বুধবার ১৫ জুলাই ২০২০

৩০ আষাঢ় ১৪২৭

ই-পেপার

নিজস্ব প্রতিবেদক

জুন ২০,২০২০, ১১:৪৯

জুন ২০,২০২০, ১১:৪৯

করোনার মধ্যেই দেশে ভয়ংকর আরেক ভাইরাসের হানা

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের মধ্যেই ভয়ংকর আরেক ভাইরাস দেখা দিয়েছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় এই ভাইরাসে শত শত গরু আক্রান্ত হচ্ছে বলে খবর পওয়া গেছে।

‘লাম্পি স্কিন ডিজিস’ নামে এই ভাইরাস মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। এর কোনো প্রতিষেধক না থাকায় পালিত গরু নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ।

অনেকে না বুঝেই গ্রাম্য পশু ডাক্তারকে মোটা অংকের টাকা দিয়ে হচ্ছেন ক্ষতিগ্রস্ত। গরুপ্রতি দুই থেকে তিন হাজার টাকা খরচ করতে হচ্ছে কৃষকদের। এতে গরু মারা না গেলেও সুস্থ হতে বেশ সময় লাগছে।

জানা যায়, ১৯২৯ সালে সর্বপ্রথম আফ্রিকা মহাদেশে জাম্বিয়াতে এ রোগ দেখা দিলেও এখন পর্যন্ত কোন প্রতিষেধক আবিষ্কার হয়নি। মশা-মাছিবাহিত ওই রোগটি মূলত মশার মধ্যমেই বেশি ছড়ায়। আক্রান্ত গরুর ভালো হতে দীর্ঘদিন সময় লাগে। দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ে অনেক ক্ষেত্রে গরু ও বাছুর মারা যাচ্ছে।

বাংলাদেশে গরুর লাম্পি স্কিন রোগ প্রথম দেখা গেছে ২০১৯ সালে চট্টগ্রামে। এরপরই মাঠে নামে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তদন্ত টিম। তখন দেশের ১২ জেলায় ৪৮ হাজার গরুর মধ্যে এ রোগের লক্ষণ খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল। দুই বছর পর আবার রোগটি দেখা দিয়েছে।

সম্প্রতি আফ্রিকা মহাদেশে ৪০ শতাংশ গরু এই রোগে মারা গেছে বলে জানিয়েছে কৃষি তথ্য সার্ভিস- এআইএস।

এআইএস বলছে, মূলত আফ্রিকায় একাধিকবার মহামারী আকারে দেখা গেলেও আমাদের দেশে গরুতে এই রোগের প্রাদুর্ভাব কখনো মহামারী আকারে দেখা যায় নাই। একটা খামারকে অর্থনৈতিকভাবে ধসিয়ে দেয়ার জন্য এফএমডি বা খুরা রোগের চেয়ে একে অনেক বেশি ভয়ংকর রোগ হিসেবে ধরা হয়।

প্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত বছর অক্টোবরে ভারত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করা এই আফ্রিকান ভাইরাসটির সংক্রমণ এবার ব্যাপক আকার ধারণ করেছে।

এই রোগে আক্রান্ত গবাদি পশুর চামড়া ফুলে গোটা গোটা সৃষ্টি হয়। পরে এসব গোটা ফেটে গিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ঘাঁয়ের মতো হয়ে যায়, তারপর আক্রান্ত পশুর জ্বর আসে। এক সময় পশুটি দুর্বল হয়ে ওজন হারায় এবং অবশেষে মারা যায়। আক্রান্ত হলে বাছুরের মৃত্যু ঝুঁকি বেশি বলেও জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

এদিকে এগিয়ে আসছে কোরবানির ঈদ। আর এই ঈদকে কেন্দ্র করেই মূলত ব্যবসাটা করেন খামারিরা। তাই ঈদের আগে আগে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় ব্যাপক লোকসানের চিন্তায় পড়েছেন তারা।

এদিকে গবাদিপশুর লাম্পি স্কিন রোগের বিস্তার রোধে জরুরিভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রাণিসম্পদ অধিদফতরকে নির্দেশ দিয়েছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। একইসাথে এ রোগে আক্রান্ত গবাদিপশুর চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণেরও নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

সমপ্রতি এ সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করে প্রাণিসম্পদ অধিদফতরে পাঠিয়েছে মন্ত্রণালয়।

