বুধবার ০৩ জুন ২০২০

২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

ই-পেপার

রাবি প্রতিনিধি

মার্চ ২৮,২০২০, ০২:৫৪

মার্চ ২৮,২০২০, ০২:৫৫

কান ধরিয়ে দাঁড় করিয়ে সাজা, ফেসবুকে নিন্দার ঝড়

যশোরের মনিরামপুর উপজেলার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাইয়েমা হাসান। বেশ আলোচিত ও সমালোচিত একটি নাম।

করোনাভাইরাস মোকাবিলায় লোকসমাগম না করতে উপজেলার বিভিন্ন স্থানে সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাইয়েমা হাসানের নেতৃত্বে শুক্রবার (২৭ মার্চ) বিকেল থেকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযান চালানো হয়।

ওইদিন বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে মনিরামপুর উপজেলার চিনাটোলা বাজারে অভিযানের সময় ভ্রাম্যমাণ আদালতের সামনে পড়েন প্রথমে দুই বৃদ্ধ।

এর মধ্যে একজন বাইসাইকেল চালিয়ে আসছিলেন। অন্যজন রাস্তার পাশে বসে কাঁচা তরকারি বিক্রি করছিলেন। কিন্তু তাদের মুখে মাস্ক ছিল না।

এসময় পুলিশ ওই দুই বৃদ্ধকে ভ্রাম্যমাণ আদালতে হাজির করলে নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট সাইয়েমা হাসান শাস্তি হিসেবে তাদেরকে কান ধরিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখেন।

শুধু তাই নয়, এসময় নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট নিজেই তার মোবাইল ফোনে এ চিত্র ধারণ করেন। এছাড়াও পরবর্তীতে ভ্রাম্যমাণ আদালত আরও একজন ভ্যান চলককে একইভাবে কান ধারিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখেন।

রাতে এ ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সমালোচনার শুরু হয়।বিষয়টিকে দুঃখজনক ও অনভিপ্রেত আখ্যা দিয়ে ছবিটি ভাইরাল করেছেন দেশের বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষ।

এ বিষয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আবু সাঈদ মো. নাজমুল হায়দার সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে তার প্রতিক্রিয়ায় তিনি লিখেছেন, 'সম্মানিত সহকারী কমিশনার ভদ্রমহিলার বাবা কি আছেন? এমন 'নীচু মানসিকতার' কাজ করানোর সময় নিজের বাবার চেহারাটাও কি একবার চোখে ভাসেনি তাঁর! ছিঃ এ লজ্জা কোথায় রাখি! একজন পাবলিক সার্ভেন্ট এর এহেন হীন কর্মকান্ডের তীব্র নিন্দা জানাই এবং শাস্তি দাবি করি।'

ভাইরাল হওয়া ছবিটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে লিখেছেন বহুল প্রচারিত দৈনিক 'বাংলাদেশ প্রতিদিন'র সম্পাদক নঈম নিজাম।

তিনি তাঁর ফেসবুক টাইমলাইনে লিখেছেন, 'নিরীহ একজন খেটে খাওয়া মানুষ কেন বাড়ি থেকে বের হয় এই সময়ে? তারও মন চায় আইন মানতে।

কিন্তু সন্তান, পরিবার না খেয়ে থাকতে দেখে জীবনের তাগিদে তাদের বের হতে হয়। কেউ বের হন দুই মুটো চাল কিনতে। কেউ জীবিকার সন্ধানে। আপনি সচেতন একজন কর্মকর্তা। ওদেরকে পারলে রাষ্ট্রীয় খাত থেকে সহায়তা করুন। জন প্রতিনিধিকে জানান সহায়তার জন্য।

গরীবদের জন্য সরকারের অনেক খাত আছে। জন প্রতিনিধি কিংবা আপনি না পারলে ওদের বুঝিয়ে বলুন ঘরে থাকতে। প্লিজ নির্দয়ভাবে পিঠাবেন না। বয়স্ক মানুষদের কানে ধরাবেন না। এই বিপদে যেভাবে পারেন সবাই সবার সাথে থাকুন। মনে রাখুন বাবার বয়সি এই মানুষদের সংসার আছে।'

