শনিবার ০৬ জুন ২০২০

২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

ই-পেপার

নিজস্ব প্রতিবেদক

মে ১৯,২০২০, ১০:২২

মে ১৯,২০২০, ১০:২২

কর ও ভ্যাট কমানোর দাবি

স্টিল শিল্পে ১৫ হাজার কোটি টাকা ক্ষতির শঙ্কা

চলামান ভয়াবহ করোনা ভাইরাসের প্রভাবে বাংলাদেশের স্টিল শিল্প বর্তমানে ভীষণভাবে বিপর্যস্ত এবং ক্ষতিগ্রস্ত। শুধুমাত্র মার্চ ও এপ্রিল মাসেই বাংলাদেশের স্টিল শিল্পে সম্ভাব্য লোকসানের পরিমাণ প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা। বর্তমান পরিস্থিতিতে মনে হচ্ছে ডিসেম্বর পর্যন্ত এই ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা।

তাই করোনার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে স্টিল শিল্পের উতপাদন থেকে বিক্রি পর্যায়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর ও ভ্যাট কমনোর দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স এসোসিয়েশন।

ভয়াবহ করোনা উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে স্টিল শিল্পের ক্ষয়ক্ষতি পুনরুদ্ধার এবং ২০২০-২১ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে স্টিল শিল্পের ভ্যাট ও ট্যাক বিষয়ে গতকাল ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি করা হয়।

সংগঠনের চেয়ারম্যান মানোয়ার হোসেন এবং সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ এসব দাবি তুলে ধরেন।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, করোনায় সব ক্ষেত্রে মারাত্বক প্রভাব ফেলেছে। স্টিল শিল্পও তার বাইরে নয়। দেশের অবকাঠামো ও আবাসন নির্মাণে স্টিল সেক্টরের ভূমিকা অপরিসীম। এ সেক্টরে বিনিয়োগের পরিমান প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা।

প্রায় তিন লাখ লোকের কর্মসংস্থান এ শিল্পের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত। বাংলাদেশের স্টিল শিল্প ৯০ শতাংশ কাঁচামাল আমদানি নিভর। সমগ্র বিশ্বের স্টিল স্ক্র্যাপ সরবরাহব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে ভেঙ্গে পড়েছে। ট্রান্সশিপমেন্ট পোর্টে জাহাজের অভাবে কন্টেইনারের স্তুপ জমাট বাঁধছে।

শুধুমাত্র চায়নাতে আটকে আছে ৮০ লক্ষাধিক খালি কন্টেইনার অর্থাৎ বিশ্ববাজারে আগামী বছর পর্যন্ত একটি শিল্পের প্রধান কাঁচামাল সরবরাহে ভয়াবহ সঙ্কট থাকবে। আমাদের সেক্টরকে স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরিয়ে আনতে অন্তত পক্ষে দেড় বছর সময় প্রয়োজন হবে।

এমন কঠিন অবস্থার প্রেক্ষিতে স্টিল শিল্পের সম্ভাব্য লোকসানের পরিমাণ কমাতে অর্থ মন্ত্রণালয়, জ্বালানি মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে কিছু দাবি করা হচ্ছে।

প্রণোদনা না, শুধুমাত্র সম্ভাব্য লোকসান সরকারের ঘোষিত ৩০ হাজার কোটি টাকার সরকারি প্যাকেজ থেকে স্টিল শিল্পকে তিন হাজার কোটি টাকার ঋণ প্রদান। স্টিল শিল্পের জন্য চার মাসের সমপরিমাণ অতিরিক্ত এলসি লিমিটের অনুমোদন প্রদান প্রয়োজন। অর্থাৎ ননফান্ডেড সুবিধাদিও ব্যবস্থা করা হোক।

স্টিল শিল্পের প্রতিটি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী ও শ্রমিকদের চার মাসের বেতন-ভাতা ঋণ আকারে ১২টি কিস্তিতে পরিশোধ করা যায়। স্টিল শিল্পে আগামী এক বছরের জন্য কোন প্রকার অতিরিক্ত সুদ বা পেনাল ইন্টারেস্ট মুক্ত রাখতে হবে।

