মঙ্গলবার ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০

১৪ আশ্বিন ১৪২৭

ই-পেপার

মিরাজ আহম্মেদ, মাগুরা

প্রিন্ট সংস্করণ

সেপ্টেম্বর ১৭,২০২০, ১০:০৪

সেপ্টেম্বর ১৭,২০২০, ১০:০৪

সড়ক নির্মাণে শুভঙ্করের ফাঁকি

বিশ্ব যখন মহামারি করোনা ভাইরাস সংক্রমণ নিয়ে আতঙ্কিত, মাগুরা সড়ক জনপথ বিভাগ তখন উন্নয়নকাজে সময় বৃদ্ধির নামে টাকা আয়ের খেলায় লিপ্ত। মাগুরা-ঝিনেদাহ মহাসড়কের চার কিলোমিটার রাস্তা ফোরলেন করাসহ মোট ১০.১৫ কিলোমিটার মহাসড়ক প্রশস্তকরণের কাজে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।

মাগুরা সড়ক ও জনপথের (সওজ) সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে জানা যায়, ৬২ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১৬ সালের ১ জুলাই থেকে মাগুরা-ঝিনাইদহ মহাসড়কের পুলিশ লাইন এলাকা থেকে রামনগর এলাকা পর্যন্ত ১০.১৫ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়নকাজ শুরু হয়।

এর মধ্যে মাগুরা যুব উন্নয়ন অফিস এলাকা থেকে পুলিশ লাইন্স কমিউনিটি সেন্টার পর্যন্ত চার কিলোমিটার সড়ক ফোর লেন বাকি অংশ দুই লেনের। মহাসড়ক নির্মাণকাজের মধ্যে ৪.১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের দুই লেনের কাজ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। পাশাপাশি সম্পন্ন হয়েছে শহরের ঢাকা রোড এলাকা থেকে ভায়না পর্যন্ত চার লেন সড়কের কাজ।

তাছাড়া চার লেনের বাকি অংশের মধ্যে শেষ হয়েছে মালঞ্চ কমিউনিটি সেন্টার থেকে যুব উন্নয়ন অফিস ও কুছুন্দি ইউনিয়ন অফিস পর্যন্ত এলাকার কাজ। বাকি অংশ আগের অবস্থায়। আর কাজের দায়িত্বে রয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এমএম বিল্ডার্স ওএএস কনস্ট্রাকশন।

কাজ শেষের মেয়াদ ছিলো গত বছরের জুনমাসে। নানা জটিলতায় কাজ শেষ না হওয়ায় আগামী ৩০ মার্চ পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়।সে সময় ও শেষ হয়েছে অনেক দিন হলো, বিল উত্তোলন শেষের দিকে কাজ বাকি অনেক! কাজ শেষ না হতেই মহাসড়ক আবার ক্ষতিগ্রস্তে রূপ ধারণ করে।

এদিকে, ৬২ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রায় ১০.১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ মহাসড়কের কাজ শেষ না হতেই দেখা দিয়েছে ফাটল। ডিভাইডারের ব্লক একাধিক অংশ ভেঙে যাওয়ায় কাজের মান নিয়ে নানা অভিযোগ উঠেছে জনমনে। জোড়াতালি দিয়ে প্রকল্পটির উন্নয়নকাজ সম্পন্ন করা হলেও এরই মধ্যে সড়কের দু’পাশে অসংখ্য গর্ত ও একাধিক স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে।

ফলে ত্রুটিপূর্ণ সড়কের কারণে মাগুরা বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনা অধিক সময় ধুলা জীবাণুতে বাধাগ্রস্ত পথচারীরা। এ বিষয়ে সড়ক বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উদাসীনতা ও ঠিকাদার দায়সারাভাবে কাজ শেষ করার  কয়েক মাসের মধ্যেই রাস্তাটির এমন বেহালদশা হয়েছে অভিযোগ স্থানীয়দের।

অপরদিকে রাস্তার বিভিন্ন স্থানে পিচঢালাই ফুলে ফেটে গেছে, চলছে একের পর এক পুটিং এবং কোথাও কোথাও রাস্তা দেবে যেতে দেখা গেছে। মাঝে মাঝে সড়ক বিভাগের লোকজন এসে ফুলা অংশ তুলে ফেলছেন এবং পুনরায় পিচঢালাই দিয়ে মেরামত করছেন ডিভাইডারের মাঝে দেয়া হয়েছে বালু, ডিভাইডার তৈরিতে ব্যবহার সিমেন্ট আর বালু যার কারণে নিজের থেকেই ভাঙচুর হতে চলছে।

