শনিবার ১৫ আগস্ট ২০২০

৩০ শ্রাবণ ১৪২৭

ই-পেপার

নিজস্ব প্রতিবেদক

মার্চ ২৬,২০২০, ০৩:০৪

মার্চ ২৬,২০২০, ০৩:০৯

স্বাধীনতা দিবসে এমন চিত্র অতীতে দেখেনি কেউ

আজ ২৬ মার্চ । মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে বাঙালি। ২৬ শে মার্চের প্রথম প্রহরে গ্রেপ্তারের আগে স্বাধীনতার ঘোষণা করেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

তার ডাকে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে বাঙালি জাতি। দীর্ঘ ন’মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদ এবং লাখ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে বিশ্বমানচিত্রে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্থান পেয়েছে বাংলাদেশ।

এরপর স্বাধীনতার ৪৯ বছর ধরে বাঙালি জাতি সেই শহীদদের গভীর শ্রদ্ধা ও মমতায় স্মরণ করে আসছে বাংলাদেশের মানুষ। প্রতি বছর স্বাধীনতা দিবসে রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা শুরু হতো সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে।

এবারই বাংলাদেশের ইতিহাসে ৪৯ বছরে প্রথম বারের মতো শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা বন্ধ রয়েছে। করোনাভাইরাসের মহামারীরূপ সংক্রমণের এবারের স্বাধীনতা দিবসে সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে কোনো আয়োজন হয়নি। যথারীতি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করা হলেও সরকারের নির্দেশনা মেনে কেউ যায়নি সেখানে।

মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য গণপূর্ত অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধ ধুয়ে-মুছে ও রং-তুলি দিয়ে করা হয় প্রস্তুত। স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে প্রতিবার ভোরের সূর্য্য ওঠার পূর্বেই প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি, তিন বাহিনীর প্রধান, মন্ত্রীবর্গসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক সামাজিক সংগঠন ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করলেও এবার প্রথম স্বাধীনতা দিবসে ফাঁকা রয়েছে সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধ।

দিবসটি উপলক্ষে কুয়াশাভেজা সকালে প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক সামাজিক সংগঠন ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করতেন সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে। এরপরই শ্রদ্ধা জানাতে ঢল নামতো সাধারণ মানুষের।

তবে বৈরী পরিস্থিতির কারণে এবারের চিত্রটা ভিন্ন। নেই লাখো মানুষের উপস্থিতি, নেই কোনো আনুষ্ঠানিকতা। করোনাভাইরাসের কারণে আগেই জনগণের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা বিবেচনা করে বাতিল করা হয় রাষ্ট্রের সকল কর্মসূচি।

ফলে এবছর জাতীয় স্মৃতিসৌধে সুনশান পরিবেশ বিরাজ করছে। অন্যান্য বছর এই সময়ে যেখানে মানুষের জন্য হাঁটা পর্যন্ত দায় হয়ে যায় সেখানে এবার জনশূন্য পরিবেশ। স্মৃতিসৌধের প্রধান প্রবেশপথ তালা দেওয়া ও দ্বিতীয় পথে তিন/চারজন নিরাপত্তাকর্মী বসে ও দাঁড়িয়ে সময় পাড় করছেন। বন্ধ রয়েছে স্মৃতিসৌধের ফোয়ারাও। প্রধান বেদিতে নেই কোনো ফুল।

 

জাতীয় স্মৃতিসৌধের অফিস সহকারী মো. আবুল বাশার বলেন, এখানে স্মৃতিসৌধ স্থাপনের পর এবারই প্রথম যে, কোনো শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়নি। এবার কোনো লোক আসেননি।

জাতীয় স্মৃতিসৌধের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. মিজানুর রহমান বলেন, আমরা স্বাধীনতা দিবসের জন্য সব প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। কিন্তু করোনার কারণে এবার দিবসটির সব কার্যক্রম বাতিল করা হয়েছে।

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে সতর্কতামূলক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে আজ থেকে সারাদেশে গণপরিবহন বন্ধ। জনসমাগম ও জটলা এড়াতে নির্দেশ দিয়েছে সরকার। আজ থেকে আগামী ৪ এপ্রিল পর্যন্ত সরকারি ছুটির ঘোষণা দিয়েছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া রাজধানীসহ দেশের মানুষকে নিজ নিজ বাড়িতে অবস্থান করার নির্দেশ দিয়েছে।

এদিকে অন্যান্য বছর মহান স্বাধীনতা দিবসের কাকডাকা ভোর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, সোহরোওয়ার্দী ও রমনা পার্কে নারী, পুরুষ ও শিশুর ঢল নামে। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, উচ্চস্বরে দেশাত্মবোধক গান বাজে। আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে ওঠেন সবাই। কিন্তু আজ মাইকের কোনো শব্দ নেই। নেই মানুষের পদচারণা। মারাত্মক ছোঁয়াচে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের ভয়ে নিজেরাই সচেতন হয়ে নিজ নিজ বাড়িতে অবস্থান করছেন। সরকারিভাবেও প্রয়োজন ছাড়া ঘরেই অবস্থান করতে বলা হয়েছে।

এছাড়াও রাজধানীর ধানমন্ডি, নিউমার্কেট, রমনা, তেজগাঁও, মোহাম্মদপুর ও হাজারীবাগ থানা এলাকার রাস্তাঘাট প্রায় জনমানবহীন। বিভিন্ন স্পটে আইনশৃংখলাবাহিনী সড়কে অবস্থান নিয়ে আছেন। মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকার দেখলেই থামাচ্ছেন ‍পুলিশ সদস্যরা। জানতে চাচ্ছেন কেন বের হয়েছেন, কোথায় যাচ্ছেন?

রমনা পার্কে নিয়মিত প্রাতঃভ্রমণকারী অবসরপ্রাপ্ত একজন সরকারি কর্মকর্তা বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) সকাল সাড়ে ৭টায় শাহবাগ মোড়ের সামনে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘স্বাধীনতা দিবসের আনন্দ কেড়ে নিয়েছে অদৃশ্য ভাইরাস করোনা। প্রতিবছর মহান স্বাধীনতা দিবস অর্থাৎ ২৬ মার্চের সকালে শাহবাগে লোকে লোকারণ্য থাকে। আজ মানুষ নেই বললেই চলে।’

‘বয়স তো আর কম হলো না। সামনের মাসে ৭০ বছরে পা দেব। কত হরতাল, অবরোধ, ধর্মঘট ও কারফিউ দেখেছি। কিন্তু স্বাধীনতা দিবসে এমন ঢাকা শহর আর দেখিনি। রাস্তায় মানুষ নেই, গাড়িও চলছে না। ছোটবড় শপিংমল, মার্কেট, হোটেল রেস্টুরেন্ট, সরকারি-বেসরকারি অফিস, আদালতও বন্ধ। এ মুহূর্তে ঢাকা শহর ঘুরে হাতের কড়া গুণে বলে দেয়া যাবে রাস্তায় কত লোক আছে।’

প্রসঙ্গত, প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস চীনের উহান থেকে বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়েছে। এ পর্যন্ত মারা গেছেন ২১ হাজারের বেশি মানুষ। বাংলাদেশেও থাবা বসিয়েছে করোনা।

আমারসংবাদ/জেআই