বুধবার ০১ এপ্রিল ২০২০

১৮ চৈত্র ১৪২৬

ই-পেপার

গবি প্রতিনিধি

মার্চ ২৩,২০২০, ০১:৪২

মার্চ ২৩,২০২০, ০১:৪২

ছাত্র সংসদের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ হলো শিক্ষার্থীরা। ক্যাম্পাসে অধ্যয়নকালীন সময়ে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন নায্য দাবি দাওয়া থাকে। তাদের এসব চাহিদা পূরণের জন্য বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব সংগঠন চালু রয়েছে তার মধ্যে ছাত্র সংসদ অন্যতম। যৌক্তিক দাবি আদায়ে ছাত্র সংসদের বহু গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস রয়েছে। প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংসদ চালু ছিল এক ঐতিহাসিক ঘটনা।

সরকারি বেশকিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকলেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ অনুপস্থিত ছিল। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে এবং ক্যাম্পাসে দলীয় রাজনীতির পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের সুস্থ ধারার রাজনীতি চর্চায় ২০১৩ সালে সাভারের গণ বিশ্ববিদ্যালয়ে (গবি) ছাত্র সংসদ চালু করা হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে শিক্ষার্থীদের নানা যৌক্তিক দাবি সহ বিভিন্ন ইস্যুতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে সংগঠনটি। তবে বর্তমানে তাদের কার্যকারিতা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠছে।

২০১৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তৃতীয় কমিটির নির্বাচনের কয়েকমাস পর রহস্যজনক কারণে ছাত্র সংসদ ৮ মাস বন্ধ রাখা হয়। এরপর আরো কিছু সময় পেরিয়ে নির্বাচনের প্রায় ১৯ মাস পর ২০১৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ হয় তাদের। অথচ তখন তাদের মেয়াদের বাকি ছিল আর ৫ মাস। প্রশ্নটি উঠতে শুরু করে তখন থেকেই।

একাধিক শিক্ষার্থী অভিযোগ করে বলেন, প্রতিবার সেমিষ্টার ফি থেকে ছাত্র সংসদের নামে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা রাখা হচ্ছে। তাদেরকে যদি কাজ করার সুযোগই না দেয়া হয়, তাহলে এ প্রহসনের মানে কি? শিক্ষার্থীদের জন্য গঠিত ছাত্র সংসদ যদি আমাদের কাজেই না আসে তাহলে এটা থাকার কোনো দরকার আছে বলে মনে করি না।

চলতি সংসদের শপথের পূর্বে গতবছর এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত প্রায় ৬৮ দিন বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈধ উপাচার্যের দাবিতে আন্দোলন চলে। গণ বিশ্ববিদ্যালয় সাধারণ ছাত্র পরিষদের নেতৃত্বে শিক্ষার্থীরা এতে অংশ নেন। এ আন্দোলনে ছাত্র সংসদ পরোক্ষভাবে সমর্থন করলেও স্বশরীরে উপস্থিত হননি।

এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে সাধারণ ছাত্র পরিষদের সভাপতি রনি আহমেদ বলেন, 'আমি মনে করি যে লক্ষ্য, উদ্দেশ্য নিয়ে ছাত্র সংসদ প্রতিষ্ঠা হয়েছিল, তারা সেটার মধ্যে নেই। তারা শিক্ষার্থীদের ভোটে নির্বাচিত কিন্তু তাদের পক্ষে কথা না বলে প্রশাসনের সাথে আঁতাত করে চলে। বিগত সময়ে শিক্ষার্থীদের প্রাণের দাবি বৈধ উপাচার্যের আন্দোলনে তারা সশরীরে অংশগ্রহণ করেনি, যদিও সমর্থন করেছিল। আমরা অনেক সময় বিভিন্ন দাবিতে প্রশাসনের উপর চাপ প্রয়োগ করি, সেখানে তারা প্রশাসনের পক্ষ নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করে।'

