রবিবার ২৯ মার্চ ২০২০

১৫ চৈত্র ১৪২৬

ই-পেপার

আবদুর রহিম

প্রিন্ট সংস্করণ

ফেব্রুয়ারি ২৩,২০২০, ১২:২০

ফেব্রুয়ারি ২৩,২০২০, ১২:২০

খালেদার মুক্তিতে গ্রিন সিগন্যাল

চলছে মুজিববর্ষ। এরপর স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। এ দুটি বছর যেকোনো অবস্থায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ চায় সরকার। এর মধ্যেই হঠাৎ সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা দিনদিন খারাপ হতে চললো।

আগেই বাম হাত সম্পূর্ণ বেঁকে গেছে, সম্প্রতি ডান হাতও বেঁকে যাচ্ছে। চোখ থেকে অনবরত পানি ঝরছে। হেঁটে টয়লেটে যেতে পারছেন না। আজীবনের জন্য পঙ্গুত্ব ও জীবনাশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারও খালেদা জিয়ার মুক্তিতে কঠিন অবস্থা থেকে সরে আসছে।

মুজিববর্ষ উপলক্ষে চলতি বছর ক্ষমতাসীন সরকার বৃহৎ কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। পুরো বিশ্ব থেকে আসবেন বিদেশি মেহমানরা। আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ মহলও বাংলাদেশে অবস্থান করবে। এমন পেক্ষাপটে খালেদা জিয়া অসুস্থ অবস্থায় কারাগারে মারা গেলে সরকার বেকায়দায় পড়ে যাবে।

মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উৎসব কিছুটা অম্লান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সাবেক সেনাপ্রধানের স্ত্রী ও তিনবারের প্রধানমন্ত্রীর দায়ভার সরকারের ওপর এসে পড়বে।

তাই সরকার চাচ্ছে খালেদা জিয়া শর্ত নিয়ে দেশের বাইরে চলে যাক। আর বিএনপিও এ ইস্যুতে ইতিবাচক বার্তা পেয়ে আবারো আদালতের ওপর আস্থা রাখছেন।

খালেদা জিয়ার প্রসঙ্গ নিয়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনের নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলোর সঙ্গে কথা বলে এমনই জানা গেছে।

বিএনপির হাইকমান্ডের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখনো খালেদা জিয়াকে মুক্তির জন্য বেশ কয়েকটি পথ খোলা রয়েছে। এর মধ্যে দুইপথে খালেদা জিয়া চূড়ান্তভাবে কারাগার থেকে বের হতে পারেন।

প্রথমত. বিএনপি যদি বড় কর্মসূচি দিয়ে সরকারকে ঠেকিয়ে দেয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তাহলে চাপের মধ্যে থেকে সরকার খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিতে বাধ্য হবে।

দ্বিতীয়ত. খালেদা জিয়া যদি মাথানত করে প্যারোলের জন্য আবেদন করেন, তাহলে তিনি মুক্তি পেয়ে যেতে পারেন। এছাড়া মুক্তির জন্য আরও আশা দেখছে দলটি, খালেদা জিয়া সাবেক সেনাপ্রধানের স্ত্রী, সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, তিনি এখন মারাত্মক অসুস্থ জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে।

এমন অবস্থায় মানবিক বিবেচনায় নির্বাহী আদেশে তিনি মুক্তি পেতে পারেন। তবে খালেদা জিয়ার ব্যাপারে এখনো মৌলিক সিদ্ধান্ত আদালতের মাধ্যমে রাখতে চায় সরকার।

শর্তের প্যারোল ছাড়া সরকারের নির্বাহী আদেশে শক্ত অবস্থানে থাকবেন ক্ষমতাসীন দলটির নীতিনির্ধারকরা। বেগম খালেদা জিয়া চরম অসুস্থ হলেও তিনি কোনোভাবেই শর্তে প্যারোলে মুক্তির ব্যাপারে রাজি নন বলে দাবি খালেদা জিয়ার পরিবারের।

খালেদা জিয়ার আইনজীবী ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি জয়নুল আবেদীন বলেছেন, প্যারোলে খালেদা জিয়ার মুক্তির আবেদন করার প্রশ্নই আসে না। তিনি প্যারোলে মুক্তি নেবেন না।

এর আগে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ও বলেছেন, খালেদা জিয়া রাষ্ট্রের কাছে ক্ষমা চেয়ে মুক্তি নেবেন না। তিনি ভেতরে থাকাই উত্তম হবে।

কারণ ‘আপসহীন’ নেত্রী হিসেবে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক অঙ্গনে আলাদা ইমেজ রয়েছে। তিনি ৮৬ সালে স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের সঙ্গে আপস করে নির্বাচনে যাননি। ওয়ান-ইলেভেনের সময়ও কোনো প্রকার ‘সমঝোতা’ করতে রাজি হননি।

জানা গেছে, গত ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়ার কারাবাসের দুই বছর হয়েছে। দীর্ঘ এ সময় বিএনপি বেশ কয়েকবার মুক্তির জন্য আদালতের বারান্দায় দৌড়েছে। হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগে খালেদা জিয়ার জামিন আবেদন নাকচ হয়েছে।

গত সপ্তায় আবারো জামিনের জন্য আবেদন করেন খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা। তার পক্ষে আইনজীবীদের করা আবেদনে বলা হয়েছে চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়া এবার বিদেশ যেতে চান। আজ তার পক্ষে জামিন আবেদনের ওপর শুনানি করবেন আইনজীবী জয়নুল আবেদীন।

