বৃহস্পতিবার ০৪ জুন ২০২০

২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

ই-পেপার

মাহমুদুল হাসান

প্রিন্ট সংস্করণ

এপ্রিল ০৪,২০২০, ১২:৩৬

এপ্রিল ০৪,২০২০, ১২:৩৬

তবুও মিলছে না চিকিৎসা

 

রাজধানীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইশরাত (ছদ্মনাম)। পরিবারের সঙ্গে পুরান ঢাকার লালবাগে থাকেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে শ্বাসকষ্টজনিত রোগে ভুগছেন। করোনার প্রকোপ দেশে ছড়িয়ে পড়ায় পড়েছেন বিপাকে। সরকারি-বেসরকার হাসপাতাল তাকে চিকিৎসাসেবা দিতে অপারগতা প্রকাশ করছে।

গত মঙ্গলবার রাতে হঠাৎ শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়ায় স্বজনরা তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসেন। শ্বাসকষ্ট করোনার উপসর্গের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হওয়ায় চিকিৎসকরা সেবা দিতে অপরাগতা প্রকাশ করেন। উপায় না পেয়ে ইশরাতের স্বজনরা পূর্বের চিকিৎসার কাগজপত্র দেখালে দায়িত্বরত চিকিৎসক প্রায় ১০ হাত দূর থেকে কিছু ওষুধ লিখে বিদায় দেন।

ইশরাতের পরিবারের অভিযোগ, মেয়েটির তখন শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। প্রয়োজন ছিলো স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য একটু অক্সিজেন সরবরহ করার। কিন্তু চিকিৎসকরা আতঙ্কিত করে সে দফায় বিদায় দেন।

ভুক্তভোগী ইশরাত জানান, তখনো আমার নিঃশ্বাস নিতে অনেক কষ্ট হচ্ছিল। পরিবারের সবাই ভর্তি নিতে অনুরোধ করলেও তারা আমাকে ভর্তি নেয়নি। পরে বাধ্য হয়ে বাসায় ফিরে আসি।

অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় পরেরদিন বুধবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতালে শ্বাসকষ্ট নিয়ে চিকিৎসার জন্য গিয়েছিলাম। কিন্তু তারা শুধু ফিরিয়ে দিচ্ছেন।

হতাশ হয়ে তিনি বলেন, দেশে করোনার ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে আমিও জানি। এ জন্য কি রোগীদের চিকিৎসা দেয়া বন্ধ করে দিতে হবে। আমার অনেকদিন থেকে শ্বাসকষ্টের সমস্যা এটা বলার পরও কোথাও চিকিৎসা দিচ্ছে না।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা প্রদানের পদ্ধতি দেখে আমি নিজেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছি। কতব্যরত চিকিৎসক পিপিই পরে থেকেও প্রায় ১০ হাত দূর থেকে সমস্যা বলতে বলেন! আমি এমনিতেই নিঃশ্বাস নিতে পারছি না তার ওপরে এত দূর থেকে কি কথা শোনা যায়? তাহলে পিপিই পরে লাভ কি!

এ বিষয়ে জানতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল এ কে এম নাসির উদ্দিনের ব্যক্তিগত মুঠোফোনে কয়েকবার চেষ্টা করে পাওয়া যায়নি।

গতকাল শুক্রবার তারা শ্বাসকষ্ট আবার বেড়ে গেলে ইশরাত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের স্বাস্থ্যবাতায়ন নম্বর ১৬২৬৩, ৩৩৩ এবং সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) হটলাইনে অনেকবার চেষ্টা করেও কোনো সাড়া পাননি।

পরে বাধ্য হয়ে লকডাউনের মধ্যে গতকাল শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর মহাখালী আইইডিসিআরে যান। সেখানে দায়িত্বরতদের সঙ্গে কথা বলার পর তারা সমস্যার কথা শুনে নাম ও ঠিকানা নিবন্ধন করতে বলেন।

এরপর আগামী দুই দিন পরে পরিস্থিতির অবনতি হলে আইইডিসিআরের হটলাইনে ফোন করে জানাতে বলেছেন। তখন প্রয়োজনে আইইডিসিআর নমুনা সংগ্রহ করবে বলেও জানান।

