বুধবার ১৫ জুলাই ২০২০

৩০ আষাঢ় ১৪২৭

ই-পেপার

শরিফ রুবেল

প্রিন্ট সংস্করণ

জুন ৩০,২০২০, ০৯:২২

জুন ৩০,২০২০, ০৯:২২

ভিত্তিহীন মামলায় ভারাক্রান্ত বিচারবিভাগ!

পরিচয়টা ফেসবুকে। সেই থেকেই দুজনের মাঝেমধ্যে একটু-আধটু আলাপ হতো মেসেজের মাধ্যমে। আলাপ থেকেই প্রেমের সম্পর্ক ও মন দেয়া-নেয়া।

পরে প্রেমের টানে পালিয়ে টাঙ্গাইল থেকে সোজা ঢাকায় প্রেমিকের বাসায়। অথচ দুজনেই দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ে। বয়সেও অপরিপক্ব। মেয়ের বাবা টাঙ্গাইল ভুয়াপুরের সরকারদলীয় রাজনৈতিক নেতা।

ক্ষমতাবান ও প্রতাপশালীও। তাই ১৮ বছরের কম বয়সি নাবালিকা মেয়ে নিখোঁজ হওয়ায় চিন্তিত। তরুণের বাবা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। পালিয়ে আসা মেয়েটিকে ছেলের বাবা-মা বুঝিয়ে পরিবারের কাছে ফেরত দেয়ার চেষ্টা করেন।

কিন্তু তাতে তারা ব্যর্থ হন। মেয়ে কিছুতেই ফেরত যেতে রাজী নয়। মেয়ের ভাষ্য— পারিবারিক কলহ ও বাবা-মায়ের নিত্য অমিল মেয়ের ভবিষ্যতের বিষয়ে তাদের উদাসীনতা, নির্যাতনেই তিনি বাড়ি ছেড়েছেন।

এদিকে মেয়ে হারিয়ে সেই নেতা পুলিশের শরণাপন্ন হন। মোবাইল ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে মেয়ের অবস্থান শনাক্ত করেন। পরে ডেমরা থানা পুলিশের সহযোগিতায় মেয়েকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর বাসা থেকে উদ্ধার করেন।

সেই সঙ্গে ধরে নিয়ে আসেন ছেলে ও তার বাবাকে। ভুয়াপুর থানায় ঠুকে দেন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা। মামলায় প্রয়োগ করা হয় ৭ ধারা। এ মামলায় ছেলেকে আদালতে চালান করা হয়। আর বাবাকে প্রাথমিক জবানবন্দি শেষে মুচলেকা দিয়ে ছেড়ে দেয়া হয় থানা থেকেই। পরবর্তীতে পুলিশ মেয়েটির কাছ থেকে ২২ ধারায় জবানবন্দি নিয়ে বাবার জিম্মায় ছেড়ে দেয়।

জবানবন্দিতে মেয়েটি জানায়, পারিবারিক নির্যাতন, বাবা-মায়ের অমিল, পিতার অর্থ লিপ্সা, উচ্ছৃঙ্খল জীবন যাপনের প্রেক্ষাপটে আত্মরক্ষার্থে সে নগদ অর্থ ও স্বর্ণালংকার নিয়ে ঢাকায় ওই ছেলের কাছে চলে যান। ছেলে কিংবা তার বাবা-মা তাকে অপহরণ করেনি। তারা খুব নিরীহ ও ভালো মানুষ।

সুস্থ মস্তিষ্কে ও স্বেচ্ছায় সে ঢাকায় চলে যান। ছেলেটির বাবা-মা তাকে নিরাপত্তা ও আশ্রয় দেয়। কিশোরী মেয়ের জবানবন্দির ভিত্তিতে মামলাটি এখানেই নিষ্পত্তি হতে পারতো। পুলিশ আনুষ্ঠানিকতার স্বার্থে দাখিল করতে পারতো একটি চূড়ান্ত প্রতিবেদন।

কিন্তু ওই রাজনৈতিক নেতার প্রভাবে মামলাটির তদন্তই আর এগোয়নি। মামলাটি ঝুলছে। দেড় মাস কারাভোগের পর ছেলেটির কারামুক্তি হলেও ততক্ষণে তার জীবন গড়ার স্বপ্নও ভেস্তে যায়। দ্বাদশ পরীক্ষায় অংশ নেয়া হয়নি। পড়ালেখারও সমাপ্তি ঘটে। শুরু হয় আদালতে দৌড়ঝাঁপ। তারিখের পর তারিখ যায়-মামলা নিষ্পত্তি হয় না।

