মঙ্গলবার ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০

১৪ আশ্বিন ১৪২৭

ই-পেপার

আব্দুল্লাহ আল মামুন খান

প্রিন্ট সংস্করণ

সেপ্টেম্বর ১৭,২০২০, ১২:৩০

সেপ্টেম্বর ১৭,২০২০, ১২:৩০

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন: ফের সেরার মুকুট বাংলাদেশের

পেশাদারিত্ব, দক্ষতা ও নিষ্ঠায় এমনিতেই তারা সবার সেরা। বৈরী আবহাওয়া, অচেনা পরিবেশ, অশান্ত ও বিরোধপূর্ণ এলাকায় শান্তির পতাকা উড়ানোর কাজেও শ্রেষ্ঠ। স্বভাবতই জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সেনা প্রেরণকারী দেশ হিসেবে প্রায় আট বছর র্যাঙ্কিংয়েও এক নম্বর অবস্থানে ছিলো ব্লু হেলমেটধারীরা।

কিন্তু আফ্রিকার দেশ ইথিওপিয়া তাদের টপকে যায়। প্রায় পাঁচ বছর পর আবারো ঘনবসতিপূর্ণ দেশটির সেনাদের পেছনে ফেলে নিজেদের হারানো স্থান পুনরুদ্ধার করে শীর্ষস্থান অর্জন করেছে লাল-সবুজের বাংলাদেশ।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশনে এখন ছয় হাজার ৮৩৬ জন বাংলাদেশি সেনা কাজ করছেন। উপমহাদেশের অপর দুই দেশ ভারত ও পাকিস্তান জাতিসংঘে সেনা সরবরাহের দিক থেকে র্যাঙ্কিংয়ে পঞ্চম ও ষষ্ঠ অবস্থানে রয়েছে।

অর্থাৎ, বিশ্ব শান্তিরক্ষায় প্রতিবেশী দুই দেশের তুলনায় যোজন যোজন এগিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ।

আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছে, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েনকারী দেশ হিসেবে আবারো বাংলাদেশ বিশ্বের সকল দেশকে টপকে প্রথম স্থান অধিকার করার বিরল গৌরব অর্জন করে দেশ ও জাতিকে বিশ্বের দরবারে সম্মানিত ও গৌরাবান্বিত করেছে।

 জাতিসংঘ সদর দপ্তরের ওয়েবসাইটে সমপ্রতি এ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। জানা যায়, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানের মুকুট মাথায় দিয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদের সময়ে। বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের মহাকাব্য রচনায় তার নেতৃত্বের বদৌলতেই হারানো গৌরব ফিরে পেয়েছে বাংলাদেশ।

অতীতের ধারাবাহিকতায় এ সময়েও সর্বোচ্চ মানের পেশাদারি মনোভাব, সাহসিকতা, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার মাধ্যমে বিশ্বের দেশে দেশে সন্ত্রাস, সংঘাত ও দাঙ্গা দমনের মাধ্যমে শান্তি স্থাপন থেকে শুরু করে দেশ পুনর্গঠনে নির্ভীক ভূমিকা পালন করছে এদেশের শান্তি সেনারা।

মাস কয়েক আগে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের টকশোতে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি) উপাচার্য মেজর জেনারেল আতাউল হাকিম সারওয়ার হাসান বলেন, ‘টানা ৩২ বছর যাবত জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করছে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা।’ এ শান্তিরক্ষা মিশনে সেনা সরবরাহের দিক থেকে বাংলাদেশের পুনরায় এক নম্বর অবস্থানের জন্য তিনি কৃতিত্ব দেন সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদকে।

সেদিন ওই অনুষ্ঠানে আতাউল হাকিম সারওয়ার হাসান বলেন, ‘বর্তমান সেনাপ্রধান দায়িত্ব নেয়ার পরপরই জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বীরত্বপূর্ণ অবদান রাখা দেশসমূহ সফর করেন।’

সেখানে তিনি সাধারণ সেনা থেকে শুরু করে সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন। পেশাদারিত্ব ও শৃঙ্খলার বিষয়টিতেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তিনি জাতিসংঘের সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গেও বৈঠক করেন। এসবের সুফল হিসেবেই আবারো সেনা পাঠানোর দিক থেকে টপ ওয়ানে জায়গা করে নিয়েছি আমরা।’

সূত্র জানায়, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনে শীর্ষ শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশের মর্যাদা লাভ বাংলাদেশের এবারই প্রথম নয়, এর আগেও পাঁচবার লাল-সবুজের বাংলাদেশ ২০০১, ২০০৫, ২০১১, ২০১৪ ও ২০১৫ সালে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েনে প্রথম হওয়ার বিরল কৃতিত্ব অর্জন করে।

সূত্র মতে, জাতিসংঘের অধীনে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় তিন দশক সময় পার করছে বাংলাদেশ। বিশ্বে ১৯৪৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৬৮ শান্তিমিশনের মধ্যে বাংলাদেশি শান্তি সেনাদের স্পর্শ পেয়েছে ৫৪ মিশন। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ১৩ মিশনে দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা।

আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছে, বাংলাদেশ এক লাখ ৭১ হাজার ৯৫৭ জন শান্তিরক্ষী পাঠিয়ে জাতিসংঘের ইতিহাসে বিশ্ব শান্তিরক্ষায় একটি রোলমডেল হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।

