বৃহস্পতিবার ০৪ জুন ২০২০

২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

ই-পেপার

মাহমুদুল হাসান

প্রিন্ট সংস্করণ

মার্চ ৩১,২০২০, ১২:৪২

মার্চ ৩১,২০২০, ১২:৪২

মৃত্যুর মিছিলে ইউরোপ-আমেরিকা

  • ইতালির পর স্পেনে লাশের স্তূপ
  • ফ্রান্সের সাবেক মন্ত্রীর মৃত্যু
  • পরিস্থিতি মোকাবিলায় হিমশিম জার্মান মন্ত্রীর আত্মহত্যা
  • প্রতি ৯ মিনিটে যুক্তরাষ্ট্রে একজনের প্রাণহানি ২ লাখ প্রাণহানির শঙ্কা
  • করোনায় ইতালিতে ৫০ চিকিৎসক মারা গেছেন
  • যুক্তরাজ্যের আইসিইউতে নেয়া অর্ধেক মানুষ মারা যাচ্ছে

নভেল করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। ১৯৯টি দেশ, অঞ্চল ও দুটি আন্তর্জাতিক প্রমোদতরিতে আঘাত হেনেছে এ ভাইরাস। বিশ্বব্যাপী কেড়ে নিচ্ছে তাজাপ্রাণ। শয্যাশায়ী হচ্ছে কর্মঠ মানুষ। বিশ্বের দেশে দেশে অর্থনীতিতে লেগেছে মন্দার হাওয়া।

লকডাউন আর গৃহবন্দিত্বে গোটা বিশ্ব যেন কারাগারে পরিণত হয়েছে। ইউরোপ ও মার্কিন সাম্রাজ্যে এখন ভয়াবহতা চলছে। সেখানে এখন ঘণ্টায় ঘণ্টায় মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। সমগ্র বিশ্বে করোনা আক্রান্ত এখন সাত লাখ ৩৫ হাজার ২১০ জন।

এর সিংহভাগ ইউরারোপ ও আমেরিকার নাগরিক। উন্নত চিকিৎসা আর প্রযুক্তির উৎকর্ষতার পরও তারা আক্রান্তের মিছিল ও প্রাণহানি কমাতে পারছে না। সবচেয়ে বেশি আক্রান্তের রেকর্ড মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘরে।

সেখানে এক লাখ ৪২ হাজার ৭৯৩ জন মানুষ করোনা আক্রান্ত। এর প্রকোপে বিশ্বে প্রাণহানিও নেহায়েত কম নয়। সমগ্রবিশ্বে প্রায় ৩৫ হাজারের বেশি মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে নভেল করোনা
ভাইরাস।

এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে ইতালিতে। সেখানে ১০ হাজার ৭৭৯ জনের মৃত্যুর জন্য করোনা দায়ী। এরপরই নতুন করে প্রাণহানিতে যুক্ত হয়েছে ইউরোপের আরেক দেশ স্পেন।

সেখানে লাশের স্তূপ তৈরি হচ্ছে। ইতালির পরই সেখানে সর্বোচ্চ মৃত্যু। স্পেনে ৭ হাজার ৩৪০ জনের প্রাণহানির ঘটেছে করোনায়। যুক্তরাষ্ট্রেও আড়াই হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

আরও প্রায় দুই লাখের বেশি মানুষ মারা যেতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছে দেশটি। এদিকে যুক্তরাজ্যের আইসিইউতে যাদের চিকিৎসা চলছে তাদের অর্ধেকের সুস্থ হওয়ার তথ্য নেই। সেখানে আইসিইউতে চিকিৎসাধীনদের প্রায় অর্ধেক রোগী মারা যাচ্ছে।

ইতালিতে করোনা মোকাবিলায় কাজ করছে এমন প্রায় ৫০ জন চিকিৎসক মারা গেছে ভাইরাস সংক্রমিত হয়ে। আর ফ্রান্সে প্রায় ৪০ হাজারের মতো মানুষ আক্রান্ত হয়েছে। মারা গেছে ২ হাজার ৬০৬ জন।

তাদের মধ্যে সাবেক এক মন্ত্রীও রয়েছে। এর আগে ইরানে এমন ঘটনা ঘটেছে। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির ঘনিষ্ঠ কয়েকজনসহ দেশটির প্রথমসারির কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে এ ভাইরাসে।

ইরানে সাড়ে ৪১ হাজার লোক করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। মারা গেছে ২ হাজার ৭৫৭ জন। আর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ১৩ হাজার ৯১১ জন।

এদিকে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে করোনার উৎপত্তিস্থল চীনের হুবেই প্রদেশে। সেখানে গত ছয় দিনে নতুন করে কেউ আক্রান্ত হয়নি।

এ পর্যন্ত ৮১ হাজার ৪৭০ জন মানুষ করোনা আক্রান্ত হলেও অধিকাংশ সুস্থ হয়েছে। সেখানে ৭৫ হাজার ৭০০ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। মারা গেছে ৩ হাজার ৩০৪ জন।