তারিখ পড়লেই আইনজীবীকে দিতে হচ্ছে ৫ হাজার করে টাকা। টাকা জোগাড় করতে নিঃস্ব হচ্ছে ছেলেটির পরিবার। আইনজীবী জানালেন, মেয়েটির জবানবন্দি আসামির পক্ষে। মামলাটি তদন্ত পর্যায়েই শেষ হওয়ার কথা।

কিন্তু শুরু হয়েছে ঠিকই তবে শেষ নেই। মিথ্যা মামলায় পরিবারটি এখন সর্বস্বান্ত। মামলা দায়ের, তদন্ত এবং বিচারব্যবস্থার বিদ্যমান বাস্তবতায় এমন হাজারো দৃষ্টান্ত রয়েছে। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মামলা করার প্রবণতা দিনদিন বেড়েই চলেছে।

আর অপ্রয়োজনীয় মামলার বিচার করতে হিমশিম খাচ্ছে আদালত। মামলাভারে ভারাক্রান্ত হচ্ছে বিচারবিভাগ। ফলে নানা বাস্তবতায় বিচারপ্রার্থীর অধিকারও যেন ভূলুণ্ঠিত, ব্যাঘাতগ্রস্ত হচ্ছে প্রতিনিয়তই। আদালতগুলোতে তৈরি হচ্ছে বিচারপ্রার্থী মানুষের দীর্ঘ লাইন। বৈরী পরিস্থিতিতেও যেন এ লাইন কমছে না।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে রজু করা মামলাগুলো আগে আটকাতে হবে। এবং মামলা নেয়ার সময় থানা বা আদালতের উচিত প্রাথমিক একটা তদন্ত করা ও সত্যতা যাচাই করা। যাচাই-বাছাই এবং তদন্ত ছাড়া মামলা হলে এটা নকল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

 কেউ থানায় গেলেন আর থানা মামলা নিয়ে নিলো এমন হওয়া যাবে না, এক্ষেত্রে থানা কর্তৃপক্ষকে আরও সচেতন হতে হবে। এবং অপরাধের গুরুত্ব বিচার করে মামলা গ্রহণ করতে হবে। তাতে বেহুদা মামলা যেমন কমবে তেমনি বিচারবিভাগও বাড়তি মামলার বোঝা থেকে রেজাই পাবে।

অনেক সময় সামান্য পারিবারিক দ্বন্দ্বের বিষয় মামলা পর্যন্ত গড়ায়। কিন্তু এসব বিরোধ পারিবারিক সালিশের মাধ্যমেই মিটিয়ে ফেলা সম্ভব। এসব সমস্যা সমাধান করতে পারলেই অপ্রয়োজনীয় মামলা কমবে।

বিশ্লেষকদের মতে, যেহেতু মানুষের আক্রোশমূলক মিথ্যা মামলা দেয়ার প্রবণতা বেশি, তাই এটাকে আটকাতে হলে নতুন কোনো পন্থা অবলম্বন করতে হবে। সেক্ষেত্রে প্রশসনকে আগে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করতে হবে পরে মামলা গ্রহণ করতে হবে।
আর দীর্ঘসূত্রতা এবং মামলা জটের কারণ শুধু বিচারক কিংবা সহায়ক কর্মচারী স্বল্পতাই নয়।

বহুলাংশে দায়ী গোষ্ঠীগত স্বার্থ চিন্তা, নানামাত্রিক স্বার্থ সংরক্ষণ, দুর্নীতি এবং দুর্বল বিচারব্যবস্থাপনা। দীর্ঘদিন ধরে পুঞ্জীভূত এ সংকট থেকে সহসাই বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়। সরকারের সদিচ্ছা, সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের আন্তরিকতা এবং বিচার ব্যবস্থার উন্নয়নের মধ্য দিয়েই এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব।

বিচারের দীর্ঘসূত্রতা, মামলা জট, কারণ ও প্রতিকারের সম্ভাব্য উপায় নিয়েই তৈরি হয়েছে এ ধারাবাহিক প্রতিবেদন।