অনেকে আবার এ প্রশ্নও তুলছেন, নীচু মানসিকতার' কাজ করানোর সময় নিজের বাবার চেহারাটাও কি একবার চোখে ভাসেনি তাঁর! সারাদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের রিডিংরুমে পড়া থাকা মানুষ গুলোর চাকরি হলে যা হয়, না বুঝে বাহিরের পরিবেশ, না বুঝে ভালো করে আইন। শুধু মুখস্থ বিদ্যা দিয়ে বিসিএস ক্যাডার।

এদিকে এমন আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. ফরিদ উদ্দিন সহ অনেকেই ফেসবুকে তাঁদের নিজেদের কানে ধরা ছবি তুলে আপলোড করে নিরব প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

সাংবাদিক রফিকুল ইসলাম রনি দুটি ছবি পোস্ট করে তাঁর ফেসবুক টাইমলাইনে লিখেছেন, 'দুটো ছবিই যশোরের মনিরামপুরের। দুইজন ই নারী। মায়ের জাত। একজন জনপ্রতিনিধি আরেকজন প্রজাতন্ত্রের চাকর।

উপজেলা চেয়ারম্যান জনাব নাজমা খানম খাদ্য সামগ্রী নিয়ে অসহায় মানুষের পাশে। চেষ্টা করছেন কেউ যেন অনাহারে না থাকে। আরেকজন প্রজাতন্ত্রের চাকর আফায় পেটে ক্ষুধা নিবারনে ভ্যান চালাতে আসা বৃদ্ধ এবং সবজি বিক্রি করতে আসা দুই বৃদ্ধকে কান ধরিয়ে রাখলেন। শুধু কি তাই কানধরা বাবার বয়সী মানুষগুলোর ছবিও তুললেন নিজের ক্যামেরায়।পার্থক্য মানসিকতার।'

বাংলাদেশ সাধারন ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহবায়ক মুহাম্মদ রাশেদ খাঁন লিখেছেন, '৩৪ তম বিসিএস, প্রশাসন ক্যাডারে ৪র্থ! তার একটা হেডম আছে না?সেই হেডম থেকে বৃদ্ধকে কান ধরিয়ে দাঁড় করে রাখার ছবি তিনি সরকারি ওয়েবসাইটে দিয়েছেন!'

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মত প্রকাশ করে মাসুম রেজা লিখেছেন, 'বিসিএস ক্যাডারের একবার ভাবা উচিৎ ছিলো এই গরীব মানুষ গুলোর টাকাই সরকার তাকে বেতন দেন। উনার টাকাই এই অসহায় মানুষ গুলো চলেন না। বেয়াদপির একটা সিমা থাকা দরকার।'

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) এর সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী ছবি গুলো ব্লার করে তাঁর টাইমলাইনে লিখেছেন, 'দুর্জন বিদ্বান হলেও পরিত্যাজ্য! জনগণের সেবা করার পবিত্র দায়িত্ব নিয়ে বাবার বয়েসী মুরুব্বিদের সাথে এমন ধৃষ্টতাপূর্ণ আচরণ কোনভাবে, কোন অজুহাতেই গ্রহণযোগ্য নয়! আপনাকে এমন অসাংবিধানিক, বেআইনী সাজা দেয়ার এখতিয়ার কে দিয়েছে?

আপনি যদি পরিবার থেকে প্রকৃত শিক্ষা পেতেন, আপনার যদি মনুষ্যত্ব বোধ থাকতো, তাহলে এভাবে অপমান অপদস্ত না করে, তাদের বর্তমান পরিস্থিতি বুঝিয়ে নিজ খরচে মাস্ক, সাবান, স্যানিটাইজার কিনে দিতেন।

ছিঃ ছিঃ লজ্জা! একমণ দুধে একফোঁটা গো-মূত্রের মতো আপনি আপনার পুরো ডিপার্টমেন্টকেই ছোট করেছেন।

মাননীয় জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী, শ্রদ্ধেয় Farhad Hossain MP মহোদয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, অনতিবিলম্বে সাইয়েমা হাসান, যশোর মনিরামপুর উপজেলার এই বেয়াদব এসিল্যান্ডকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হোক এবং তাকে ওই বয়োবৃদ্ধ মানুষগুলোর বাড়িতে গিয়ে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করা হোক।ভবিষ্যতে আর কোন সরকারি কর্মচারী যেন জনগণের সাথে এমন ধৃষ্টতাপূর্ণ, গর্হিত আচরণ করার দুঃসাহস না দেখায়।'

আমারসংবাদ/এআই