বিশ্বব্যবস্থা কোনোভাবেই ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না। বাংলাদেশসহ সারা বিশ্ব এ ভাইরাসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। কী আছে এর পরিণতি সেটা নিয়ে দেশে দেশে বাড়ছে শঙ্কা।

স্পেন এখন লাশের স্তূপের দেশ
ইতালির পর ইউরোপের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশ স্পেন। সেখানে প্রতিদিন এত প্রাণহানি ঘটছে যে, দেশটিতে করোনায় মৃত্যুদের লাশের স্তূপে পরিণত হয়েছে।

দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলছে, স্পেনে এ ভাইরাসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৫ হাজার ১৯৫ জনে। মারা গেছে ৭ হাজার ৩৪০ জন। আর সসুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ১৬ হাজার ৭৮০ জন।

গত রোববারও এই সংখ্যা ছিলো ৭৮ হাজার ৭৯৭ জনে। সংক্রমণ বাড়তে থাকায় দেশটি এখন চীনকেও ছাড়িয়ে গেছে। করোনার বিস্তার ঠেকাতে দেশটির সরকার কঠোর ব্যবস্থা নিলেও লাগাম টানতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

এর প্রাদুর্ভাব কমিয়ে আনতে দেশটির সরকার গতকাল সোমবার থেকে বেশকিছু বিধি-নিষেধ আরোপ করেছে। এতে বলা হয়েছে— গতকাল থেকে আগামী ৯ এপ্রিল পর্যন্ত দেশটির অপ্রয়োজনীয় কর্মীরা বাড়িতে অবস্থান করবেন। গত ১৪ মার্চ থেকে দেশজুড়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়।

করোনার আঘাত সাংসদ-মন্ত্রীদের জীবনেও
ইরানের পর ফ্রান্সের সাবেক মন্ত্রী প্যাট্রিক ডেভেডজিয়ানের মৃত্যু হয়েছে প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসে। মৃত্যুর তিন দিন আগে এক টুইট বার্তায় প্যাট্রিক লিখেছিলেন, তিনি খুব ক্লান্ত তবে অবস্থা স্থিতিশীল।

গত ২৫ মার্চ তার শরীরে করোনা ভাইরাস ধরা পড়ার পর থেকে তিনি প্যারিসের দক্ষিণের একটা বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। তার শরীরে অন্যান্য কোনো অসুখ ছিলো কি না তা জানা যায়নি। এখন প্রতিটি দেশের সরকার ও মন্ত্রীদের মধ্যে ভীতি কাজ করছে।

এদিকে করোনার প্রকোপ থেকে দেশের অর্থনীতিকে কীভাবে টেনে ধরবেন— এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় জার্মানির একটি প্রদেশের অর্থমন্ত্রী থমাস শয়েফার রেল লাইনে ঝাপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন।

গত শনিবার ফ্রাঙ্কফুর্ট এবং মাইনজের মধ্যবর্তী হোচাইম শহরে রেললাইনের ওপর থেকে শয়েফারের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

উইসবাডেন প্রসিকিউশন অফিস জানিয়েছে, তাদের বিশ্বাস শয়েফার আত্মহত্যা করেছেন। ট্রেনে কাটা পড়ে গোটা দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়ায় প্রথমে তাকে শনাক্ত করা যাচ্ছিল না।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানায়, করোনার প্রকোপ থেকে দেশের অর্থনীতিকে কীভাবে বাঁচাবেন তা নিয়ে বেশ কিছুদিন থেকেই দুশ্চিন্তায় ভুগছিলেন ৫৪ বছর বয়সি এই মন্ত্রী। পরিস্থিতি মোকাবিলায় আর্থিক সহায়তা নিয়ে সমপ্রতি বিবৃতিও দিয়েছিলেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্র এখন সবচেয়ে ঝুঁকিতে
দেশটিতে করোনা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিটি রাজ্যে এর ভয়াবহতা গ্রাস করে নিয়েছে। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ও মৃত্যু হয়েছে নিউইয়র্কে।

যুক্তরাষ্ট্রে এখন এক লাখ ৪২ হাজার ৭৯৩ জনের শরীরে করোনা ভাইরাস শনাক্ত করা হয়েছে। মারা গেছে ২ হাজার ৪৯০ জন। এই হিসেবে দেখা গেছে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ৯ মিনিটে একজনের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে করোনা ভাইরাস।