খোঁজ জানা যায়, বিনা প্রয়োজনে বিভিন্ন জেলায় প্রতিদিনই শত শত মামলা হচ্ছে। পান থেকে চুন খসলেই চলছে মামলা দায়ের। মামলাই যেন সকল সংকট বা বিরোধের সমাধান। যখন যার তার বিরুদ্ধে নানা অজুহাতে ঠুকে দেয়া হচ্ছে মামলা।

আসামিও করা যাচ্ছে ইচ্ছেমতো। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেই মামলার তদন্তে নেমে নাস্তানাবুদ। মামলাগুলো বিচারে গিয়ে আদালতকে করছে ভারাক্রান্ত। বাড়াচ্ছে হয়রানি ও জট। সরকারও মাত্রাতিরিক্ত মামলার বিচার-ব্যবস্থাপনায় হিমশিম খাচ্ছে।

আদালতের সংখ্যা বাড়াচ্ছে। বছর বছর নিয়োগ দিচ্ছে বিচারক এবং সহায়ক জনবল। তবুও থামছে না মামলার স্রোত। উদ্বিগ্ন বিশ্লেষকদের তাই প্রশ্ন— সৃষ্ট জটের নিরসন কোথায়?

মামলা জটের জন্য বিচারক স্বল্পতাকে দায়ী করা হয়। সমাধানও খোঁজা হয় আদালত সংখ্যা বৃদ্ধি, বিচারক এবং জনবল নিয়োগের মধ্য দিয়ে। কিন্তু বাস্তবতা হলো— আদালতের সংখ্যা যতই বাড়ছে; সমানভাবে বাড়ছে মামলার সংখ্যাও।

এভাবে জট নিরসন সম্ভব নয় বলে মনে করেন অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজ মো. মাইদুল ইসলাম। তিনি বলেন, মামলার উৎসমূলে হাত দিতে হবে। মানুষ কেন মামলা করে তা আগে দেখতে হবে। মামলা জটের গুরুত্বপূর্ণ কারণ মানুষের অসহিষ্ণুতা। মামলা দায়েরের সহজলভ্যতা।

কমতে পারে মামলা জট : ‘জাস্টিস অডিট রিপোর্ট-২০১৯’র তথ্যমতে, ৬৮ শতাংশ মানুষ আনুষ্ঠানিক বিচারব্যবস্থায় ন্যায়বিচার পাবেন বলে বিশ্বাস করেন। বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থাশীল হওয়া সত্ত্বেও তাদের মধ্যে ৮৭ ভাগ বিচারপ্রার্থী স্থানীয়পর্যায়ে বিরোধ নিষ্পত্তিতে আগ্রহী নন। মাত্র ১৩ ভাগ মানুষ প্রাথমিকভাবে বিরোধ নিষ্পত্তি করতে রাজি। বাকি ৮৭ শতাংশই প্রাতিষ্ঠানিক বিচারব্যবস্থার দ্বারস্থ হয়। তাতেই মামলা জট।

অডিট রিপোর্ট মতে, এভাবে জট বাড়তে থাকলে ২০২২ সালে মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালত, দায়রা আদালত এবং হাইকোর্ট বিভাগে মামলার হার দাঁড়াবে যথাক্রমে ৭২, ৮০ এবং ৯০ শতাংশে। বিচারক নিয়োগ, আদালত বৃদ্ধি পাশাপাশি ‘বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি-(এডিআর)’র প্রতি গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। তাতেও লাগাম পড়ছে না মামলার সংখ্যায়।

জুডিসিয়াল রিফর্ম কমিটি ও জার্মান উন্নয়ন সংস্থার (জিআইজেড)র তথ্য অনুযায়ী, মামলাজটে বিপর্যস্ত বিচারাঙ্গন। আপিল এবং হাইকোর্ট বিভাগে বিচারাধীন মামলা ৫ লাখ ৩৭ হাজার ৯৪টি। নিম্ন আদালতে বিচারাধীন মামলা ৩০ লাখ ৩২ হাজার ৬৫৬টি। গেলো বছর নতুন মামলা দায়ের হয় ৪ লাখ ৪৭ হাজার ৮৫৪টি। বিপরীতে মামলা নিষ্পত্তি হয় ২ লাখ ৮৪ হাজার ১৩১টি। প্রতিদিন এ সংখ্যা বাড়ছেই।

