সোমবার ২৫ মে ২০২০

১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

ই-পেপার

মে ২২,২০২০, ০৮:১৭

মে ২২,২০২০, ১০:৩০

একটি বিদ্যালয় এবং আমার বদলে যাওয়ার কারণ

বাড়ি থেকে আমার স্কুলের দূরত্ব ৪-৫ কিলোমিটার। তাই হেটে যাওয়ার সাহস না করে প্রথম দিন স্কুলে যাওয়ার জন্য বন্ধু আনিসের সাইকেল ধার করলাম। আমার অনুযায়ী সাইকেলটি বড় হলেও না নেয়ারা উপায় নেই। স্কুলে তো যেতেই হবে। তাই এই সাইকেলটি ছাড়া স্কুলে যাওয়ার কোনো গতি নেই।

প্রথম দিন স্কুলে গেলাম। ক্লাস করলাম। অতঃপর ছুটি হলো। সাইকেলে করে বাড়িতে রওনা হবো তখনি দেখি আমার সাইকেলের বল টিউব খুলে কে বা কারা যেন নিয়ে গেছে। এটা দেখে ভীষণ মন খারাপ হয়ে গেলো। বাড়ির থেকে এত দূরের স্কুল তাই বন্ধু বা পরিচিত বলেও কেউ নেই।

যাই হোক মন খারাপ করে হাওয়া ছাড়া সাইকেল চালিয়েই বাড়িতে রওনা হলাম। ২০১১ সালে এটাই ছিলো নাগেরপাড়া বহুমূখী উচ্চবিদ্যালয়ের কারিগরি শাখার প্রথম দিনে আমার ক্লাস করার অভিজ্ঞতা।

বন্ধু-বান্ধব না থাকলেও প্রথম দিনেই স্কুল দেখে আমার মন ভলে গেলো। এত শিক্ষার্থী আর এত বড় সবুজের ক্যানভাস দেখে তখন মনে হলো এত সুন্দর স্কুলও কি হতে পারে!

মাঠে সবুজ ঘাস, ছেলে-মেয়েদের গায়ে স্কুল ড্রেস দেখে স্কুলটাকে আমার ফুলের একটা বাগান মনে হলো। কত সুন্দর পরিবেশ, স্মার্ট সব শিক্ষক-শিক্ষিকা সব মিলিয়ে এই স্কুল আমাকে সুন্দর একটি পৃথিবী উপহার দিলো। আমার এলাকা থেকে ক্লাসের সঙ্গী হিসেবে রনিকে পেয়েছিলাম। বড় ভাইয়ের কিনে দেয়া নতুন সাইকেলে করে বন্ধু রনির সাথে স্কুল জীবন শুরু।

যাই হোক জানুয়ারিতে স্কুলে ভর্তি হওয়ার কয়েক মাস পরেই স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া অনুষ্ঠান। সব শিক্ষক-শিক্ষার্থী মিলে অনুষ্ঠানের সার্বিক প্রস্তুতি শুরু করে দিলো। গ্রুপ ভাগ করা, কে কোন ইভেন্টে নাম দিবে।

তখন একজন শিক্ষার্থী মাঠে আর স্টেজে তিনটি করে মোট ছয়টি প্রতিযোগিতায় নাম দিতে পারতো। আমি তেমন কিছু না বুঝেই মাঠে তিনটি আর স্টেজে তিনটি নাম দিয়ে দিলাম।

অনুষ্ঠানের প্রথম দিন রোদের মধ্যে জাতীয় সংগীত আর অ্যাসেম্বলি করে করে ক্লান্ত হবার অবস্থা। ক্লান্ত হলেও মনে জোর ছিলো নতুন স্কুল বলে কথা।

দুপুরের পরে আমার প্রথম খেলা ১০০ মিটার দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করি। সেখানে আমি নতুন স্কুলে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে প্রথম পুরস্কার পাই। তারপরের দিন মাঠের আরো দুটো খেলায় প্রথম এবং দ্বিতীয় স্থান অর্জন করি।

তারপরের দিন স্টেজের প্রতিযোগিতা শুরু। এবার ছেলে-মেয়েদের একসাথে লড়তে হবে। সিরিয়ালে আমি কয়েকজনের পরে দেশের গান গাই ‘হৃদয়ে আমার বাংলাদেশ’ গাইলাম।

তখনকার সময়ে এত আধুনিক গান কেউ গাইতো না বললেই চলে। আমি শুরুতে ভেবেছিলাম কোনো পুরস্কার পাবো না তারপর দেখি আমাকেই প্রথম বলে নাম ঘোষণা করা হলো।