এই যখন পরিস্থিত তখন দেশটির জাতীয় অ্যালার্জি এবং সংক্রামক ব্যাধি ইনস্টিটিউটের প্রধান ডা. অ্যান্থনি ফসি এক সতর্কবার্তায় জানান, করোনা ভাইরাস প্রাদুর্ভাবে যুক্তরাষ্ট্রে অন্তত এক থেকে দুই লাখ মানুষ মারা যেতে পারে। আরও কয়েক মিলিয়ন মানুষ আক্রান্ত হতে পারে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের সঙ্গে আলাপকালে অ্যান্থনি ফসি বলেছেন, আমি বলবো এই মহামারিতে যুক্তরাষ্ট্রে এক লাখ থেকে দুই লাখ মানুষ মারা যাবে। আমরা মিলিয়ন মিলিয়ন রোগী পেতে যাচ্ছি। তবে আমি এই হিসাব-নিকাশে আটকে থাকতে চাই না। কারণ মহামারিটি এখন চলমান। এটি সত্যও হতে পারে আবার ভুল প্রমাণিতও হতে পারে।

ইতালিতে ৫০ চিকিৎসকের প্রাণহানি
ইতালি এখন করোনায় মৃত্যুতে শীর্ষ দেশ। সেখানে এক লাখের চেয়ে কম রোগী শনাক্ত হলেও মারা গেছে দশ হাজারের বেশি। দেশটির তথ্যমতে, সেখানে ৯৭ হাজার ৬৮৯ জন মানুষ এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন।

তাদের মধ্যে মারা গেছেন ১০ হাজার ৭৭৯ জন। আর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার সৌভাগ্য হয়েছে ১৩ হাজার ৩০ জনের। এই মৃত্যু মিছিলে আছে চিকিৎসকদেরও নাম।

দেশটির সার্জন এবং ডেন্টিস্টদের জাতীয় ফেডারেশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ইতালিতে করোনা আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে অন্তত ৫০ জন চিকিৎসক প্রাণ হারিয়েছেন।

যুক্তরাজ্যে আইসিইউতে নেয়া রোগীর অর্ধেক প্রাণ হারাচ্ছে
করোনা ভাইরাসে আক্রান্তদের মধ্যে গুরুতর অসুস্থ হয়ে নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি রোগীদের মৃত্যুহার প্রায় ৫০ শতাংশ।

সমপ্রতি যুক্তরাজ্যের নিবিড় পরিচর্যা জাতীয় নিরীক্ষা ও গবেষণাকেন্দ্রের (আইসিএনএআরসি) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এতে মুমূর্ষু রোগীদের ক্ষেত্রে বর্তমান চিকিৎসাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

আইসিএনএআরসি জানিয়েছে, ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে ইংল্যান্ড, ওয়েলস ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডে করোনা আক্রান্ত ১৬৫ জন রোগীকে আইসিইউতে ভর্তি করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে ৭৯ জনই মারা গেছেন, বাকি ৮৬ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন।

দেশটির এক চিকিৎসক বলেন, ‘সত্য কথাটা হলো— নিবিড় পরিচর্যায় রাখা ব্যক্তিদের মধ্যে বেশিরভাগই কোনো না কোনোভাবে মারা যাবেন। আশঙ্কা রয়েছে যে, কিছু একটা করতে হয় বলেই আমরা তাদের কৃত্রিম শ্বাস (ভেন্টিলেটর) দিচ্ছি। যদিও সেটা কার্যকর হবে না। এটাই চিন্তার বিষয়।

যুক্তরাজ্যে করোনায় এ পর্যন্ত ১৯ হাজার ৫২২ জন আক্রান্ত হয়েছে। মারা গেছে এক হাজার ২২৮ জন। আর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে মাত্র ১৩৪ জন।

ঘুড়ে দাড়িয়েছে করোনার উৎপত্তিস্থল
করোনা ভাইরাসের উৎপত্তিস্থল চীনের হুবেই প্রদেশে গত ছয়দিনে নতুন করে কারো শরীরে করোনা ভাইরাস শনাক্ত হয়নি। ধারণা করা যাচ্ছে প্রদেশটিতে প্রাণঘাতী এই ভাইরাসের প্রকোপ কমতে শুরু করেছে। সেখানে নতুন করে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা আগের তুলনায় অনেক কমেছে।

দেশটিতে নতুন করে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। চীনে এখন পর্যন্ত মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৮১ হাজার ৪৭০ এবং মারা গেছে ৩ হাজার ৩০৪ জন। অপরদিকে, আক্রান্তদের মধ্যে অধিকাংশই সুস্থ হয়েছে।

এখন পর্যন্ত ৭৫ হাজার ৭শজন চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। গত কয়েকদিনে দেশটিতে নতুন করে করোনায় আক্রান্তদের মধ্যে অধিকাংশই ছিলো বিদেশি নাগরিক।

স্থানীয় বাসিন্দাদের আক্রান্ত ও মারা যাওয়ার সংখ্যা ছিলো খুবই কম। ফলে বিদেশি নাগরিকদের কারণে নতুন করে করোনার প্রকোপ বাড়ার ঝুঁকি দেখা দিয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের লাগাম টেনেছে চীন।

আমারসংবদ/এআই