মঙ্গলবার ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০

১৪ আশ্বিন ১৪২৭

ই-পেপার

নিজস্ব প্রতিবেদক

আগস্ট ০৭,২০২০, ০৭:১৮

আগস্ট ০৭,২০২০, ০৭:৩৪

সিনহাকে গুলি করার পর

ওসি-ইন্সপেক্টর-এসপির ফোনালাপ ফাঁস

একজনকে ডাউন করছি, আরেকজন ধরে ফেলছি স্যার। সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ খানকে গুলি করার পর পুলিশ পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর) লিয়াকত আলী কক্সবাজারের পুলিশ সুপার (এসপি) এ বি এম মাসুদ হোসেনকে টেলিফোনে এ কথা বলেন।

এর আগে এসপিকে টেলিফোন করেন টেকনাফ থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার দাশ। তবে তিনজনের ফোনালাপে মাদকের কোনো তথ্য ছিল না।

ওসি, পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদকে জানান, লিয়াকতকে গুলি করার পরে লিয়াকত গুলি করেছে তারই নির্দেশে।

যদিও পরিদর্শক লিয়াকত কক্সবাজারের এসপিকে ফোন দিয়ে জানান, পিস্তল তাক করার পরই তিনি গুলি করেছেন।

এজাহারে ৬টি গুলির কথা থাকলেও সুরতহালে মিলেছে ছয়টি গুলি। যা শরীরের বিভিন্ন অংশে করা হয়। বাকি দুইটি গুলি কে করল সেই উত্তর পাওয়া যায়নি এখনো।

গত ৩১ জুলাই রাতের ঘটনাস্থলের কিছু ফোনালাপ বেসরকারি টিভি চ্যানেল- চ্যানেল ২৪ এ প্রকাশিত হয়েছে।  

প্রদীপ: আদাপ স্যার
মাসুদ: কি আপনি এমন কিছু হইছে. বলেন...
প্রদীপ: লিয়াকতরে গুলি করছে নাকি স্যার, আমি যাচ্ছি ওখানে
মাসুদ: কে?
প্রদীপ: ঐ যে স্যার লিয়াকত স্যার ইয়াতে.. চেকপোস্টে
মাসুদ:হ্যা
প্রদীপ: একটা গাড়িকে সিগন্যাল দিছে, সিগন্যাল দেয়ায় পরে গাড়ি থেকে তাকে গুলি করছে, ঐ সময় আমি তাকে বললাম, ঠিক আছি তুমিও তাড়াতাড়ি ওকে গুলি করো। সেও নাকি তাকে গুলি করছে স্যার। আমি যাচ্ছি ওখানে স্যার।
মাসুদ:যান যান....

যদিও ওসির বক্তব্যের সঙ্গে মিল নেই লিয়াকতের।

মাসুদ: হ্যালো
লিয়াকত: আসসালামু আলাইকুম স্যার, স্যার
মাসুদ:বলো
লিয়াকত: এখানে একটা প্রাইভেটকার আছে স্যার, ঢাকা মেট্রো লেখা। আর্মির পোশাক পড়া। পরে যখন তাকে চার্জ করছি, সে মেজর পরিচয় দিয়ে গাড়িতে চলে যেতে চাইছিলো। পরে অস্ত্র তাক করছিলো। আমি গুলি করছি স্যার। একজন ডাউন করছি, আরেকজন ধরে ফেলছি স্যার। স্যার, আমি কি করবো স্যার? আমাকে পিস্তল তাক করছে, পিস্তল পাইছিতো স্যার।

গেলো দুই বছর আগে সেনাবাহিনী থেকে স্বেচ্ছায় অবসরে যাওয়া সিনহা মো. রাশেদ খান ‘লেটস গো’ নামে একটি ভ্রমণ বিষয়ক ডকুমেন্টারি বানানোর জন্য গত প্রায় একমাস ধরে কক্সবাজারের হিমছড়ি এলাকায় ছিলেন। আরো তিন সঙ্গীকে নিয়ে তিনি উঠেছিলেন নীলিমা রিসোর্টে।

গত ৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে তিনি নিহত হন।

ঘটনাস্থল থেকে অস্ত্র ও মাদক উদ্ধারের কথা জানিয়ে সে সময় পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, সিনহা তার পরিচয় দিয়ে ‘তল্লাশিতে বাধা দেন’। পরে ‘পিস্তল বের করলে’ চেক পোস্টে দায়িত্বরত পুলিশ তাকে গুলি করে। এই ঘটনায় পুলিশ মামলাও করে।

তবে পুলিশের এই ভাষ্য নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও প্রশাসনের প্রতিনিধি নিয়ে একটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

এদিকে সিনহাকে হত্যা করা হয়েছে দাবি করে গেলো বুধবারই কক্সবাজারের আদালতে মামলা করেন তার বোন শারমিন।

এজাহারে তিনি অভিযোগ করেন, ওসি প্রদীপের ফোনে পাওয়া নির্দেশে বাহারছড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের এসআই লিয়াকত আলি গুলি করেছিলেন সিনহাকে।

মামলায় টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ পরিদর্শক লিয়াকত আলিসহ তিন আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে সাত দিনের জন্য র‌্যাব হেফাজতে পাঠিয়েছে আদালত।

কক্সবাজারের জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আদালতের বিচারক মো. হেলাল উদ্দিন বৃহস্পতিবার রাতে র‌্যাবের দশ দিনের রিমান্ড আবেদনের শুনানি করে সাত দিন মঞ্জুর করেন।