ইশরাতের পরিবার এমন উত্তর শুনে হতাশ হয়ে ফিরে আসেন। জ্বর-হাঁচি-কাশি-শ্বাসকষ্টের রোগীদের নিয়ে এমন বেদনাদায়ক খবর প্রতিদিন গণমাধ্যমে উঠে আসছে। চিকিৎসা দেয়ার চেয়ে আতঙ্কেই এসব রোগীকে ভর্তি নিতে চাইছে না হাসপাতালগুলো। ইতোমধ্যে রাজধানীতে এক মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যু ঘটেছে এই চিকিৎসাহীনতায়।

জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, করোনার ভয়ে এভাবে চিকিৎসকরা সেবা দেয়া থেকে বিরত থাকলে দেশের চিকিৎসা খাতে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে। তাই চিকিৎসকদের উচিৎ হবে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে যথাসাধ্য চিকিৎসা দেয়া।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, বিষয়টি তিনিও জেনেছেন। এখন থেকে নেবে সব হাসপাতালে জ্বর, ঠাণ্ডা, কাশি কিংবা শ্বাসকষ্টের উপসর্গ থাকলেও রোগীর চিকিৎসা দেয়ার নির্দেশনা দেয়া আছে।

তিনি আরো বলেন, আমাদের পরামর্শ হলো, কারো যদি সামান্য জ্বর-গলাব্যথা থাকে তারা বাড়িতেই চিকিৎসা নিন। জ্বর থাকলে প্যারাসিটামল খাবেন, গলাব্যথা থাকলে কুসুম গরম পানি দিয়ে গড়গড়া করবেন। সর্দি-কাশির জন্য এন্টিহিস্টামিন সিরাপ খেতে পারেন। অবস্থা জটিল না হলে হাসপাতালে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। বেশি অসুবিধা হলে ১৬২৬৩, ৩৩৩, ১০৬৫৫ এসব হটলাইনে ফোন করে পরামর্শ নিন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) অধ্যাপক ডা. আমিনুল হাসান বলেন, জ্বর, ঠাণ্ডা, কাশি কিংবা শ্বাসকষ্ট হলে আমরা বাড়িতেই চিকিৎসা গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করি। এরপরও অনেকে হাসপাতালে চলে আসেন।

তাদের বলেছি, রাজধানীর করোনা চিকিৎসার জন্য প্রস্তুত বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল, শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, রেলওয়ে জেনারেল হাসপাতাল, মহানগর জেনারেল হাসপাতাল এবং মিরপুর লালকুঠি মাতৃ ও শিশু হাসপাতালে আসলে তাদের চিকিৎসা দেয়া সহজ হবে। অন্য হাসাপাতালে বিভিন্ন ধরনের রোগী থাকায় সেখানে করোনার উপসর্গ বিদ্যমান রোগীদের চিকিৎসা দেয়া একটু কঠিন।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক অনলাইন বিফ্রিংয়ে বলেন, লক্ষ করছি, কিছু প্রাইভেট হাসপাতাল কাজ কম করছে। তবে, ক্লিনিক ও প্রাইভেট চেম্বার অনেকাংশে বন্ধ আছে। আমরা সামাজিক মাধ্যমে জানতে পারছি, নিজেরাও দেখতে পাচ্ছি। এসময় আপনাদের পিছপা হওয়াটা যুক্তিসঙ্গত নয়। বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও প্রাইভেট চেম্বার বন্ধ থাকলে প্রয়োজনে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

তিনি বলেন, আমাদের প্রত্যেকটি সরকারি হাসপাতালে আইসোলেশন ইউনিট করা হয়েছে। বড় বড় কয়েকটি হাসপাতাল করোনা ভাইরাসে আক্রান্তদের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। যাদের এ ধরনের হাঁচি-কাশি আছে, সন্দেহ হলে এসব হাসপাতালে যাবেন। সব ধরনের চিকিৎসা পাবেন।

তিনি বলেন, হাসপাতালগুলো প্রস্তুত আছে। ভেন্টিলেশন লাগানো আছে। অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো লাগানো আছে। জেলা পর্যায়ে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী পরিবহনের জন্য অ্যাম্বুলেন্স বরাদ্দ করা হয়েছে।

আমারসংবাদ/এআই