বৃহস্পতিবার ০৯ এপ্রিল ২০২০

২৬ চৈত্র ১৪২৬

ই-পেপার

শফিকুজ্জামান

প্রিন্ট সংস্করণ

মার্চ ১৭,২০২০, ১১:০৬

মার্চ ১৭,২০২০, ১১:০৬

জন্মশতবর্ষে মৃত্যুঞ্জয়ী শেখ মুজিব

আজ ১৭ মার্চ সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি- স্বাধীন বাংলাদেশের রূপকার ও স্থপতি, বাঙালি জাতিক জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর জন্মশত বার্ষিকী। আজ থেকে একশত বছর পূর্বে ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ তৎকালীন বঙ্গ প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার পাতগাতি ইউনিয়নের টুঙ্গিপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

আজ সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, যেদিনটি মৃত্যুঞ্জয়ী-চিরন্তজীব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শততম জন্মবার্ষিকী। আজ বিশ্ব জুড়ে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হবে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী।

ইতোমধ্যে বাংলাদেশের সঙ্গে যৌথভাবে মুজিববর্ষ উদযাপনের সিদ্ধান্ত নেয় জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থা ইউনেস্কো। শুধু বাংলাদেশের সীমানার মধ্যেই নয়, বছরব্যাপী নানা আয়োজনে মুজিববর্ষ উদযাপিত হবে বিশ্বের ১৯৫টি দেশে।

সম্প্রতি প্যারিসে ইউনেস্কোর সদর দপ্তরে সংস্থার ৪০তম সাধারণ পরিষদের পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রীর উপস্থিতিতে সর্বসম্মতভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে মুজিববর্ষ উদযাপনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

এর ফলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী বিশ্বের ১৯৫টি দেশে উদযাপিত হচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনে ইউনেস্কো যুক্ত হওয়ায় আজ সুযোগ সৃষ্টি হলো আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিশ্বনেতা বঙ্গবন্ধুর বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবন আরো ব্যাপক পরিসরে ছড়িয়ে দেয়ার।

ইউনেস্কোর সাধারণ পরিষদের সভাপতি আলতে সেনজাইজারের সভাপতিত্বে এবং ইউনেস্কো মহাপরিচালক মিজ অদ্রে আজুলে, বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রী এবং বিভিন্ন কমিটি ও কমিশনের চেয়ারপারসনদের উপস্থিতিতে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।

বছরব্যাপী অনুষ্ঠেয় মুজিববর্ষে জাতীয় অনুষ্ঠান মালার উদ্বোধন হবে আজ। অবশ্য বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর উদযাপনের সকল প্রস্তুতি গ্রহণ করা সত্ত্বেও বিশ্বব্যাপী ‘করোনা ভাইরাস’ ছড়িয়ে পড়ায় এবং আতঙ্কের কারণে একাধিক কর্মসূচি সীমিত ও স্থগিত করা হয়েছে।

এ আতঙ্ক কেটে গেলে বছরব্যাপী পর্যায়ক্রমে পালন করা হবে সকল আয়োজন। বিশ্বব্যাপী আজ স্বীকৃত, বাঙালি-স্বাধীনতা তথা বাংলাদেশের বুকে জেগে থাকা এক অবিস্মরণীয় নাম শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলাদেশের মানুষের প্রতি তার অকৃত্রিম ভালোবাসার কারণে এদেশের মানুষ শেখ মুজিবকে দিয়েছিল ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধী।

বাংলার মানুষ এই মহান নেতাকে বাঙালি  জাতির জনক হিসেবেও শ্রদ্ধা করে। ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী ও জনপ্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব শেখ মুজিব সারাজীবন বাঙালির অধিকার রক্ষায় ও তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য সংগ্রাম করে গেছেন।

তারই নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে নয় মাস পাকিস্তানিদের শোষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে আমরা অর্জন করি এক স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশ। শেখ মুজিবের তীব্র রাজনৈতিক দূরদর্শীতা ও এদেশের মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা থেকেই তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা আদায়ে বলিষ্ঠ নেতৃত্ব প্রদান করেন। মূলত ছোট বেলা থেকেই তিনি ছিলেন দূরদর্শী ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বের অধিকারী।

১৯৩৯ সালে মিশনারি স্কুলে পড়ার সময় তৎকালীন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি মূখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক এবং পরবর্তীতে বাংলার প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ঐ স্কুল পরিদর্শনে গেলে শেখ মুজিবুর রহমান একদল ছাত্রদের নেতৃত্ব দিয়ে তাদের কাছে যান এবং স্কুলের ছাদ সংস্কারের জন্য আবেদন জানান।

সে সময় উপস্থিত সবাই শেখ মুজিবের সাহসিকতা দেখে বিস্মিত হন এবং প্রশংসা করেন। সময়ের সাথে সাথে শেখ মুজিব রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৪০ সালে নিখিল ভারতের মুসলিম ফেডারেশন এবং ১৯৪৩ সালে বেঙ্গল মুসলিম লীগে যোগ দিয়ে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সান্নিধে আসেন এবং বঙ্গীয় মুসলিম লীগের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন।

১৯৪৪ সালে কুষ্টিয়ার এক ছাত্র সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুকে ফরিদপুর ডিস্ট্রিক্ট অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি মনোনীত করা হয়। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র শেখ মুজিব ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ বর্তমান বাংলাদেশ ছাত্রলীগ গঠন করেন। মূলত এ সময় বিশেষ করে তিনি বাঙালির দারিদ্র্য, বেকারত্ব দূরীকরণ ও তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের দিকে ঝুঁকে পড়েন।