তিনি বলেছেন, মানবিক দিক দিয়ে খালেদা জিয়ার জামিন জরুরি। তিনি চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাবেন এটা আদালতে বলা হবে। এই আইনজীবীর প্রত্যাশা খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। তাই আদালত জামিন দেবেন চিকিৎসার জন্য।

আদালতে যাওয়ার আগে এ বিষয়টি নিয়ে পর্দার আড়ালেও আলাচনা হয়েছে। খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে ফোন করেন প্রধানমন্ত্রীকে সুপারিশ করার জন্য।

তবে বিষয়টি নিয়ে তেমন কোনো সমঝোতা আসেনি বলে মনে করছেন অনেকে। এ নিয়ে শুরু হয় রাজনৈতিক বাহাস। বিএনপি মহাসচিব বলেছেন, প্যারোল বিষয়ে কোনো কথা হয়নি। আর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও বলেছেন, ফোন দেয়ার রেকর্ড আছে।

তবে তিনি এ-ও বলেছেন, তাদের (সরকার) দিক থেকে খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে কিছু করার নেই। তবে খালেদা জিয়া যদি প্যারোলে মুক্তি চান তাহলে সরকার বিবেচনা করবে।

এ নিয়ে তথ্যমন্ত্রী বলেছেন, প্যারোল আবেদন করতে হবে তিনি (খালেদা জিয়া) দুর্নীতি করেছেন, অপরাধ করেছেন এটি স্বীকার করে। এ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, এখনো প্যারোল বিষয় নিয়ে সরকারের কাছে আবেদন আসেনি।

গত শুক্রবারও প্রায় ঘণ্টাখানেক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) গিয়ে খালেদা জিয়ে সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন পরিবারের সদস্যরা।

পরে তারা বেরিয়ে এসে জানান, খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ। তাকে বিদেশ নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করাতে চান তারা। এজন্য প্রয়োজনে প্যারোলে হলেও খালেদা জিয়ার মুক্তি চান তারা।

তবে বিএনপির আইনজীবীদের একটি সূত্র আমার সংবাদকে জানিয়েছেন, নিয়ম রক্ষার জন্যই শুধু আবেদন করা হয়েছে। তারা শর্তবিহীন খালেদা জিয়ার মুক্তি চাইবেন বিদেশে নিয়ে গিয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য।

ওই সূত্রটি এ-ও মনে করে, রাস্তায় নেমে আদালতকে চাপ প্রয়োগ ছাড়া খালেদা জিয়ার মুক্তি সম্ভব নয়। খালেদা মুক্তি তখনই সম্ভব হবে যখন সরকার বা আদালত আন্দোলনের কাছে ঠেকে যাবে।

এছাড়া অন্য কোনো পথে সম্ভব নয়। তবে খালেদা জিয়া যদি রাষ্ট্রের কাছে ক্ষমা চান, শর্তের প্যারোলে রাজি থাকেন তাহলে একটা আশা করা যায়, অন্যথায় সম্ভব নয়।

এ নিয়ে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, বিএনপি কয় নম্বর দল হবে সেটা তাদের নিজেদের নির্ধারণ করতে হবে। আমরা ৩০ বছর যাবত আমাদের প্রিয় দল করছি। আজ সেই দলের নেত্রী দুই বছরের অধিক সময় ধরে কারাগারে।

আমরা নীরবে চুপচাপ বসে আছি। কই, রাজপথে তো এর কোনো সংগ্রামী প্রতিবাদী বার্তা আমরা দেখতে পাইনি! তাই তিনি নেতাকর্মীদের নিজ উদ্যোগে রাজপথে নামার আহ্বান জানান।

বিএনপিপন্থি বুদ্ধিজীবী ও গণস্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী আমার সংবাদকে বলেন, বিএনপি যদি খালেদা জিয়ার মুক্তি চায়, তাহলে তাদের উচিত যখন খালেদা জিয়ার জামিন শুনানি হবে তখন দলের হাজার হাজার নেতাকর্মী কমপক্ষে ১০ হাজার লোক যেন রাস্তায় বসে থাকে। চাপ প্রয়োগ ছাড়া খালেদা জিয়া মুক্ত হবে না।

জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, খালেদা জিয়ার জীবনের জন্য এখন সঠিক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। কিন্তু এখনো বিএনপির সময়জ্ঞান নেই। খালেদা জিয়ার জামিন শুনানি পর্যবেক্ষণসহ খারিজ হয়ে যাওয়ার পর পুনরায় রিভিউর জন্য কাগজপত্র উঠাতে তাদের সময় লেগেছে এক মাসেরও বেশি সময়। এটি কেন হবে?

তারা যদি জামিন চায়, তাহলে অবশ্যই সাতদিনের মধ্যে রিভিউ করা উচিত ছিলো। কিন্তু তারা সঠিক সময়ে সঠিক কাজটি করতে পারেনি। খালেদা জিয়ার প্রেসার এখন ১৩-১৪। খালেদা জিয়া যেকোনো মুহূর্তে পুরো অবশ হয়ে যেতে পারেন। এখনো সঠিক সিদ্ধান্ত কেন বিএনপি নিতে পারছে না। কারণ তাদের সিদ্ধান্ত আসে বিলেত থেকে।

তিনি আরও বলেন, রিভিউর আবেদন মুক্তির বিষয়টি আদালতে আর প্যারোলের বিষয়টি সম্পূর্ণ রাষ্ট্রের। কিন্তু যে প্রক্রিয়ায় হোক তার মুক্তি প্রয়োজন।

বিএনপির উচিত আওয়ামীপন্থি আইনজীবী কিংবা ড. কামাল হোসেন, মঈনুল হোসেনকে দাঁড় করানো, সেটিও তারা করছে না।

আমারসংবাদ/এমএআই