছিলেন, ‘যদি দেশবাসী খাবার না পায়, যুবকরা চাকরি বা কাজ না পায়, তাহলে স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়ে যাবে, স্বাধীনতা পূর্ণ হবে না’। এই ছিলো তার স্বপ্নেরই অংশ। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের আগেই তাকে সপরিবারে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়া হলো।

বঙ্গবন্ধুকে হারিয়ে অসহায় হয়ে পরে স্বপ্ন দেখা মানুষগুলো। তিনি চলে গেলেন। আর ফিরে এলেন না। আফসোস, এমন একটা নেতা এদেশের আর জন্মায়নি একটিও। তার মতো করে বাংলাকে আর ভালোবাসেনি কেউ, দেশের মানুষকে আগলে রাখেনি কেউ। হে মহান নেতা ভালো থাকো, স্বর্গীয়সুখে থাকো। হাজারো সালাম তোমায়।

লেখক : সাংবাদিক, গবেষক ও কলামিস্ট

আমারসংবাদ/এআই