বৃহস্পতিবার ০৪ জুন ২০২০

২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

ই-পেপার

জাহাঙ্গীর আলম

প্রিন্ট সংস্করণ

মার্চ ৩০,২০২০, ০১:০০

মার্চ ৩০,২০২০, ০১:০০

করোনার ভয়ে প্র্যাকটিস বন্ধ করে ঘরে ডাক্তাররা

ডাক্তারকে ক্লিনিকে পাওয়া যাচ্ছে না। আগে নিয়মিত চেকআপ করার পরও ফোন করে তাকে পাওয়া না। কিন্তু মেয়ের পরিস্থিতি খুবই খারাপ। গাড়িও চলে না যে ঢাকায় যাই চিকিৎসা করতে। কি করি বুঝতে পারছি না।

এভাবেই করোনার প্রভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে অসহায়তার কথা জানান নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁও উপজেলার মুরগাপাড়ার ইশমত আরা।

শুধু এই ইশমত আরাই নয়, শ্যামলীর এক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের এমডি বকুল বলেন, খুবই জরুরি দিনাজপুর থেকে আসতে হবে। কিন্তু কোনো গাড়ি চলে না।

পেপারের গাড়িতে আসার যাবে কি না— এ প্রতিবেদকের কাছে তা জানতে চান। শুধু এই দুইজনেরই অভিযোগ নয়, উপজেলা, জেলা শহর এমনকি খোদ রাজধানীতেও ডাক্তাররা জানের ভয়ে প্যাকটিস বন্ধ করে দিয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অরপদিকে, করোনার ভয়াবহ ধাপা থেকে রক্ষার জন্য সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করার আগেই অধিকাংশ মানুষ গ্রামে চলে গেলেও রাজধানীতে থাকা প্রায় মানুষও বাইরে বের হতে পারছেন না।

সব পথেই সরকার যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ করেছে। গৃহবন্দি হয়ে পড়েছেন জনগণ। কারণ সংক্রমণ ঠেকাতে প্রধানমন্ত্রী সবাইকে ঘরে থাকার আহবান জানালে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলাবাহিনী কঠোরভাবে সেই নির্দেশনা মানার চেষ্টা করছে।

কিন্তু হতদরিদ্ররা সংসার চালাতে বাইরে গেলে কোনো কোনো এলাকায় কান ধরে উঠবস করা হয়। এ জন্য সমালোচনায় পড়তে হয়েছে।

বাধ্য হয়ে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ও আইজিপি আচরণবিধি মেনে চলার নির্দেশ নিয়েছেন স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলাবাহিনীকে। করোনা ভাইরাসে বিশ্বের ক্ষমতাধর বড় বড় দেশ ঘায়েল হয়ে গেছে। প্রায় ৩১ হাজার মানুষ মারা গেছে।

সংক্রামিত হয়েছে প্রায় সাত লাখ মানুষ। বাংলাদেশে ৪৮ জন সংক্রামিত হলেও মারা গেছে পাঁচজন। তবে গত দুদিনে কোনো সংক্রমণ ও মারা যায়নি বলে আইইসিডিআর পরিচালক ডা. ফ্লোরা জানান।

সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র মতে, ৩১ ডিসেম্বর চীনের উহান প্রদেশে প্রথমে করোনা ভাইরাসে সংক্রমণের খবর পাওয়া যায়। অজানা এই মরণব্যাধি অল্প সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, ইটালি, স্পেনসহ সারা বিশ্বের ১৯৯ দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। ইটালিতে ৯ মার্চে লকডাউন করেও ঠেকাতে পারছে না সংক্রমণ।

স্পেন মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছে। আমেরিকাতেও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। হোম কোয়ারেন্টাইন বা আইসোলেশনে থেকেও রক্ষা পাচ্ছে না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনাকে মহামারি হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। পিপিইর অভাবে ডাক্তাররা এই রোগে মারা যাওয়ায় বিশ্ব এ সংস্থাটিও উদ্বিগ্ন।

সূত্র জানায়, বাংলাদেশে করেনা মহামারি আকারে দেখা না দিলেও তা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। প্রবাসীরা প্রাণে বাঁচতে ভয়ে আসতে শুরু করে নিজ দেশে।

কিন্তু তাদের পরীক্ষা করার তেমন সুযোগ না থাকায় অনেকেই সাধারণ মানুষের সাথে মিশে সংক্রামিত করেছে অন্যদের।

বাধ্য হয়ে সরকার অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সব রুটে বিমান যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে। গত ১৬ মার্চে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়।

এরপরও সংক্রমণ বাড়তে থাকায় জনসমাগম ঠেকাতে ২৪ মার্চ সরকার ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত ১০ দিনের সাধারণ ছুটিও ঘোষণা করে।

শুধু তাই নয়, সঙ্গরোধ করতে অর্থাৎ মানুষের যাতায়াত বন্ধ করতে রেল, নৌ এবং সড়ক পথেও পরিবহন বন্ধ করেছে সরকার।

