বৃহস্পতিবার ০৯ এপ্রিল ২০২০

২৫ চৈত্র ১৪২৬

ই-পেপার

প্রিন্ট সংস্করণ

ফেব্রুয়ারি ১৭,২০২০, ০৩:০১

ফেব্রুয়ারি ১৭,২০২০, ০৩:০২

উপকূলের রক্ষাকবচ

সুন্দরবন রক্ষায় প্রয়োজন পর্যটক নিয়ন্ত্রণ ও বিকল্প কর্মসংস্থান

ভয়ঙ্কর জলোচ্ছ্বাস-ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে বুক পেতে দিয়ে দেশের উপকূলকে রক্ষা করে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যে জায়গা করে নেয়া সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। বাংলাদেশ ও ভারত অংশে এই বনের বিস্তৃতি।


বাংলাদেশ অংশের প্রাণপ্রাচুর্য উপভোগ করতে প্রতিবছর দুই লাখের বেশি পর্যটক ভ্রমণ করেন। তবে পর্যটকদের আনাগোনা ও অসচেতন আচরণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বনের স্বাভাবিক পরিবেশ।

এছাড়া অনিয়ন্ত্রিত সম্পদ আহরণের কারণেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের এই নিরাপদ বেষ্টনী। এতে ঝুঁকির মুখে রয়েছে বন্যপ্রাণীরা। সুন্দরবনে মানুষের অবাধ যাতায়াতের কারণে শব্দ দূষণসহ নানা সমস্যায় স্বাভাবিক পরিবেশের ওপর নেতিবাচক চাপ সৃষ্টি হয়।

পর্যটন স্পটগুলোতেও পর্যটক যাতায়াতের ওপর নিয়ন্ত্রণ আনা প্রয়োজন। কোন স্পটে কী পরিমাণ পর্যটক যেতে পারবে তা নির্ধারণ করে দেয়া দরকার। ফরেস্ট স্টেশন থেকে অনুমোদন নিয়ে বনের ভেতরে প্রবেশ করা যায়।

জোয়ারের সময় প্রবেশ করার পর ট্রলারে প্রচণ্ড শব্দ হয়। ট্রলার নিয়ে সুন্দরবনের ভেতরে গিয়ে প্রাকৃতিক পরিবেশ দেখতে ভালো লাগলেও ট্রলারের শব্দে বন্য প্রাণীদের স্বাভাবিক বিচরণ বিঘ্নিত হয়।

এছাড়া সুন্দরবনে পর্যটকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখনো নাজুক। প্রতিটি লঞ্চে মাত্র দুজন করে বনরক্ষী দেয়া হয়। বনরক্ষীরা বয়স্ক ও তাদের অস্ত্র চালানোর পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ নেই। অন্যদিকে সুন্দরবনের মধ্যে বিশুদ্ধ পানির সংকট প্রকট। পর্যটকদের আবাসনের কোনো ব্যবস্থা নেই। তাদের লঞ্চ বা বোটের মধ্যে রাত কাটাতে হয়।

কাঠের তৈরি ওয়াচ টাওয়ারগুলোও নড়বড়ে। পর্যটকদের বহনকারী লঞ্চ বেঁধে রাখার মতো ভালো ব্যবস্থাও নেই। এখনো বনের অধিকাংশ এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই। ফলে সুন্দরবনে প্রবেশের পর পর্যটকদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এতে জরুরি চিকিৎসাসেবার প্রয়োজন হলেও তা অনেক সময় নিশ্চিত করা যায় না। পর্যটন শিল্পের বিকাশে এ বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।

সুন্দরবনের সুরক্ষা নিশ্চিতে পর্যটক নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বনের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনার ওপর অগ্রাধিকার দিতে হবে। সুন্দরবন ঘিরে থাকা এলাকায় ৩৫ লাখ জনগোষ্ঠী রয়েছে।

এর মধ্যে প্রায় ছয় লাখ মানুষ সরাসরি সুন্দরবন থেকে মাছ, মধু, কাঁকড়া, গোলপাতাসহ সম্পদ আহরণ করেন। সুন্দরবনের ওপর এ নির্ভরশীলতা কমিয়ে বিকল্প কর্মসংস্থান করা জরুরি। সে লক্ষ্যে নির্ভরশীলদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে।

যদিও বনবিভাগ বলছে, এ পর্যন্ত ৭০ হাজার নির্ভরশীলকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। তবে শুধু প্রশিক্ষণই নয়, তাদের বিকল্প কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে না পারলে এটি কোনো কাজে লাগবে না। বাংলাদেশের পর্যটনশিল্পে সুন্দরবনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

তবে পর্যটনশিল্পের বিকাশের সাথে সাথে বনের সুরক্ষার বিষয়টিতেও সমান গুরুত্ব নিতে হবে। বনকে ঘিরে চলমান পর্যটনকেন্দ্র ও ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়া বন, পরিবেশ ও প্রাণীর জন্য সুখকর নয়। এ প্রক্রিয়াগুলো সুন্দরবন সুরক্ষার জন্য সন্তোষজনকও নয়। পুরো সুন্দরবন নিয়ে সংরক্ষিত বনাঞ্চল তৈরি, নিয়ন্ত্রিত পর্যটনের বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বন থেকে মৎস্য, কাঁকড়াসহ সব ধরনের সম্পদ আহরণ বন্ধ করা প্রয়োজন।

কাঁকড়া আহরণের ফলে প্রকৃতি পরিবেশ ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ এ পরিবেশগত দিকটি ভাবনায় নেয়া প্রয়োজন। ২০১১ সালে সুন্দরবন সুরক্ষা প্রকল্প শুরু হয়। তবে এর আওতায় এলেও সুরক্ষার কোনো কাজ হয়নি। তাই দেশের উপকূলের রক্ষাকবচ এই বনকে রক্ষায় অগ্রাধিকার দিতে হবে। এক্ষেত্রে কোনো অবহেলা বা দীর্ঘসূত্রতা কাম্য নয়।

আমারসংবাদ/এমএআই