সেনাবাহিনীর পাশাপাশি ১৯৮৯ সাল থেকে পুলিশ বাহিনী এবং ১৯৯৩ সাল থেকে নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণ করছে।

একই সূত্র জানায়, এর মধ্যে সেনাবাহিনীর সদস্য এক লাখ ৩৯ হাজার ২৭১ জন নৌবাহিনী থেকে পাঁচ হাজার ৯১২ জন আর বিমানবাহিনী থেকে সাত হাজার ১০৬ জন এবং বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর ১৯ হাজার ৬৬৮ জন বিভিন্ন দেশে মিশনে অংশ নেন।

এছাড়া বাংলাদেশ সশস্ত্র ও পুলিশ বাহিনীর এক হাজার ৮২৬ জন নারী শান্তিরক্ষী জাতিসংঘ মিশনের আওতায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে নারীর ক্ষমতায়নে এবং নারী-পুরুষ সমতা বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। বর্তমানে আটটি মিশনে বাংলাদেশের সর্বমোট ছয় হাজার ৮৩৬ জন শান্তিরক্ষী নিয়োজিত আছেন।

এর মধ্যে সেনাবাহিনীর সদস্য পাঁচ হাজার ২৫৫ জন, নৌবাহিনীর ৩৪৫ জন এবং বিমানবাহিনী ৫৮২ জন এবং পুলিশ বাহিনীর ৬৫৪ জন। বর্তমানে শান্তিরক্ষা মিশনে সশস্ত্র ও পুলিশ বাহিনীর ২৪৬ জন নারী শান্তিরক্ষী কর্মরত আছেন। বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে সাধারণ মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসের একটি বিশাল স্থান দখল করে আছেন বাংলাদেশি সেনারা।  

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিশ্বশান্তি রক্ষা ও স্থিতিশীলতা জোরদারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ় প্রত্যয় এবং এ লক্ষ্যে জাতিসংঘের আহবানের প্রতি তার দ্রুত ও ইতিবাচক সাড়া দেয়ার কারণেই জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে শীর্ষস্থান দখলের অর্জন লাভ করেছে বাংলাদেশ।

গত ১২ সেপ্টেম্বর আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এক দিনে দু’টি সুসংবাদের কথা জানান দেন দেশবাসীকে।

প্রথম সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তারা বলেন, বর্তমানে শান্তিরক্ষী মিশনে সেনা প্রেরণকারী দেশের সংখ্যা ১১৯টি। এর মধ্যে ছয় হাজার ৭৩১ জন শান্তিরক্ষী মোতায়েন করে বাংলাদেশ প্রথম স্থান অধিকার করেছে। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ইথিওপিয়া।

তাদের সৈন্য সংখ্যা ছয় হাজার ৬৬২ জন। বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশ শান্তিরক্ষী বাহিনী যেমন সুনাম অর্জন করেছে, তেমনি বিভিন্ন মিশনে ডেপুটি কমান্ডার হিসেবেও নেতৃত্ব দিচ্ছে।

এ ক্ষেত্রে আইএসপিআরের আরেকটি ‘গুড নিউজ’ ছিলো এমন- ‘দক্ষিণ সুদানের জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের ডেপুটি ফোর্স কমান্ডার নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল মো. মাঈন উল্লাহ চৌধুরী।’

দক্ষিণ সুদান সম্পর্কে দেয়া তথ্যে তারা আরও জানায়, বিশ্বের নবীনতম দেশ দক্ষিণ সুদানে জাতিসংঘ কার্যক্রম শুরু করে ২০১১ সালে। বাংলাদেশের একটি কন্টিনজেন্ট দক্ষিণ সুদানে জাতিসংঘ মিশনের শুরু থেকেই নিয়োজিত।

মিশনে বর্তমানে একটি পদাতিক কন্টিনজেন্টসহ বাংলাদেশের সর্বমোট তিনটি কন্টিনজেন্ট দক্ষিণ সুদানে ইউএনএমআইএসএস মিশনে নিয়োজিত। এই মিশনে বর্তমানে এক হাজার ৬৪৪ জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী হিসেবে নিয়োজিত রয়েছেন।

গত ১৫ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) আরও জানায়, ১৯৮৮ সাল থেকে জাতসিংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিয়ে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা সর্বোচ্চে পেশাদারি মনোভাব, আনুগত্য ও সাহসকিতার সাথে বিশ্ব শান্তিরক্ষায় জীবনের ঝুঁঁকি নিয়ে প্রতিনিয়ত দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।

তাদের অনন্য অবদানের জন্য আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবর্মূতি উজ্জ্বল হয়েছে। বিশ্বশান্তির অন্বেষণে এ পর্যন্ত বাংলাদশে সশস্ত্র ও পুলিশ বাহিনীর ১৫৩ জন শান্তিরক্ষী প্রাণ দিয়েছেনে।

তাদের এই আত্মত্যাগ বিশ্ব শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতিকে যেমন রক্ষা করেছে, তেমনি সারা বিশ্বের মানুষের কাছে বাংলাদেশকে করেছে গৌরবান্বিত। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের নিরলস অবদান ও নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ জাতিসংঘের ইতিহাসে চির অম্লান হয়ে থাকবে।

আমারসংবাদ/এসটি