তারপরও হুড়োহুড়ি ঠাসাঠাসি করে অধিকাংশ মানুষ গ্রামে চলে গেছেন। কিন্তু শনাক্ত করার জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় শিবচরসহ বিভিন্ন স্থানে করোনায় আক্রান্তের খবর পাওয়া গেছে।গতকাল ছিলো ছুটির ৪র্থ দিন। পরীক্ষা করে এ পর্যন্ত ৪৮ জন সংক্রামিত হয়েছে। মারা গেছে পাঁচজন।

তবে আশার কথা হলো গত শনিবার ও রোববার কোনো সংক্রমণ ও মৃতের খবর পাওয়া যায়নি বলে রোগ তত্ত্ব, রোগ নির্ণয় ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) জানায়।

কিন্তু জ্বর, সর্দি ও কাশিতে আক্রান্ত হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও ও বগুড়ায় তিনজন মারা গেছে। তাদের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে করোনায় আক্রান্ত হয়েছে কি না।

করোনা ভাইরাস একেবারে নতুন হওয়ায় বিশ্বের উন্নত দেশের মতো আমাদেরও শনাক্ত ও প্রতিরোধ করার মতো যথেষ্ট পিপিই নেই। তাই সংক্রমিত রোগীর সংস্পর্শে এসে অন্যরা রেহাই পাচ্ছেন না।

সেবা দিতে গিয়ে ডেলটা হাসপালের ডাক্তারও সংক্রমিত হয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে বেসরকারি হাসপাতাল স্বাভাবিক চিকিৎসা দেয়াও বন্ধ করে দিয়েছে।

ডাক্তাররা বলছেন, ব্যক্তিগত প্রতিরোধ সরঞ্জাম (পিপিই) নেই। রাজধানীর নামকরা টিকাটুলি হাটখোলার সালাউদ্দিন স্পেশালাইজ হাসপাতালে সরকার ছুটি ঘোষণা করার আগে থেকে প্রাইভেট প্রাকটিস বন্ধ করে দিয়েছে।

এই হাসপালের নামকরা প্রায় ৭০ জন ডাক্তার আগে নিয়মিত চিকিৎসা করলেও বর্তমানে তাদের পাওয়া যায় না। ফলে বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীরা সেবা পাচ্ছেন না। বিভাগীয় শহর রাজশাহীতেও নামকরা বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল প্যাকটিস বন্ধ করে দিয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনা প্রতিরোধ সরঞ্জাম নেই। তাই সরকারি অফিস ছাড়া প্রাইভেট প্যাকটিস করা সম্ভব নয়। শুধু তাই নয়, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সর্দি, জ্বর, কাশির রোগী ভর্তি করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অপরদিকে জীবন বাঁচাতে ভর্তি হলেও করোনার ভয়ে অনেকেই মেডিকেল থেকে চলে আসছেন। আগে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঁচ থেকে ছয় হাজার রোগী ভর্তি হলে গত শনিবার কমে ২৪০ জনে নেমে গেছে বলে সূত্র জানায়।

শুধু তাই নয়, বিভিন্ন সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সবাই মিলে ওয়ার্ডে রাউন্ড দিলে সম্প্রতি সেই চিত্র পাল্টে গেছে। টিম করে কম ডাক্তার দিয়ে রাউন্ড দেয়া হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘরে থেকে যুদ্ধ করে করোনা ভাইরাস মোকাবিলার আহ্বান জানালে সরকারের সংশ্লিষ্টরা তা পালনের চেষ্টা করছেন। সশস্ত্রবাহিনী বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা করছে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে। রাজধানীসহ ৬২ জেলায় ৩৭১ দলে প্রায় পাঁচ হাজার সেনা সদস্য টহল দিচ্ছেন।

তবে খেটে খাওয়া অতি দরিদ্র প্রায় পোনে দুই কোটি মানুষের ঘরের বাইরে যাওয়া ঠেকানো যাচ্ছে না। শহরের মতো গ্রামের দিন মজুররা সকাল হলেই বের হচ্ছে। যশোরের মনিরামপুরের এসিল্যান্ড তিন বৃদ্ধকে কান ধরে উঠবস করায়। তা নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠলে তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।

জন প্রশাসন প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, দুর্যোগের সময় মাঠ প্রশাসনে আচরণবিধি না মানলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। দেশের কোথায় কোথায় দরিদ্র মানুষকে ঘরের বাইরে পেয়ে পুলিশ কান ধরে উঠবস করায় তা নিয়েও সারা দেশে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। তা কোনোক্রমেই বরদাস্ত করা হবে না বলে আইজিপি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন।

এদিকে সরকারি ছুটি ঘোষণা করার পরে প্রথমে তৈরি পোশাক কারখানা বন্ধ না করলেও সংক্রমণ ঠেকাতে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ আগামী ৪ এপ্রিল পর্যস্ত সব কারখানা বন্ধ রাখার আহবান জানিয়েছে।

বিকেএমইএর সভাপতি একেএম সেলিম ওসমান ২৫ মার্চ বলেছেন, রপ্তানি কার্যাদেশ বা এ সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম না থাকলে ফ্যাক্টরি চালানোর কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ জনসমাগম যত কম হবে, ততই করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ কমবে।

আমারসংবাদ/এসটিএমএ