সকল ব্যাংকের সকল গ্রাহকের জন্য সর্বোচ্চ শতকরা নয় শতাংশ সুদের হার কঠোরভাবে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। স্টিল শিল্পে লোকসানের চাপ কমাতে অন্ততপক্ষে ১২ বছরের জন্য ছয় মাসের গ্রেস পিরিয়ডসহ সকল দীর্ঘমেয়দি ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময়সীমা বাড়ানোর দাবি করা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়েছে, স্টিল শিল্প টিকে থাকার জন্য বিদ্যুৎ ও গ্যাসও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই হঠাৎ সৃষ্ট বর্তমান অচলাবস্থার প্রেক্ষিতে অপ্রস্তুত স্টিল শিল্পের প্রতিষ্ঠান তাদের কলকারখানার বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিল সময়মতো পরিশোধ করতে পারছে না।

তাই এ অবস্থার প্রেক্ষিতে স্টিল শিল্পকে রক্ষায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের কাছে গত মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত স্টিল শিল্প/কারখানার বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিল পরিশোধ অক্টোবর পর্যন্ত স্থগিত করতে জরুরী আদেশ এখনই প্রয়োজন।

এসময়ে স্টিল শিল্প কারখানার বিদ্যুৎ/গ্যাস বিল পরিশোধের বিলম্বের কারণে কোনো প্রকার জরিমানা/অতিরিক্ত অর্থ/সারচার্জ আদায় যাতে না করা হয়। চলমান ভয়াবহ করোনা উদ্ভূত পরিস্থিতি এবং করোনা উত্তর সময়ে আগামী অর্থ বছরের বাজেট হতে হবে সহানুভুতিশীল এবং জনগণ ও ব্যবসা-বান্ধব।

করোনা পরবর্তী স্টিল শিল্প ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে আসন্ন বাজেটে আমদানি শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর (মূসক) এবং আয়কর (এটিআই) নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাছে সময়োপযোগী এবং যুক্তিযুক্ত প্রস্তাব করে সংগঠনটি।

সকল প্রকার অগ্রিম কর এবং অগ্রিম ট্যাক্স বা ভ্যাট সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করতে হবে। মেল্টেবল স্ক্র্যাপ আমদানি শুল্ক এক হাজার পাচশত থেকে কমিয়ে পাঁচশত টাকা নির্ধারণ করা দরকার।

বিশ্ব বাজারে মন্দার কারণে এমএস রড ডাম্পিং হবার সম্ভাবনাকে রোধ করার জন্য এমএস রড আমদানি পর্যায়ে অতিরিক্ত ১৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা হোক।

স্টিল উৎপাদন এবং সরবরাহ পর্যায়ে মূসক হ্রাস করে আমদানিকৃত মেল্টেবল স্ক্র্যাপ হতে বিলেট টনপ্রতি এক হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ৪৫০ টাকা পুনঃনির্ধারণ করতে হবে।

বিলেট হতে এম এস রড টনপ্রতি এক হাজার টাকা থেকে ৪৫০ টাকায় পুনঃনির্ধারণ এবং মেল্টেবল স্ক্র্যাপ হতে এমএস রড ২ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে টনপ্রতি ৯০০ টাকা পুনঃনির্ধারণ করারও প্রস্তাব করা হয়।

এসময় স্টিল শিল্পের সকল কাঁচামাল আমদানি পণ্যের উপর আরোপিত ৫ শতাংশ আগাম কর প্রত্যাহারেরও প্রস্তাব করা হয়। উৎসে মূল্য সংযোজন কর কর্তন প্রত্যাহার এবং খুচরা ব্যবসায়ী পর্যায়ে রডের মূসক টনপ্রতি ৫০০ টাকা হতে ২০০ টাকা নির্ধারণ করার প্রস্তাব করা হয়।

একই সাথে পরবর্তী অর্থবছরের জন্য কর্পোরেট আয়কর ১০ শতাংশ নির্ধারণ এবংকাঁচামাল আমদানির উপর আরোপিত টনপ্রতি অগ্রিম আয় কর ৫০০ টাকা সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করারও প্রস্তাব করা হয়।

রড বিক্রির ক্ষেত্রে বিদ্যমান উৎস কর কর্তন প্রত্যাহার, বিলেট বিক্রির উপর আরোপিত অগ্রিম আয়কর এবংস্থানীয় পর্যায়ে স্টিলের স্ক্র্যাপ বিক্রির ক্ষেত্রেও আরোপিত ৩% অগ্রিম আয়কর প্রত্যাহার করার দাবি জানানো হয় সংগঠনের পক্ষ থেকে।

আমারসংবাদ/এআই