ভাষা আন্দোলনেও শেখ মুজিবের ছিলো বিশেষ অবদান। ১৯৪৮ সালে তৎকালীন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজীমুদ্দীন গণপরিষদের এক অধিবেশনে ঘোষণা দেন যে, উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা।  প্রতিবাদি শেখ মুজিব এর বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন।

যার পরিপ্রেক্ষিতে ২ মার্চ ঢাবির ফজলুল হক হলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের নিয়ে বৈঠকে তিনি একটি প্রস্তাব পেশ করেন। ঐ বৈঠক থেকেই সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। ১১ মার্চ ঢাকায় ধর্মঘট পালনের সময় শেখ মুজিব গ্রেপ্তার হন। তীব্র ছাত্র আন্দোলনের মুখে ১৫ মার্চ তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। জেল থেকে বের হয়ে তিনি ১৯ মার্চ ঢাবির চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের অধীকার আদায়ের লক্ষ্যে একটি আন্দোলন পরিচালনা করেন।

এতে ১১ সেপ্টেম্বর তিনি আবার গ্রেপ্তার হন এবং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত হন। ২১ জানুয়ারি ১৯৪৯ সালে তিনি মুক্তি পেলেও ১৯৫০ সালে ঢাকায় দুর্ভিক্ষ বিরোধী এক মিছিলে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে আবার গ্রেপ্তার হন। ১৯৫২ সালে ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনে পশ্চিম পাকিস্তানের পুলিশের গুলি বর্ষণের তিনি তীব্র প্রতিবাদ করেন জেলে বসে।

এসময় তিনি পায় ১৩ দিন অনশন করেন। ২৬ ফেব্রুয়ারি তিনি জেল থেকে মুক্তি পান। ১৯৫৩ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি জেনারেল নির্বাচিত হন এবং যুক্তফ্রন্ট গঠনের মাধ্যমে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে বিপুল ভোটে তার দল জয়ী হয়। ১৯৫৮ সালে ৭ অক্টোবর আইয়ুব খান সামরিক আইন জারি করে সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করে দিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে জেলে প্রেরণ করেন।

সে সময় ১৯৬১ সালে উচ্চ আদালতে এক রিটের মাধ্যমে তিনি জেল থেকে মুক্তি পান। এরপর ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব লাহোরে বাঙালির মুক্তির সনদ ৬ দফা ‘আমাদের বাঁচার দাবি’ শিরোনামে পেশ করেন। মূলত ছয় দফার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বাঙালি জাতির মুক্তি তথা স্বাধীনতার গুরুত্ব ও পটভূমি তুলে ধরেন যা পরবর্তীতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়।

১৯৬৮ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে আগারতলা ষড়যন্ত্র মামলা করা হলে ১৯৬৯ সালে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুকে মুক্ত করে লাখো বাঙালি। যার ফলে বঙ্গবন্ধুর দেখা বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্ন আরো দৃঢ় হতে থাকে।

১৯৬৯ সালের ৫ জানুয়ারি পূর্ব পাকিস্তানে এক জনসভার বঙ্গবন্ধু বলেন: ‘একটা সময় ছিলো যখন এই মাটি আর মানচিত্র থেকে বাংলা শব্দটা মুছে ফেলার সব ধরনের প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল। বাংলা শব্দটির অস্তিত্ব শুধু বঙ্গোপসাগর ছাড়া আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যেত না। আমি পাকিস্তানের পক্ষ থেকে ঘোষণা করছি যে এখন থেকে এই দেশকে পূর্ব পাকিস্তানের বদলে বাংলাদেশ ডাকা হবে’।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা দেন- “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম- এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।” বাঙালি জাতি এ ডাকে সাড়া দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকে।

১৯৭১ সালে ২৫ মার্চ কালরাতে অপারেশন সার্চ লাইট এর নামে পশ্চিম পাকিস্তানের সেনারা বাঙালির উপর গণহত্যা চালালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে সারা বাংলার মানুষ যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ে।

ত্রিশ লাখ শহীদের রক্ত ও দুই লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে আমরা অর্জন করি এক স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র ‘বাংলাদেশ’ একটি লাল সবুজের পতাকা। মূলত জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দৃঢ় নেতৃত্ব ও এদেশের মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসাই একটি শোষিত নিপীড়িত বাঙালি জাতিকে দিয়েছিল স্বাধীনতা।

অথচ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তার প্রিয় বাঙালিদের রেখে, বাঙালি জাতিকে অভিভাবকহীন করে তিনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে। কিছু বিপথগামী সেনা সদস্যের নির্মম বুলেটের আঘাতে তিনি সপরিবারে তিনি নিহত হন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সারাজীবন অন্যায়ের বিরুদ্ধে, বাঙালির অধিকার আদায়ে সংগ্রাম করে গেছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব স্বপ্ন দেখেছিলেন খাদ্য-শস্যে সম্পূর্ণ, অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ সোনার বাংলার।

আমাদের তরুণ প্রজন্মের উচিত বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে বুকে ধারণ করে দেশের কল্যাণে নিবেদিত হয়ে বাংলাদেশকে সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তোলা।

আজকের এ শুভদিনে বাঙালির শপথ হোক- বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা, শোষণমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত এবং উন্নত বাংলাদেশ বাস্তবায়নের। বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীতে রইলো স্বাধীন বাঙলির অফুরন্ত শ্রদ্ধা।

লেখক : সিনিয়র সাব এডিটর- দৈনিক আমার সংবাদ

আমারসংবাদ/এসটিএমএ