সংস্থাটির তথ্য মতে, বাংলাদেশে প্রতি ১০ লাখ লোকের বিপরীতে বিচারক রয়েছেন মাত্র ১০ জন। যুক্তরাষ্ট্রে এই সংখ্যা ১০৭ জন। কানাডায় ৭৫ জন। ব্রিটেনে ৫১, অস্ট্রেলিয়ায় ৪১, ভারতে ১৮ জন বিচারক। মামলা এবং বিচারকের এ অনুপাত দিন দিন বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগ বাড়িয়েই চলেছে। বাড়ছে হয়রানি, অপরিমেয় অর্থ ব্যয়। শিকার হচ্ছেন প্রতারণা, জাল-জালিয়াতিসহ নানা অপরাধমূলক ঘটনার।

আদালতসংশ্লিষ্ট বকশিশ ও অনৈতিক লেনদেনের সাথে সবচেয়ে বেশি জড়িত আদালতের পেশকার, উমেদার ও পিয়ন জড়িত। মামলার নথি দেখা, হাজিরা দেয়া, ওকালতনামায় সই করা, জামিননামা দেয়া, জামিনের শুনানি করা, মামলার নকল তোলাসহ মামলাসংক্রান্ত যেকোনো কাজে ‘বকশিশ’ বা ‘খরচাপাতি’র নামে বিচারপ্রার্থীর কাছ থেকে আদায় করা হয় বাড়তি পয়সা।

এ ক্ষেত্রে কম এগিয়ে নন একশ্রেণির আইনজীবী এবং তাদের সহায়কগণ। এ ক্ষেত্রে অধিকাংশ আইনজীবীই সাধারণ একটি ‘যুক্তি’ দাঁড় করিয়ে নিয়েছেন। সেটি হচ্ছে— আইনজীবীরা চাকরি করেন না। মক্কেলরা টাকা না দিলে তারা চলবেন কি করে? আদালতপাড়ায় রয়েছে টাউট, প্রতারকদের উৎপাতও।

আইনজীবী, কখনো বা মানবাধিকারকর্মী, কখনো বা ‘জজ সাহেবের ঘনিষ্ট লোক’ পরিচয়ে বিচারপ্রার্থীদের কাছ থেকে তারা হাতিয়ে নেয় অর্থকড়ি। অথচ এ বিষয়ে বিচারিক ব্যবস্থাপনায় স্থায়ী কোনো সার্ভিলেন্স সিস্টেম নেই।

প্রয়োজন সদিচ্ছা ও আইন সংশোধন : ‘হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ’র প্রেসিডেন্ট অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, মামলা রুজুর সময় প্রাথমিক বাছাই হওয়া প্রয়োজন। সত্যতা যাচাই করতে পারে পুলিশই।

এ বিষয়ে হাইকোর্টের অবজারভেশন রয়েছে। আমলযোগ্য ধারায় মামলার ক্ষেত্রে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন তথা প্রাথমিক অনুসন্ধান করতে হবে। যেটি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ক্ষেত্রে রয়েছে।

কিন্তু পুলিশ এটি প্রতিপালন করে না। যেমন— একটি অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ২শ জনকে আসামি করা হলো। হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ অনুসারে মামলা গ্রহণকারী বাদিকে এ প্রশ্ন করবেন যে, ঘটনাস্থলে ওই ২শ ব্যক্তিই উপস্থিত ছিলেন কি না।

এ প্রশ্নের উত্তর পেতে পুলিশকে ঘটনাস্থলে যেতে হবে। এতে কথায় কথায় গায়েবি মামলা দায়েরের সুযোগ থাকবে না। তিনি বলেন, প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা। দরকার আইনের সংশোধন।

এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহম্মেদ বলেছেন, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি একান্ত প্রয়োজন। এতে তাড়াতাড়ি মামলা নিষ্পত্তি হবে। সমাজে শান্তি ফিরে আসবে। মামলা ফাইল হলে এটা মীমাংসা করা যায়।

পক্ষদ্বয়ের মধ্যে আলাপ আলোচনা করে। ক্রিমিনাল মামলাও এডিআরের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা যায়। এ ব্যবস্থা না হলে বিচারব্যবস্থায় ধস নামবে। জনগণ দীর্ঘসূত্রতার কারণে বিচার পাচ্ছে না। এডিআরের ফলে তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে মামলা করার প্রবণতা দূর হবে।

আমারসংবাদ/এআই