সড়ক তৈরির নামে মালামাল সড়কের উপর রেখে জন জীবনের চলাচলের অযোগ্য তাও এই কাজটি মানসম্মতভাবে করা হচ্ছে না। পুনরায় এসব কাজ করা হলেও ওইসব স্থানে সমতলভাবে ফিনিশিং না দেয়ায় যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে। যার ফলে বাড়ছে একের পর এক সড়ক দুর্ঘটনা।

স্থানীয়রা জানান, ঢাকা-চট্টগ্রামসহ-খুলনা-বেনাপোল-কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুরসহ দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ৩২ জেলার যোগাযোগের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনে আঞ্চলিক এই মহাসড়কটি। প্রতিদিন হাজার হাজার ছোট-বড় যানবাহন চলাচল করে ১৮ ফুট প্রশস্ত এ সড়কে।

ফলে সড়কটিতে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। যার কারণে সড়কটি চার লেনে উন্নীত করার দাবি ওঠে। চার লেনের কাজ প্রায় শেষ দিকে, বরাদ্দ ৬২ কোটি টাকার মধ্যে ৪২ কোটি টাকা অনেক আগেই উত্তোলন করা হলেও গত ১৪ সেপ্টেম্বর মাগুরা সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমি সঠিক জানি না কত উত্তোলন!’

এ বিষয়ে চার লেন নির্মাণের দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এএস কনস্ট্রাকশনের উপপ্রকল্প ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ ওবায়দুল্লাহর নাম জনমুখে শুনা গেলেও মাগুরা সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী নজরুল ইসলাম গণমাধ্যমকে কোনো তথ্য দিতে রাজি হননি।

গণমাধ্যমে উন্মুক্ত দরপত্র প্রকাশিত না হওয়ার কারণ? এমন প্রশ্নের জবাবে নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, ৩০টির অধিক দিয়েছি দরপত্র উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তি, কিন্তু তিনি দেখাতে পারেননি কোনোটি, একাধিক কাজ ঘুরে ফিরে একই ঠিকাদার পাচ্ছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি আমার সংবাদকে সরাসরি কোনো জবাব না দিয়ে জানান, সবই হচ্ছে ইজিপি টেন্ডারে!  মাগুরা সড়ক জনপথ বিভাগের অফিসের ভেতরে ‘আবাসিক’ ঠিকাদারের ব্যক্তিগত অর্থে বসতি স্থাপনা বৃদ্ধি, অন্য স্থানে নতুন করে অফিস তৈরির কারণ জানতে চাইলে তিনি কথা বলতে রাজি হননি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ঠিকাদার আমার সংবাদকে জানান, ই-জিপি চালু হলেও দরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সওজের কর্মকর্তাদের অবহেলা রয়েছে। অফিস কর্মকর্তারা ঠিকাদারদের রেট শিডিউল জানিয়ে দেন। কার্যাদেশ দেয়ার ক্ষেত্রে ঘুষ আদায় করা হয়।

তাছাড়া মাগুরা সওজের কর্মকর্তাদের ঘুষ, মদ ও নারী দিয়ে সন্তুষ্ট করে কাজ পেয়ে যাচ্ছে এক শ্রেণির অসাধু ঠিকদার। এর এসবের পেছনে মাগুরা সওজের বড় বাবু খ্যাত একজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর হাত রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, মাগুরা সওজের কথিত ‘বড়বাবু’ খ্যাত চতুর্থ শ্রেণির একজন কর্মচারী সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন। তার ইশারাতে চলে নারী ও মদের আসর। এসব ঘটনা জানাজানি হলে সম্প্রতি পরিবর্তন করা হয়েছে সওজের অফিসও। যার মূলে সেই ‘বড়বাবু’।

জানা যায় ,তারই ব্যবস্থাপনায় চলে সব। ঠিকাদার কর্তৃক বাসায় আসবাবপত্র উপঢৌকন পাঠানোর সিস্টেম চালুও করেছেন এই ‘বড়বাবু’। মাগুরা সওজের কথিত এই ‘বড়বাবু’ খ্যাত চতুর্থ শ্রেণির এই কর্মচারীকে ফোন দেয়া হলে এ ব্যাপারে কোনো কথা বলতে রাজি হননি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সঠিকভাবে দেশের গণমাধ্যমে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান না করায় একাধিক ঠিকাদার করোনা ভাইরাস সংক্রমণের মতো মহামারি পরিস্থিতিতে অসহায় মানবেতর অবস্থায় রয়েছেন। অধিক পার্সেন্টেজ আর ক্ষমতার অপব্যবহারে স্বল্প পুঁজির ঠিকাদারও পথে বসতে চলেছেন।

আমারসংবাদ/এআই