বর্তমান সংসদকে অযোগ্য অ্যাখায়িত করে তিনি আরো বলেন, 'ছাত্র সংসদ যদি কাজ করতো তাহলে ছাত্র পরিষদের দরকার হতো না। সংসদ বেশিরভাগ সময় তালাবদ্ধ থাকে এবং সেখানে গানবাজনা হয়। সংসদের ভিপি, জিএস নিজেদের ব্যক্তিগত কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে। এভাবে তারা যখন অযোগ্য প্রমাণিত হয়েছে, তখন অ্যালামনাই এসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে ছাত্র পরিষদ গঠন করে দিয়েছে। এই কমিটিতে ছাত্র সংসদের ভিপিও স্বাক্ষর করেছে এবং স্বীকার করেছে, আমি কাজ করতে পারিনা। তোদের উপর দায়িত্ব দিলাম, তোরা কাজ করবি। এমতাবস্থায় যেহেতু তারা অকার্যকর, সুতরাং ছাত্র সংসদ না থাকাই ভালো।'

তবে ছাত্র সংসদের অকার্যকারিতার ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করেন ডিবেটিং সোসাইটির আহ্বায়ক শেখ খোদারনুর রনি। তিনি বলেন, 'প্রশাসন আসলে ছাত্র সংসদকে ব্র্যাকেটের মধ্যে আটকে রেখেছে। তাদের হাতে সেই অর্থে ক্ষমতা দিতে পারেনি প্রশাসন। শিক্ষার্থীদের পক্ষে কাজ করতে পাশে থাকতে হলে তাদেরকে অবশ্যই একাডেমিক কাউন্সিল, সিন্ডিকেট সদস্যদের মিটিংয়ে এক্সেস থাকতে হবে, যেটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দৃশ্যমান। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সংসদের নেতৃবৃন্দ কোনো মতামত দিতে পারছে না এবং শিক্ষার্থীদের দাবি-দাওয়া নিয়ে কথা বলতে পারছে না।'

ছাত্র সংসদকে সচল এবং কার্যকর রাখতে একটি সুস্পষ্ট গঠনতন্ত্র প্রয়োজন। এ বিষয়েও ঘাটতি রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, গঠনতন্ত্রে সভা এবং অধিবেশনের বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো বিধান নাই। কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ থেকে শুরু করে বিভাগীয় প্রতিনিধিদের দায়িত্ব, কর্তব্য সম্পর্কে স্পষ্ট উল্লেখ নাই। ডাকসুর গঠনতন্ত্র দেখলে এ বিষয়গুলো স্পষ্ট হয়ে যাবে। এছাড়া গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, সংসদের মেয়াদ হবে দুই বছর। কিন্তু সেটা শপথ গ্রহণের পর নাকি নির্বাচনের তারিখ হতে কার্যকর হবে, সে বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশনা নাই।'

এতসব ঘাটতি লক্ষ্যণীয় হলেও সচেতন শিক্ষার্থীরা সংসদকে বন্ধ না করে নতুনরূপে ঢেলে সাজানোর পক্ষে মত দেন। ক্যাম্পাসে ছাত্র সংসদ থাকার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তারা বলেন, এটা হলো শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবি বা নায্য অধিকার আদায়ের অন্যতম মাধ্যম। ক্যাম্পাসে ছাত্র সংসদ না থাকলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনগুলো মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। কিন্তু সংসদ থাকলে সেখানে দলমত নির্বিশেষে সকল শিক্ষার্থীরা সেখানে যেতে পারে এবং নিজ নিজ দাবি বা অধিকারের কথা বলতে পারে। এভাবে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার গুণগত মান বৃদ্ধি তথা তাদের সার্বিক কল্যাণের জন্য ছাত্র সংসদ থাকা অত্যন্ত জরুরী।

ছাত্র সংসদের প্রয়োজনীতা নিয়ে আরো কথা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সাবেক সহ-সভাপতি (ভিপি) মো. শামীম হোসেনের সাথে। তিনি বলেন, ছাত্র সংসদ শিক্ষার্থীদের পক্ষে স্বাধীনভাবে কাজ করে। তাদের চাহিদার পক্ষে আমরা অতীতেও কাজ করেছি, বর্তমানে যারা আছে আশা করছি তারাও করছে। শুনেছি বর্তমান সংসদ ৮ মাস বন্ধ ছিল। এটার পেছনে হয়ত কোনো কারণ ছিল কারণ এমনি এমনি তো বন্ধ করা হয়না। হয়ত গঠনতন্ত্র পরিপন্থী কোনো কাজ হতে পারে, আমি সঠিক বলতে পারছি না। তবে ছাত্র সংসদ শিক্ষার্থীদের পক্ষে ভালো ভূমিকা পালন করে।

