রবিবার ১২ জুলাই ২০২০

২৮ আষাঢ় ১৪২৭

ই-পেপার

আমার সংবাদ ডেস্ক

জুন ২৫,২০২০, ০৭:১০

জুন ২৫,২০২০, ০৭:১০

স্বামী বদল করে বিভিন্ন দেশের রানি হয়েছিলেন যে নারী

 

তিনি নিজে ছিলেন একটি দেশের শাসক। এমনকি একের পর এক স্বামী বদলেও হয়েছেন বিভিন্ন দেশের রানি। এছাড়াও রয়েছে তার জীবনের নানা কাহিনী। তিনি আকিতেন এলানোর।

ধারণা করা হয় ১১২৪ সালে আকিতেন এলানোর জন্ম। কিছু ইতিহাসবিদদের মতে তার জন্মস্থান পশ্চিম-মধ্য ফ্রান্সের পোয়েটিয়ায়। এলানোর ছিলেন উইলিয়াম এক্স এবং ডিউকের কন্যা অ্যানোরের সন্তান। অ্যানোরের দাদা উইলিয়াম নবম রাজা হলেও কবি হিসেবে তার সুখ্যাতি ছিল বেশি। তার কবিতা এখনো ইতিহাসের পাতায় বেশ আলোকিত হয়ে আছে। তিনি একদা তার বন্ধুর স্ত্রীকে অপহরণ করেন। এরপর তাকে তার উপপত্নী বানান।

উইলিয়াম নবমের উপপত্নী ছিলেন ডেইঙ্গেরিউস। তিনি রাজাকে বলেন তার ছেলে উইলিয়াম এক্সের সঙ্গে তার মেয়ে অ্যানোরের বিয়ে দিতে। রাজা উইলিয়াম নবম কিছুটা সরলমনা ছিলেন। তিনি ডেইঙ্গেরিউসের কথায় রাজি হয়ে যান। উইলিয়াম এক্স আর অ্যানোরের বিয়ের পর তাদের ঘর আলো করে জন্ম নেয় এলানোর।

১১৩৩ সালের এপ্রিল মাসে এলানোরের বাবা উইলিয়াম এক্স অসুস্থতায় মারা যান। সিংহাসন শূন্য হয়ে পরে। একমাত্র উত্তরাধিকার হিসেবে এলানোর বসেন সিংহাসনে। তখন তার বয়স মাত্র ১৫ বছর। সেসময় অ্যাকুইটাইন ছাড়াও উইলিয়াম পোয়েটিয়ার্স, গ্যাসকনি, লিমোসিন এবং আউভার্গনেও নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন। তার মৃত্যুর পর এলানোর এই সব কিছুর শাসক হন। বলা যায় ফ্রান্সের একটি বিশাল অংশের শাসক এলানোর।

আবার অন্যদিকে এখন এলানোরকে যিনি বিয়ে করবেন তিনিই হবেন এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলটির সহ-শাসক। উইলিয়াম এক্স যখন মৃত্যুশয্যায় ছিলেন তখন তিনি বুঝতে পারেন এলানোর হবেন সব কিছুর উত্তরাধিকারি। অন্যদিকে সে হয়ে পড়বে অভিভাবকহীন। এতে তার রাজ্য শাসনে অসুবিধা হতে পারে। অন্যদিকে এলানোরের নিরাপত্তার কথা ভেবেই তিনি একটি সিদ্ধান্ত নেন। তিনি ফরাসি রাজার পুত্র যে ভবিষ্যতে ফ্রান্সের রাজা হবেন তার সঙ্গে এলানোরের বিয়ে ঠিক করেন।

উইলিয়ামের মৃত্যুর কয়েক বছর পর ১১৩৭ সালে লুইয়ের সঙ্গে বিয়ে হয় এলানোরের। সেসময় ফ্রান্সের পুরো দখলই ছিল তাদের হাতে। এলানোরকে তার শ্বশুর বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য ৫০০ গাড়ি এসেছিল। তবে লুই আর এলানোরের দাম্পত্য জীবন খুব একটা সুখের ছিল না। কিছু না কিছু নিয়ে তাদের সারাক্ষনই ঝগড়া লেগেই থাকত। একজন অন্যজনকে প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবত সবসময়। এলানোর ছিলেন খুবই চঞ্চল প্রকৃতির। আর লুই তার পুরোপুরি বিপরীত। নম্র ভদ্র আর সারাক্ষণ ধর্ম কর্মতেই ব্যস্ত থাকত।