নির্দেশনা পত্রে আক্রান্ত এলাকার প্রতিটি ইউনিয়নে একজন উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা অথবা একজন ভেটেরিনারি সার্জন অথবা একজন প্রাণিসম্পদ সম্প্রসারণ কর্মকর্তার নেতৃত্বে উপসহকারী প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা অথবা ভেটেরিনারি ফিল্ড অ্যাসিসটেন্ট অথবা ফিল্ড অ্যাসিসটেন্ট (এআই)-এর সমন্বয়ে ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম গঠনের নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।

লাম্পি স্কিন রোগে আক্রান্ত প্রতিটি গবাদিপশু সরেজমিনে পরিদর্শন করে চিকিৎসা নিশ্চিত করার জন্য মেডিকেল টিমকে নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।

পাশাপাশি এ চিকিৎসা কাজ সার্বক্ষণিক মনিটরিং-এর জন্য বিভাগীয় ও জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। প্রয়োজনে আক্রান্ত জেলার পাশ্ববর্তী জেলা বা উপজেলা থেকে প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা/কর্মচারীদের মেডিকেলে টিমে দায়িত্ব প্রদানেরও নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

একইসাথে সংশ্লিষ্ট প্রাণিসম্পদ দফতরকে প্রতিদিন চিকিৎসা প্রদান করা গবাদিপশুর মালিকের নাম ও মোবাইল নম্বরসহ ঠিকানাসহ তালিকা মন্ত্রণালয়ে প্রেরণের জন্য বলা হয়েছে।

আক্রান্ত গরুর লক্ষণ:
*আক্রান্ত গরু প্রথমে জ্বরে আক্রান্ত হয় এবং খাবার রুচি কমে যায়।
*জ্বরের সঙ্গে মুখ দিয়ে এবং নাক দিয়ে লালা বের হয়। পা ফুলে যায়। সামনের দু’পায়ের মাঝ স্থানে পানি জমে যায়।
*শরীরের বিভিন্ন জায়গায় চামড়া পিণ্ড আকৃতি ধারণ করে, লোম উঠে যায় এবং ক্ষত সৃষ্ট হয়। ধারাবাহিকভাবে এই ক্ষত শরীরের অন্যান্য জায়গা ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষত মুখের মধ্যে, পায়ে এবং অন্যান্য জায়গা ছড়িয়ে পড়তে পারে।
*ক্ষত স্থান থেকে রক্তপাত হতে পারে। শরীরে কোথায় ফুলে যায় যা ফেটে টুকরা মাংসের মতো বের হয়ে ক্ষত হয়, পুঁজ বের হয়।
*পাকস্থলী অথবা মুখের ভেতরে সৃষ্ট ক্ষতের কারণে গরু পানি পানে অনীহা প্রকাশ করে এবং খাদ্য গ্রহণ কমে যায়।

লাম্পি স্কিন রোগে আক্রান্ত গরু থেকে বিভিন্ন মাধ্যমে রোগটি অন্য গরুতে ছড়িয়ে পড়ে। এই রোগ এক গরু থেকে অন্য গরুতে ছড়িয়ে পড়ার প্রধান মাধ্যমগুলো হচ্ছে :
*মশা ও  মাছি : এই রোগের ভাইরাসের প্রধান বাহক হিসাবে মশা মাছিকে দায়ী করা হয়। অন্যান্য কীট পতঙ্গের মাধ্যমেও ভাইরাসটি আক্রান্ত গরু থেকে অন্য গরুতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
*লালা : আক্রান্ত গরুর লালা খাবারের মাধ্যমে অথবা খামারে কাজ করা মানুষের কাপড়ের মাধ্যমে এক গরু থেকে অন্য গরুতে ছড়াতে পারে।
*দুধ : যেহেতু আক্রান্ত গাভীর দুধে এই ভাইরাস বিদ্যমান থাকে তাই আক্রান্ত গভীর দুধ খেয়ে বাছুর দুধ খেয়ে আক্রান্ত হতে পারে।
*সিরিঞ্জ : আক্রান্ত গরুতে ব্যবহার করা সিরিঞ্জ থেকে এই ভাইরাসবাহিত হতে পারে।
*রক্ষণাবেক্ষণকারী : খামারে কাজ করা মানুষের পোশাকের মাধ্যমে আক্রান্ত গরু থেকে অন্য গরুতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
*আক্রান্ত গরুর সিমেন : ভাইরাস আক্রান্ত ষাঁড়ের সিমেন এই রোগের অন্যতম বাহন, কারণ আক্রান্ত গরুর সিমেনেও এই ভাইরাস বিদ্যমান থাকে।
*শুধুমাত্র গরু মহিষ আক্রান্ত হয়, মানুষ হয় না।

আমারসংবাদ/এআই