তারপর স্টেজে আরো একটি পুরস্কার পাই। সব মিলিয়ে এখন হলো পাঁচটি। তখন ভলান্টিয়ারদেরও একটি করে পুরস্কার দেয়া হতো।

সে বছর আমি মোট ছয়টি পুরস্কার অর্জন করি। অনুষ্ঠান শেষে স্যারদের থেকে টাকা তুলে রাতে পিকনিক। মনে হলো সেই রাতে স্কুল মাঠে স্বর্গ নেমে এসেছে।

বার্ষিক ক্রীড়া অনুষ্ঠান শেষ। এখন আমার বন্ধুর অভাব নেই। এত এত পুরস্কার পাওয়ায় এখন সবার কাছে বেশ কদর আমার। যে কোন খেলায় আমার নাম থাকতো। থানা পর্যায়ে ফুটবল খেলায়ও স্কুলের হয়ে ফুটবলের গোলপোস্ট সামলেছি। আর ক্রিকেট তাতো বলার অপেক্ষা রাখেনা।

এরপর শুরু হলো খেলাপড়ার চাপ। শিক্ষকরা ক্লাস করাতো বিকাল ৪টা পর্যন্ত। দুপুরে খাওয়ার জন্য মাঝে মাঝে চাচাতো বোনের বাসায় যেতাম। বা মাঝে মাঝে দোকান থেকে সিঙ্গারা দিয়েই দিন পার করে দিতাম।

মাদ্রাসা থেকে এই স্কুলে আসার কারণে আমাদের হুজুর স্যার আমাকে দিয়ে মাঝে মাঝে আযান দেয়াতো। ফাকি দেয়ার চেষ্টা করলেও ফাকি দিতে পারতামনা। হুজুর স্যার আমাকে ভীষণ পছন্দ করতো।

কিছু কারণে আমার ইংরেজী শিক্ষক শহিদুল স্যারের সাথে বেশ ভালো সম্পর্ক গড়ে ওঠে। দূর থেকে আমাকে দেখলে স্যার এখন হেসে দেয়।

বিশেষ করে আমি স্কুল ড্রেস শার্ট পরলেও প্যান্ট পরতামনা তাই বার বার স্যার আমাকে খুঁজতেন আমি ফুল ড্রেস পরেছি কিনা। এটার জন্য সাক্ষি থাকতো সোহান আর লিখন ভাই।

যখন ক্লাস করতাম তখন পছন্দের বেঞ্চে বসার জন্য কতইনা যুদ্ধ করতাম। সাদা ড্রেসে কালো কালির দাগ বসিয়ে কতইনা মজা করতাম।

কিন্তু যখনি অংক স্যার রুমে ডুকতো তখন মাত্র কয়েকজন ছাড়া সবাই ভয়ে কাপতে থাকতাম। কারণ আমরা অংক তেমন ভালো ছিলাম না।

আবার পরের ক্লাসে যখন মোসলেম আলী স্যার আসতো তখন আবার আনন্দে সবার মন ভরে যেতো। এভাবে সুখ-দুঃখে কেটে গেলো নবম শ্রেণীর বছর।

আমি বড়দের বরাবর সম্মান করে চলি। আর আমার এই গুণ স্কুলে আমাকে খুব অল্প সময়ের মধ্যে পরিচিত করে ফেলে। এ কারণেই হয়তো স্কুলের সব শিক্ষক আমাকে স্নেহ করতেন। শিক্ষক আর বন্ধুদের স্নেহ-ভালোবাসায় আমার স্কুলল জীবন হয়ে উঠেছিল আনন্দের ও গৌরবময়।

দ্বিতীয় বছরের স্কুলের বার্ষিক পুরস্কার বিতরণী উৎসবের আয়োজন ছিল আমার জন্য বেশ আনন্দের। সারাবছর এই দিনটার জন্য অপেক্ষা করতাম।

সেদিনটা হৈ-হুল্লোড়, আনন্দ-কোলাহল, আমোদ-কৌতুকে কেটে যেত। এ দিনে বার্ষিক পরীক্ষায় ভালো ফলাফল ও নানা প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের পুরস্কার দেয়া হতো। আমি ভালো ফলের জন্য পুরস্কার না পেলেও ভালো আচরণ ও নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকার জন্য পুরস্কার পেতাম।