বর্তমান সংসদের কার্যকারিতা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক (জিএস) মো. নজরুল ইসলাম রলিফ বলেন, 'নির্বাচনের পূর্বে আমরা শিক্ষার্থীদের যে ওয়াদা দিয়েছিলাম, অবশ্যই সেটা শতভাগ পূরণ করতে পারিনি। কারণ, বিনা কারণে আমাদের সংসদ ৮ মাস বন্ধ করা হয়েছিল। সে জায়গা থেকে আমরা বেশ পিছিয়ে গেছি। এরপর সংসদ খোলা হলেও শপথ হয় নির্বাচনের প্রায় ১৯ মাস পর। যার কারণে আমরা বিভিন্ন কাজ করতে পারিনি। এরপর অনেক চেষ্টা বা তদবির করে শপথ নিয়েছি এবং দৃশ্যমান অনেকগুলো কাজ করেছি।'

জানা যায়, বর্তমান কমিটির পূর্বে গঠিত আগের দুইটা সংসদ সরাসরি শিক্ষার্থীদের ভোটে নির্বাচিত ছিল না। তৃতীয় কমিটিতেই প্রথম সরাসরি শিক্ষার্থীদের প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সে অনুযায়ী বর্তমান সংসদের প্রতি শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা এবং দাবিটাও অনেক বেশি ছিল।

এ দাবির কতটুকু পূরণ করতে পেরেছেন জানতে চাইলে সংসদের জিএস তাদের সাফল্য তুলে ধরে বলেন, মানুষ শতভাগ কখনোই দিতে পারে না। তবে আমি মনে করি, অতীতের যেকোনো সংসদকে আমরা ছাড়িয়ে গেছি। শিক্ষার্থীদের জিজ্ঞেস করলে তারাই বলবে আমরা কতটা কার্যকর ভূমিকা পালন করেছি। শপথের পর মাত্র পাঁচ মাসে উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে প্রথমবারের মত আমাদের উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি জিমনেশিয়াম স্থাপন করা হয়েছে। মুজিবর্ষে পিঠা উৎসব, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালন করা হয়েছি। এছাড়া বিভিন্ন মিউজিক ক্লাব, থিয়েটারসহ বিভিন্ন সংগঠন দাঁড় করিয়েছি, যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে দারুণ কাজ করছে।

বর্তমান ছাত্র সংসদকে তাদের নিজস্ব গতিতে কাজ করতে না দেয়ার পেছনে প্রশাসনকে দায়ী করছেন সংগঠনটির নেতৃবৃন্দ। তাদের অভিযোগ, প্রশাসনের অসৎ আচরণ এবং খামখেয়ালিপনার কারণে তাদের বৈধতা ৮ মাস বন্ধ ছিল এবং শপথ নির্বাচনের প্রায় ১৯ মাস দেরিতে হয়েছে। শপথের ব্যবস্থা করা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়িত্ব, সংসদের না। কারণ, আমাদের গঠনতন্ত্রে খুবই স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে, নির্বাচনের পনের দিনের মাঝে শপথ অনুষ্ঠিত হতে হবে। এ গঠনতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সংসদের উপদেষ্টারা বানিয়েছে এবং তারা নিজেরাই আগে গঠনতন্ত্র ভঙ্গ করেছে। আমাদের বাজেট দিতে বিভিন্ন গড়িমসি করা হয়। তারা এরকম আচরণ করলে এই সংসদের থেকে শিক্ষার্থীরা কতটা উপকার পাবে, সেটা একটা প্রশ্ন। আর আমরা যে কাজ করবো সেটাতো অবশ্যই প্রশাসনের সাথে আলোচনা করার মাধ্যমে। এক্ষেত্রে প্রশাসন যদি উদাসীনতার পরিচয় দেয়, সেখানে নামমাত্র সংসদ থাকা আর না থাকা সমান কথা।

সার্বিক বিষয়ে কথা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ডা. মো. দেলোয়ার হোসেনের সাথে। তিনি বলেন, এটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চালুকৃত প্রথম ও একমাত্র ছাত্র সংসদ। আমরা যতটা সম্ভব তাদেরকে ছাড় দেই, কিন্তু ওতটা তো দেয়া যাবে না। দেখা যায়, তারা একটা বাজেট দিয়েছে কিন্তু আমরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। আমাদের টাকা পয়সার সমস্যা সহ বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা আছে। তারপরো আমরা তাদের অনেকটা ছাড় দিয়ে চালিয়ে নিচ্ছি। আস্তে আস্তে এটা প্রসার লাভ করবে।

আমারসংবাদ/কেএস