প্রদীপ ও লিয়াকতের সঙ্গে রিমান্ডে পাঠানো হয়েছে এসআই দুলাল রক্ষিতকে। এ মামলায় আত্মসমর্পণ করা বাকি চার আসামি কনস্টেবল সাফানুর করিম, কামাল হোসেন, আব্দুল্লাহ আল মামুন এবং এএসআই লিটন মিয়াকে দুই দিন জেলগেইটে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দিয়েছেন বিচারক।

মামলার বাকি দুই আসামি এসআই টুটুল ও কনস্টেবল মো. মোস্তফা এখনও পলাতক। তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আদেশ দিয়েছে আদালত।

টেকনাফের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহার মৃত্যুর ঘটনায় তার বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌসের দায়ের করা এই হত্যা মামলায় লিয়াকতকে ১ নম্বর এবং প্রদীপকে দুই নম্বর আসামি করা হয়েছে।

শারমিন বুধবার সকালে টেকনাফের বিচারিক হাকিম আদালতে মোট ৯ জনকে আসামি করে ওই মামলা করার পর বিকালে টেকনাফ থানা থেকে ওসি প্রদীপ কুমার দাশকে প্রত্যাহার করা হয়। পরিদর্শক লিয়াকত আলিসহ ২০ পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনসে পাঠানো হয় দুদিন আগেই।

জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম তামান্না ফারাহ বুধবার হত্যা মামলাটি আমলে নিয়ে টেকনাফ থানাকে অভিযোগটি এজাহার হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন। পাশাপাশি মামলার তদন্তভার দেন র‌্যাবকে।

এ মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় ‘ইচ্ছাকৃত নরহত্যা’, ২০১ ধারায় আলামত নষ্ট ও মিথ্যা সাক্ষ্য তৈরি এবং ৩৪ ধারায় পরস্পর ‘সাধারণ অভিপ্রায়ে’ অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ আনা হয়েছে।  এর মধ্যে ৩০২ ধারার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।

ঘটনার সময় সিনহার সঙ্গে থাকা সাহেদুল ইসলাম সিফাতকে (২১) মামলার প্রধান সাক্ষী করা হয়েছে। ঘটনার দিনই তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ, মাদক ও অস্ত্র আইনের মামলায় তাকেও আসামি করা হয়।
 
যার নির্দেশে সিনহাকে গুলি করার অভিযোগ আনা হয়েছে মামলায়, সেই পরিদর্শক প্রদীপ কুমার দাশ পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেন ১৯৯৬ সালে।

২০০৪ সালে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) কোতয়ালি থানার সেকেন্ড অফিসার থাকাকালে পাথরঘাটায় এক বিধবা নারীর জমি দখলের অভিযোগে তিনি বরখাস্ত হন।

এরপর চট্টগ্রাম রেঞ্জে সংযুক্ত হয়ে তিনি কাজ শুরু করেন কক্সবাজার জেলা পুলিশে। পরে পদোন্নতি পেয়ে ২০১০-১১ সালে পতেঙ্গা থানার ওসির দায়িত্ব পান।

২০১৩-১৪ সালে চট্টগ্রাম নগরীর পাঁচলাইশ থানার ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় জামায়াত-শিবিরের নাশকতা প্রতিরোধে ‘গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা’ রেখে আলোচনায় আসেন প্রদীপ।

কিন্তু কিছুদিন পর নিজের আত্মীয়র জায়গা দখলের ঘটনায় আবারো তিনি বিতর্কে জড়ান। এরপর পাঁচলাইশ থেকে সরিয়ে তাকে বায়েজিদ বোস্তামি থানার ওসি করা হয়।

২০১৫ সালে সুপার রিফাইনারি নামে একটি তেল শোধনাগারের নয় হাজার লিটার তেল আটক করে ফের আলোচনার জন্ম দেন এই পুলিশ কর্মকর্তা। ওই ঘটনায় তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

পরে সিলেট রেঞ্জে বদলি হন প্রদীপ। ২০১৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে বদলি হয়ে তিনি সিএমপির ডিবিতে যোগ দেন।

ওই বছরই পুলিশ কর্মকর্তা বাবুল আক্তারের স্ত্রী মিতু হত্যার ঘটনায় আবু নসুর গুন্নু নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে পরিদর্শক প্রদীপের নেতৃত্বে গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল।

এ নিয়ে আলোচনার মধ্যে প্রদীপ দাশকে বদলি করা হয় কক্সবাজারে। ২০১৭ সালে উখিয়া থানার ওসির দায়িত্ব পান তিনি। পরে সেখান থেকে বদলি করা হয় মহেশখালী থানায়।

সেখানে জলদস্যু দমনে ভূমিকার জন্য প্রশংসিত হন প্রদীপ। মহেশখালী থেকে ২০১৮ সালের অক্টোবরে তাকে টেকনাফ থানার ওসি করে পাঠানো হয়।

টেকনাফে মাদকবিরোধী অভিযানে কথিত বন্দুকযুদ্ধে শতাধিক মৃত্যুর ঘটনায় আলোচিত-সমালোচিত প্রদীপ কুমার দাশকে ২০১৯ সালে পুলিশের সর্বোচ্চ সম্মাননা বিপিএম পদকে ভূষিত করা হয়।

আমারসংবাদ/এআই