পরের বছর (২০১২) বার্ষিক ক্রীড়া অনুষ্ঠানেও আমি ৬টি পুরস্কার পাই। এর মধ্যে চারটিতে প্রথম একটিতে দ্বিতীয় এবং একটিতে তৃতীয় হই।

চলতি বছর আমার ফাইনাল বছর তাই পড়ালেখায়ও একটু চাপ। ক্লাসের ফাকে স্কুলের পাঠাগারেও সময় কাটাতাম আর মহিউদ্দিন স্যার, মনির স্যারের ক্লাস করতাম।

এমনও অনেক দিন গেলে বন্ধুদের সাথে দেখা করতে রাতের বেলায় সাইকেল নিয়ে চলে এসেছি স্কুলে। বন্ধুদের জন্য অদ্ভূত এক টান ছিলো তখন। ফাইনাল পরিক্ষার তারিখ পরে গেলো।

বাড়ি থেকে কেন্দ্রের দূরত্ব ২০ কিলোমিটার। চার বন্ধু মিলে একটা ভ্যান রিজার্ভ করলাম পুরো পরীক্ষার জন্য। ভ্যানে করে পরিক্ষা দিতে যেতাম আর বাসায় আসতাম। দারুণ এক সুখ স্মৃতি সেটি। পরীক্ষা শেষে প্রতিদিন নির্দিষ্ট স্থানে সিঙ্গারা পার্টি। শেষ মেষ ভালো একটা রেজাল্ট নিয়েই স্কুল জীবন শেষ করেছি।

এই স্কুল আমার জীবনকে নতুন ভাবে সাজিয়েছে। নেতৃত্ব দেয়ার সাহস যুগিয়েছে। আমার জীবনকে বদলে দিয়েছে। স্কুলের পরিবেশ আমাকে মুগ্ধ করেছে। আমার বিশ্বাস আমার মত প্রতিটি শিক্ষার্থীর জীবনই বদলে দিয়েছে এই স্কুলটি।

শিক্ষাকদের নম্রতা, সঠিক শিক্ষা দান, নেতৃত্ব দেয়ার সাহস যোগানো, সব কিছুতেই প্রথম হওয়ার অনুপ্রেরণা দেয়া, ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা সব কিছুই আমাকে শিখিয়েছে এই স্কুল।

আমার স্মৃতিগুলো অতীতকে জীবন্ত করে বর্তমানকে ভুলিয়ে দিতে চায়। ভালো লাগে অতীতের স্মৃতিচারণ করতে। স্মৃতির যে অধ্যায়টি আমার কাছে সবচেয়ে সুখের তা হলো আমার এই স্কুল জীবন আর শৈশব।

আজ থেকে আট বছর আগে স্কুলল পার করে এসেছি। তারপরও সেসব স্মৃতি আমার জীবনের অনেকখানি জায়গা জুড়ে আছে। আমার দূরন্ত শৈশব আর স্কুলের কথা মনে পড়লে মাঝে মাঝে মনে হয় কেন বড় হলাম। ছোট থাকাই ভালো ছিল।

করোনাভাইরাসের মধ্যে বাসায় বসে বসে অফিসের কাজের ফাকে প্রিয় জিনিসগুলো মনে পরছে খুব। তারমধ্যে স্কুলটাও। প্রিয় জিনিসকে নিয়ে কার না লিখতে ভালো লাগে বলেন।

বাসায় অবসর সময়ে কল্পনাতে স্কুলের বারান্দায় হাটি, কলপারে গিয়ে পানি খাই, গাছের ছায়ায় বসে থাকি, বিশাল সবুজ মাঠে শুয়ে থাকি আরো কত কি।

করোনার দিনগুলো প্রিয় স্কুলটাকে আবারো সামনে এনে দিলো। ভালোবাসার দুটি বছর কল্পনা করেই কাটছে দিন। আবার যদি ফিরে পেতাম সেই স্যারদের স্নেহমাখা ভালোবাসা।

আবার যদি ফিরে পেতাম স্কুল মাঠে তারুণ্য দেখানোর সুযোগ। আবার যদি ফিরে পেতাম ক্লাস রুমে যাওয়ার স্বাধীনতা। আবার যদি ফিরে পেতাম সেই ১২টি পুরস্কার পেয়ে স্কুল চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জীবন।

লেখক
রাজিবুল ইসলাম
সাংবাদিক ও সাবেক  শিক্ষার্থী (নাগেরপাড়া বহুমূখী উচ্চ বিদ্যালয়)

আমারসংবাদ/এআই