এই সময় লুইয়ের বাবা মৃত্যুশয্যায়। তিনি এতোটাই মোটা ছিলেন যে সারাক্ষণ শুয়েই থাকতেন, উঠে বসে থাকতে পারতেন না। তাদের বিয়ের মাত্র এক সপ্তাহ পরে লুইয়ের বাবা মারা যাওয়ার যান। এরপর লুই রাজা হন। কারণ তার বড় ভাই ফিলিপ ১১৩১ সালে মারা যান। স্বামীর সিংহাসনে আরোহণের পরে এলানোর ফ্রান্সের রানি হয়ে ওঠেন। দাম্পত্য কলহ বা মনের মিল না হলেও বেশ কয়েক বছর তারা সংসার করে। ১১৪০ সালে তাদের মধ্যে কলহ খারাপ দিকে মোড় নেয়। আলাদা থাকতে শুরু করেন তারা ।

১১৪২ সালে এলানোরের বোন পেট্রনিল্লা ফ্রান্সের আদালতে আমন্ত্রিত হন। সেখানে ভেরমানডোইসের কাউন্টেরে তার দেখা হয় রাউল প্রথমের সঙ্গে। একজন অন্যজনের প্রেমে পড়েন। তবে রাউল প্রথম তখন বিবাহিত। পেট্রনিল্লাকে বিয়ে করার জন্য তিনি তার স্ত্রীর সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেন। তবে রাউলের স্ত্রী ছিলেন চ্যাম্পেয়ের এলিয়েনর। তিনি রাজা থিওবাল্ডের বোন।

তারা রাউলকে কখনোই রানির বোনকে বিয়ে করতে দিবে না। তাই নানা ষড়যন্ত্র করতে থাকে। এদিকে এলানোর ততক্ষণে রাজা লুইকে এই বিয়েতে রাজি করিয়ে ফেলেছেন। থিওবাল্ডের সঙ্গে রাউলের যুদ্ধ লেগে যায়। সেই যুদ্ধ স্থায়ী হয় দুই বছর। থিওবাল্ডের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে শেষ হয় সে যুদ্ধ। তবে এই যুদ্ধের বেশ খানিকটা প্রভাব পরে রাজা লুইয়ের উপর। অনেকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন তিনি।

১১৪৩ সালে রাজা লুই পাশের এক ছোট্ট শহর ভিট্রি-এন-পার্থোইস হামলার নেতৃত্ব দেন। শহরটি পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল এবং প্রায় ১৫০০ জন বাসিন্দা প্রাণ হারায়। এর মধ্যে অনেকেই গির্জার আশ্রয় নিয়েছিল। তাদেরও শেষ রক্ষা হয়নি। এরপর অবশ্য লুই তার কর্মের জন্য অত্যন্ত অনুশোচনা বোধ করতেন। তিনি তার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করার জন্য ক্রুসেডে যাওয়ার শপথ নিলেন।

১১৪৭ সালে দ্বিতীয় ক্রুসেড মুসলিম এডেসা কাউন্টি পতন করেন। এই অভিযানেও তিনি অন্যতম নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই সময় এলানোরও অভিযানে স্বামীর সঙ্গে ছিলেন। এই জন্য ধারণা করা হয় ফরাসি বাহিনীর বেশিরভাগ অংশ অ্যাকুইটাইন থেকে এসেছে। যারা ছিল রাজা লুইয়ের সেনাবাহিনী। ১১৫০ সালে ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে এই অভিযান শেষ হয়। এজন্য লুই এলানোরকে দায়ী করেন।

অনেকে বলেন, এলানোর ৩০০ নারী সৈন্য নিয়ে এই অভিযানে যোগ দিয়েছিলেন। সেসময় এলানোরের চাচা পাইটার্সের রেমন্ড তার সঙ্গে দেখা করতে আসেন। সঙ্গে ছিল আন্টিওকের যুবরাজ। কথিত আছে, তারা নাকি দুজনেই প্রেমে পড়েন সেদিনই। অবৈধ্য সম্পর্কে জড়িয়ে যান দুইজন। এরপর নানা মতবিরোধের সৃষ্টি হয় লুই আর এলানোরের মাঝে। এলানোরকে বিবাহ বিচ্ছেদের হুমকিও দেন লুই।

এই অভিযান শেষ হওয়ার আগের বছর অর্থাৎ ১১৪৯ সালেই তারা ফ্রান্সে ফিরে এসেছিলেন। যুদ্ধের পরাজয় রাজা লুই আর রানি এলানোরের সম্পর্কের অবনতি ঘটায়। অবশেষে ১১৫২ সালে আদালতে গিয়ে তারা বিবাহ বিচ্ছেদ করেন। এসময় তাদের দুই কন্যা ছিল। তারা রাজা লুইয়ের সঙ্গেই থেকে যায়। এরপর রানিকে পাওয়ার জন্য মোতামুটি লাইন লেগে যায় বিভিন্ন দেশের রাজা এবং যুবরাজদের।

