রবিবার ২৯ মার্চ ২০২০

১৫ চৈত্র ১৪২৬

ই-পেপার

নূর-ই-আলম সিদ্দিক, নাগেশ্বরী

ফেব্রুয়ারি ১৯,২০২০, ০৪:৫৫

ফেব্রুয়ারি ২০,২০২০, ০২:১০

কোলে চড়ে এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে অদম্য কিশোরী

চলছে এসএসসি পরীক্ষা। কেন্দ্রের ভিতর কিংবা বাহিরের চারিদিকে শুনশান নীরবতা। তার কিছুক্ষণ বাদেই পরীক্ষার শেষ ঘন্টায় পরীক্ষার্থীদের কোলাহলে মুখোরিত হয়ে উঠল কেন্দ্রের ভেতর বাহির। আস্তে আস্তে সব পরীক্ষার্থীরাই হাতে হাতে প্রশ্নপত্র, হার্ডবোর্ট, কলম, স্কেল নিয়ে বের হয়ে আসছে কেন্দ্র হতে।

তাদের পিছনেই এক ষাটোর্ধ বৃদ্ধা কি যেন কোলে নিয়ে বের হয়ে আসছেন কেন্দ্র থেকে। কাছে আসতেই বুঝতে অসুবিধে হয়না আর। মায়াবী মুখ, ডাগোর চোখ, ভাসা নাক, ধপধপে ফর্সা পুতুলের মতো দেখতে-কোলে তার এসএসসি পরীক্ষার্থী মেয়ে।

মঙ্গলবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) নাগেশ্বরী আদর্শ পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় পরীক্ষা কেন্দ্রে দেখা গেছে এমন চিত্র। বাড়ি নাগশ্বরীর কুটি বাগডাঙ্গা গ্রামে। বাবা ফরমান আলী ও মাতা রাবেয়া বেগমের তিন সন্তানের মধ্যে একমাত্র আদুরে মেয়ে হওয়ায় নাম রেখেছে মনি, পুরো নাম ফারজানা আক্তার, বয়স ১৫ বছর ৩ মাস ১৭ দিন, উচ্চতা ৩৩ ইঞ্চি।

সে এবার গাগলা বালিকা বহুমূখী উচ্চ বিদ্যালয় হতে মানবিক বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ গ্রহন করেছে। রোল নং-৫৩৮৬৮৮, রেজিঃ নং-১৭১৭৭১২১৬৯। উচ্চতায় ফারজানা আক্তার মনি ৩৩ ইঞ্চি হলেও হৃদয়টা তার পাহাড় সম, আর স্বপ্নটা আকাশ সমান। আর তাই শারীরিক প্রতিবন্দতাকে জয় করে স্বপ্ন পূরনের লক্ষ্যে বাবার কোলে চড়ে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ গ্রহন করেছে ফারজানা আক্তার মনি নামের ৩৩ ইঞ্চি উচ্চতার এই অদম্য কিশোরী।

পরীক্ষায় ভাল ফলাফল করে লেখাপড়া শেষ করে ভবিষ্যতে সে অনেক বড় চাকরি করতে চায়- জানতে চাইলে আমার সংবাদ’কে এমনটি জানান ফারজানা আক্তার।

মেয়েকে নিয়ে ভবিষ্যত পরিকল্পনার কথা জানতে চাইলে বাবা বোরহান আলী আবেগে আপ্লুত হয়ে বলেন, তিন সন্তানের মধ্যে একটি মাত্র মেয়ে আমার বড় আদরের, তাই নাম রেখেছি মনি। মেয়েটা শারীরিক ভাবে প্রতিবন্ধী হওয়ায় নিজের প্রয়োজনীয় কাজ নিজে করতে পারে না। দু’হাতের আঙ্গুল গুলো তুলনামূলক একটু সোজা হওয়ায় নিজ হাতে ভাত খেতে পারে না। ওর প্রয়োজনীয় সব কাজ ওর মা করে দেয়। আর আমি ও আমার ছেলে মিলে এখনো কোলে করে ওকে স্কুলে নিয়ে যাওয়া আসা করি। তাতে কোন কষ্ট নেই আমাদের। কষ্ট একটাই মেয়েটা যদি আমার অন্যসব মেয়েছেলের মত স্কুলে যাওয়া আসা করত তাহলে বাবা হিসাবে আমার এ কথা শেষ হতে না হতেই বাবা বোরহান উদ্দিনের চোখ দুটো ভারী হয়ে আসে বিষাদের জলে।

তার কিছুক্ষণ পর মেয়েকে নিয়ে ভবিষ্যত পরিকল্পনার কথা জানাতে গিয়ে বোরহান উদ্দিন আমার সংবাদ’কে বলেন, ইচ্ছা থাকার পরেও মেয়েটাকে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি করাতে পারিনি, বিজ্ঞানে লেখাপড়ায় খুব চাপ। সে একা একা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে পারে না, তাই মানবিক বিভাগে ভর্তি করেছি, সে এবার মানবিক বিভাগ থেকে পরীক্ষা দিচ্ছে, তাই আমি চাইলেও ওকে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার বানাতে পারবো না। ও তবে ও যতদিন পড়তে চায় আমি পড়াবো, যাতে ওর মনে কোন কষ্ট না থাকে।

গাগলা দ্বিমূখী বালিকা বহুমূখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বলেন, ফারজানা আক্তার মনি শারীরিক ভাবে প্রতিবন্ধী হলেও লেখাপড়ায় খুব ভাল। জেএসসিতে ফোর পয়েন্ট পেয়েছে। তার ক্লাশ রোল নং-১৩। আশা করি সে এসএসসিতেও ভাল রেজাল্ট করবে।

নাগেশ্বরী আদর্শ পাইলট দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও কেন্দ্র সচিব মো. মোশারফ হোসেন বলেন, আমি যতবার হল পরিদর্শনে গিয়েছিলাম আমি ততবারই অন্যান্য পরীক্ষার্থীদের মত ওকেও মনোযোগের সহিত লিখতে দেখেছি। আমি মেয়েটির ভবিষ্যত সফলতা কামনা করি।

আমারসংবাদ/কেএস