এরই মধ্যে থিওবাল্ড পঞ্চম তো রানিকে অপহরণের পরিকল্পনাও করে ফেলে। তবে এসবের কিছুরি সুযোগ দেননি রানি। বিবাহ বিচ্ছেদের মাত্র দুই মাস পরই তিনি রাজা হেনরিকে বিয়ে করেন। রাজা হেনরি ছিলেন ইংল্যান্ডের শাসক। হেনরি ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় রাজার মুকুট পান ১১৫৩ সালে। আর এলানোর হয়ে যান ইংল্যান্ডের রানি।

রাজা হেনরি এবং রানি এলানোর একসঙ্গে বেশ শক্তিশালী হয়ে উঠেছিলেন। ফ্রান্স ছাড়াও এই দম্পতির আধিপত্য এখন ইংল্যান্ড, নরম্যান্ডি এবং আনজুক ও। ১১৫৩ থেকে ১১৬৬ সালের মধ্যে এই দম্পতির আটটি সন্তান হয়। যার মধ্যে পাঁচজন ছেলে আর তিনজন মেয়ে। এর মধ্যে বড় ছেলে শৈশবে আর বাকিরা একটু বড় হয়ে মারা যায়। এতে করে রাজা হেনরি একদিকে নিশ্চিত ছিলেন। তার সিংহাসনের কোনো উত্তরাধিকার রইল না। নিশ্চিন্তে রাজত্ব চালাতে থাকেন হেনরি।

এলানোর খুবই সৌখিন নারী ছিলেন। কবিতা, গান, লেখালেখি সব কিছুতেই সেরা ছিলেন তিনি। তার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে অনেক লেখক তার নামে তাদের রচনা উৎসর্গ করতেন। মনে মনে তাকে অনেকেই ভালোবাসতেন। তবে তা জানানোর বা প্রকাশ করার সাহস কারো ছিল না। এতে করে হেনরির সঙ্গে দূরত্ব বাড়তে থাকে এলানোরের। কয়েক বছর পর এলানোর তার রাজ্যে ফিরে আসেন। সেসময় তার হেনরির সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যায়।

এলানোর তার সঙ্গে তার ছোট দুই ছেলে রিচার্ড এবং জেফ্রিকে নিয়ে আসেন। রিচার্ড এবং জেফ্রি তার পিতাকে সিংহাসনচ্যুত করার পরিকল্পনা করে। এতে সমর্থন দেয় রাজকুমার অ্যাকাইটেইন। এলানোরও এই বিদ্রোহে সাই দিয়েছিলেন। বিদ্রোহটি ব্যর্থ হয়। ধরা পড়েন রানি। হেনরি রানিকে বন্দী করার আদেশ দেন।

এলানোরের কারাবাস শেষ হয় ১১৯৮ সালে। যখন তার স্বামী হেনরি মারা যান। নতুন রাজা হন রিচার্ড প্রথম (রিচার্ড দ্য লায়নহার্ট নামেও পরিচিত) এলেনোর প্রিয় পুত্র। রিচার্ড সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এলানোরের রাজনৈতিক শক্তি আগের চেয়ে দ্বিগুণ বৃদ্ধি পায়। রিচার্ড অভিযানে থাকাকালীন এলানোর রাজ্য পরিচালনা করতেন। অভিযান থেকে ফেরার পথে রিচার্ড অস্ট্রিয়ার ডিউকের হাতে ধরা পড়েন।ছেলেকে বাঁচাতে মোটা অংকের মুক্তিপণ সংগ্রহ করেছিলেন রানি। তবে ছেলেকে বাঁচাতে পারেন নি তিনি। বন্দী অবস্থায় ১১৯৯ সালে মারা যায় রিচার্ড। এরপর রানির দ্বিতীয় ছেলে জেফ্রিক রাজা হন। ততদিনে রানি ৮০ বছরের বৃদ্ধা। তবুও ছেলেকে রাজ্য পরিচালনার নানা পরামর্শ দিতেন। রাজ্যের প্রসাশনিক বিভিন্ন কাজের দায়িত্ব নিজেই পালন করতেন।

১২০৪ সালে অ্যাকুইটেনে রানি এলানোর মারা যান। তাকে তার স্বামী হেনরি এবং পুত্র রিচার্ডের পাশে সমাধিস্থ করা হয়। মধ্যযুগের অন্যতম একজন নারী ছিলেন এই এলানোর। তার জীবনী নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা গল্প, নাটক, সিনেমা। ১৯৬৮ সালের সর্বাধিক বিখ্যাত চলচ্চিত্র দ্য লায়ন ইন উইন্টার মুক্তি পায়। বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল এটি তখন। সেখানে রানির চরিত্রে অভিনয় করেন আমেরিকান অভিনেত্রী ক্যাথারিন হেপবার্ন। অ্যাসাইন্টঅরিজিন

আমারসংবাদ/জেআই